চীনে শি-ট্রাম্প বৈঠক, আলোচনায় যা থাকতে পারে
প্রায় এক দশক পর কোনো মার্কিন রাষ্ট্রপতি চীনে পা রাখতে চলেছেন। সব কিছু ঠিক থাকলে আগামী ১৪ মে বেইজিং পৌঁছাবেন ডোনাল্ড ট্রাম্প।
আজ শুক্রবার এই তথ্য জানিয়েছে বার্তা সংস্থা এএফপি।
মধ্যপ্রাচ্যের অস্থির পরিস্থিতির মধ্যে ট্রাম্পের এই সফর ও চীনের রাষ্ট্রপতি শি জিন পিংয়ের সঙ্গে নির্ধারিত বৈঠক সবার মনোযোগ কেড়ে নিয়েছে।
বিশ্লেষকরা জানিয়েছেন, ইতোমধ্যে মার্কিন প্রতিনিধিদের একটি অগ্রবর্তী দল বেইজিং পৌঁছে গেছেন। দ্বিপাক্ষিক আলোচনার রূপরেখা নির্ধারণে কাজে ব্যস্ত আছেন তারা।
দুই নেতার বৈঠকে সম্ভাব্য আলোচ্য বিষয়গুলো এএফপির প্রতিবেদনে তুলে ধরা হয়েছে।
দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য সম্পর্ক
চীনের কাছ থেকে উড়োজাহাজ, কৃষি ও জ্বালানি খাত সংশ্লিষ্ট পণ্য কিনতে আগ্রহী যুক্তরাষ্ট্র। এ বিষয়টি নিয়ে বৈঠকে আলোচনা হতে পারে বলে মত দেন ব্রান্সউইক গ্রুপের কর্মকর্তা ক্রিস্টোফার প্যাডিলা।
সাবেক মার্কিন বাণিজ্য কর্মকর্তা প্যাডিলা এএফপিকে বলেন, ‘এটা যুক্তরাষ্ট্রের জন্য একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। অপর গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টি হলো দুই দেশের মধ্যে একটি “বাণিজ্য বোর্ড” গঠন করা।’
মার্কিন বাণিজ্য প্রতিনিধি জেমিসন গ্রিয়ার জানান, চীনে কী কী পণ্য রপ্তানি হবে এবং সেখান থেকে কী কী পণ্য আমদানি করা হবে, সে বিষয়টি চিহ্নিত করে আনুষ্ঠানিক রূপ দেওয়ার কাজটি করবে এই বাণিজ্য বোর্ড।
প্যাডিলা এএফপিকে বলেন, এই প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে ভবিষ্যতে ভোক্তা পর্যায়ে ব্যবহারযোগ্য ইলেক্ট্রনিক্স পণ্যের মতো ‘সংবেদনশীল নয়’ এমন সব খাতের বেচা-কেনা সংক্রান্ত চুক্তিগুলো চূড়ান্ত হতে পারে।
তবে মার্কিন প্রতিষ্ঠানগুলোর আশংকা, অর্থনৈতিক বাজার সম্প্রসারণের মতো বিষয়গুলো এই বৈঠকে তেমন গুরুত্ব নাও পেতে পারে।
মার্কিন-চীন ব্যবসায়িক কাউন্সিলের সভাপতি শন স্টেইন জানান, এখনো বড় কোনো প্রতিষ্ঠানের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা বৈঠকে যোগ দেওয়ার আমন্ত্রণ পাননি। তবে তিনি ইঙ্গিত দেন, কয়েকজন ব্যবসা খাতের প্রভাবশালী কয়েকজন কর্মকর্তা এতে যোগ দিতে পারেন।
‘শুল্কবিরতির’ মেয়াদ বাড়ানো
চীনের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের ‘শুল্কবিরতি’ চলছে। অর্থাৎ, আপাতত দেশ দুইটি একে অপরের পণ্য আমদানিতে বাড়তি কোনো শুল্ক আরোপ করছে না।
প্যাডিলা জানান, চীন এই শুল্কবিরতির মেয়াদ আরও বাড়িয়ে নিতে চায় এবং এ বিষয়টি নিয়ে তারা ট্রাম্পের সঙ্গে দরকষাকষি করবে।
বছরখানিক আগে ওয়াশিংটন ও বেইজিংয়ের পাল্টাপাল্টি শুল্ক আরোপ পত্রিকার শিরোনাম কেড়ে নিয়েছিল। তবে গত অক্টোবরে ট্রাম্প-শি দক্ষিণ কোরিয়ায় বৈঠক করে এক বছরের ‘শুল্কবিরতিতে’ সম্মতি দেন।
এরপর থেকে পরিস্থিতির অনেক পরিবর্তন হয়েছে।
আগের চুক্তিতে চীনের বিরুদ্ধে ফেন্টানিল মাদক সরবরাহ শৃঙ্খল সৃষ্টি ও কোনো কোনো খাতে অন্যায্য সুবিধা দেওয়ার অভিযোগের বিপরীতে কিছু পরিমাণ শুল্ক আরোপের স্বাধীনতা পেয়েছিল ওয়াশিংটন।
তবে চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে মার্কিন সুপ্রিম কোর্ট ট্রাম্পের অসংখ্য শুল্ক আরোপের নির্দেশনা বাতিল করে। এর মধ্যে মাদক পাচার সংক্রান্ত শুল্কও অন্তর্ভুক্ত।
যার প্রেক্ষাপটে, চীনের সঙ্গে মাদক পাচারের সংশ্লিষ্টতা খুঁজে পেতে নতুন করে তদন্তে নেমেছে মার্কিন প্রশাসন। এই তদন্তের ভিত্তিতে আরও টেকসই শুল্ক আরোপ করতে চান ট্রাম্প।
এ প্রসঙ্গে শন স্টেইন বলেন, ‘অবস্থাদৃষ্টে মনে হচ্ছে, এই শুল্কবিরতি খুব একটা শক্তিশালী নয়।’
ইরানের ওপর চাপ
ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যুদ্ধের কারণে ট্রাম্প তার চীন সফর পিছিয়ে দিয়েছিলেন। এবারের সফরেও ইরান যুদ্ধের ছায়া তাকে তাড়া করে বেড়াবে। এমনটাই মত বিশ্লেষকদের।
সে সময় অনেক বিশেষজ্ঞ এই দ্বিপাক্ষিক বৈঠকের ভবিষ্যৎ নিয়ে শঙ্কা প্রকাশ করেন।
উপদেষ্টা প্রতিষ্ঠান ডিজিএ-অলব্রাইট স্টোনব্রিজ গ্রুপের কর্মকর্তা জর্জ উটকে এএফপিকে বলেন, ‘প্রেসিডেন্ট (ট্রাম্প) কখনোই ইরানকে এমন অবস্থানে রাখবেন না যাতে তাদের ইচ্ছা তার নিজের সফরের ভবিষ্যৎ নির্ধারণ হয়।’
এ মুহূর্তে ট্রাম্পের সবচেয়ে বড় চাহিদা হলো ইরানকে একটি গ্রহণযোগ্য চুক্তিতে রাজি করানো। এই কাজে ইরানের ঘনিষ্ঠ বন্ধু চীনের সহায়তা চাইতে পারেন তিনি।
সাবেক মার্কিন বাণিজ্য কর্মকর্তা প্যাডিলা জানান, ইরানের ওপর ‘চাপ’ দেওয়ার বিষয়টি বৈঠকে উত্থাপন করতে পারেন ট্রাম্প।
অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞাকে পাশ কাটিয়ে ইরানের কাছ থেকে চীনের তেল কেনার বিষয়টিও আলোচনায় উঠে আসতে পারে বলে মত দেন মার্কিন বাণিজ্য প্রতিনিধি জেমিসন গ্রিয়ার।
হরমুজ প্রণালি বন্ধ করে দেওয়ায় বিশ্বজুড়ে তেল-গ্যাসের সংকট দেখা দিলেও চীন এ সমস্যায় খুব একটা প্রভাবিত হয়নি। তা সত্ত্বেও, এ বিষয়টি আলোচনায় আসতে পারে বলে মত দেন বিশ্লেষকরা।
চীনের বিরল খনিজ
বিশ্বে বিরল খনিজের সবচেয়ে বড় সরবরাহকারী চীন। ওয়াশিংটন-বেইজিং এর আলোচনায় উঠে আসতে পারে এই খাত।
ব্রুকিংস ইনস্টিটিউটের কর্মকর্তা রায়ান হাস বলেন, ‘শুল্কবিরতির সময়টাকে কাজে লাগিয়ে বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ খাতে চীনের ওপর নির্ভরশীলতা কমিয়ে বিকল্প উৎস তৈরি করতে চাইছেন ট্রাম্প।’
জর্জ উটকে এএফপিকে জানান, বিকল্প উৎস খুঁজলেও চীনের কাছ থেকে বিরল খনিজ আমদানি চালু রাখতে আগ্রহী ওয়াশিংটন। বিশেষ করে, নতুন অস্ত্র নির্মাণ ও ফুরিয়ে যাওয়া মজুত পূরণে এ বিষয়টি খুবই গুরুত্বপূর্ণ।
ইলেকট্রনিক্স থেকে শুরু করে সামরিক উপকরণ পর্যন্ত বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ খাতের কাঁচামাল হিসেবে চীনের বিরল খনিজের ব্যবহার রয়েছে।
তাইওয়ান প্রসঙ্গ
মধ্যপ্রাচ্য সংঘাতে কিছুটা ‘ধামাচাপা’ পড়েছে তাইওয়ান প্রসঙ্গ। তা সত্ত্বেও, বিষয়টি পুরোপুরি হারিয়ে যায়নি।
স্বশাসিত দ্বীপ তাইওয়ান প্রসঙ্গে মার্কিন দৃষ্টিভঙ্গি ও নীতি বদলাতে চাইবেন শি। বেইজিংয়ের দীর্ঘদিনের দাবি, তাইওয়ানও চৈনিক ভূখণ্ডের অংশ। এ বিষয়টি নিশ্চিতে এমন কী ‘সামরিক অভিযানের মাধ্যমে তাইওয়ান’ দখল করে নেওয়ার বিকল্প বিবেচনায় রাখতে চায় চীন।
সাবেক জো বাইডেন প্রশাসন বরাবরই ‘চীনের মরণথাবা’ থেকে তাইওয়ানকে রক্ষার অঙ্গীকার প্রকাশ করে এসেছে। কিন্তু সে তুলনায় ট্রাম্পের দৃষ্টিভঙ্গি অনেকটাই ভিন্ন।
এতে তাইওয়ানের সুরক্ষা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন বিশেষজ্ঞরা।
যুক্তরাষ্ট্রের কাছ থেকে ‘সুরক্ষা’ পাচ্ছে তাইওয়ান, আর এই সুরক্ষার জন্য যুক্তরাষ্ট্রকে পারিশ্রমিক দেওয়া উচিৎ—এমন মত প্রকাশ করে সমালোচনা ও বিরূপ প্রতিক্রিয়ার মুখে পড়েন রিপাবলিকান নেতা ট্রাম্প।
উটকে বলেন, ‘তাইওয়ান প্রসঙ্গে চীন খুবই নরম ভাবে দরকষাকষি করবে। তারা তাদের কার্ডগুলো খেলার বিষয়ে সতর্ক থাকবে।’




