চীনের কেল্লা অর্থনীতি: বৈশ্বিক অনিশ্চয়তার যুগে কৌশলগত পুনর্গঠন

তরুন ইউসুফ, কবি ও কলামিস্ট
তরুন ইউসুফ

বর্তমান বিশ্ব ব্যবস্থায় অর্থনীতি এক গভীর রূপান্তরের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। শীতল যুদ্ধের অবসান ও সোভিয়েত ইউনিয়নের ভাঙনের পর নব্বইয়ের দশক থেকে বিশ্ব অর্থনীতি আধুনিক বৈশ্বিকীকরণের নতুন যুগে প্রবেশ করে। এই সময় পূর্ব ও পশ্চিমের আদর্শিক বিভাজন অনেকটাই কমে যায় এবং বাজারভিত্তিক অর্থনীতি দ্রুত বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে পড়ে।

ফলাফল হিসেবে বিভিন্ন দেশের মধ্যে বাণিজ্য, বিনিয়োগ, প্রযুক্তি ও শ্রমের চলাচল অভূতপূর্বভাবে বৃদ্ধি পায়। এই ধারার একটি বড় বৈশিষ্ট্য ছিল বৈশ্বিক সরবরাহ শৃঙ্খল গড়ে ওঠা।

বৈশ্বিক সরবরাহ শৃঙ্খলের মাধ্যমে একটি পণ্য আর এক দেশে সম্পূর্ণ তৈরি না হয়ে বিভিন্ন দেশে ভাগ হয়ে উৎপাদিত হতে থাকে। একটি পণ্যের কাঁচামাল এক দেশ থেকে আসে, উৎপাদন হয় অন্য দেশে, তার বাজার আরেক দেশে।

ওয়ার্ল্ড ট্রেড অরগানাইজেশনের মতো প্রতিষ্ঠান আন্তর্জাতিক বাণিজ্যকে সহজ ও নিয়মতান্ত্রিক করে তোলে। একইসঙ্গে বহুজাতিক কোম্পানিগুলো বিশ্বজুড়ে তাদের কার্যক্রম ছড়িয়ে দেয়।

এই প্রক্রিয়ায় চীন, বাংলাদেশ, ভিয়েতনাম, ভারতের মতো উন্নয়নশীল দেশগুলো বৈশ্বিক উৎপাদন ব্যবস্থার গুরুত্বপূর্ণ অংশে পরিণত হয়। সস্তা শ্রম ও তুলনামূলক কম উৎপাদন খরচের কারণে তারা শিল্পায়নের সুযোগ পায়। অন্যদিকে উন্নত দেশগুলো কম খরচে পণ্য পেতে থাকে।

তবে এই বৈশ্বিকীকরণ শুধু অর্থনৈতিক সংযোগই বাড়ায়নি, দেশগুলোর পারস্পরিক নির্ভরতাও বৃদ্ধি করেছে। ফলে কোনো একটি দেশে সংকট তৈরি হলে তা দ্রুত অন্য দেশে ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকিও বেড়েছে।

এই ঝুঁকি কেমন হতে পারে তার উদাহরণ আমরা ২০০৮ সালের আর্থিক সংকট ও করোনা মহামারির সময় দেখেছি। অর্থাৎ শীতল যুদ্ধ-পরবর্তী বৈশ্বিকীকরণ বিশ্ব অর্থনীতিকে এক সুসংযুক্ত নেটওয়ার্কে রূপান্তর করেছে, যার মাধ্যমে সুযোগ বেড়েছে এবং ঝুঁকিও বেড়েছে অনেক।

সাম্প্রতিক সময়ের বাণিজ্য যুদ্ধ, প্রযুক্তিগত প্রতিযোগিতা, ভূরাজনৈতিক সংঘাত এবং সরবরাহ শৃঙ্খলের ভঙ্গুরতা—সব মিলিয়ে এক নতুন বাস্তবতা তৈরি হয়েছে। এই প্রেক্ষাপটে চীনের অর্থনৈতিক নীতিতে একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন লক্ষ করা যাচ্ছে, যাকে অনেক বিশ্লেষক কেল্লা অর্থনীতি (Fortress economy) হিসেবে অভিহিত করছেন।

এই ধারণাটি কেবল অর্থনৈতিক নীতি নয়; বরং সমন্বিত কৌশল—যার মাধ্যমে একটি দেশ নিজেকে বাইরের চাপ থেকে সুরক্ষিত রেখে অভ্যন্তরীণ শক্তিকে সুসংহত করে এবং একইসঙ্গে বৈশ্বিক প্রভাব বজায় রাখে। চীনের বর্তমান অর্থনৈতিক পথচলা বুঝতে হলে এই ধারণাটি গভীরভাবে বিশ্লেষণ করা জরুরি।

‘কেল্লা অর্থনীতি’ শব্দবন্ধটি মূলত একটি রূপক, যেখানে অর্থনীতিকে একটি দুর্গের সঙ্গে তুলনা করা হয়েছে। যেখানে শক্ত প্রাচীর আছে, অভ্যন্তরে পর্যাপ্ত সম্পদ সঞ্চিত আছে এবং বাইরের আক্রমণ বা অবরোধের মধ্যেও টিকে থাকার সক্ষমতা রয়েছে।

অর্থনীতির ভাষায়, এটি এমন একটি ব্যবস্থা যেখানে একটি দেশ খাদ্য ও জ্বালানি নিশ্চিত করার পাশাপাশি গুরুত্বপূর্ণ খাতে আত্মনির্ভর হয়ে ওঠে, কৌশলগত শিল্পে রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখে এবং বৈশ্বিক সংযোগকে নির্বাচিতভাবে ব্যবহার করে।

চীনের ক্ষেত্রে এই ধারণাটি বিশেষভাবে প্রাসঙ্গিক হয়ে ওঠে যখন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্য ও প্রযুক্তিগত প্রতিযোগিতা তীব্র আকার ধারণ করে। ২০১৮ সালে শুরু হওয়া বাণিজ্য যুদ্ধ ও পরবর্তী প্রযুক্তি নিষেধাজ্ঞা চীনকে উপলব্ধি করায় যে, বৈশ্বিক সরবরাহ শৃঙ্খলের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা দীর্ঘমেয়াদে ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে।

চীনের অর্থনৈতিক যাত্রা গত চার দশকে নাটকীয় পরিবর্তনের সাক্ষী। ১৯৭৮ সালে দেং জিয়াওপিংয়ের সংস্কার ও উন্মুক্তকরণ নীতির মাধ্যমে চীন ধীরে ধীরে বৈশ্বিক অর্থনীতির সঙ্গে যুক্ত হয়। বিদেশি বিনিয়োগ, রপ্তানি-নির্ভর শিল্পায়ন ও সস্তা শ্রমের সুবিধা কাজে লাগিয়ে চীন দ্রুত বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম অর্থনীতিতে পরিণত হয়।

কিন্তু এই উত্থানের মধ্যেই কিছু কাঠামোগত দুর্বলতা ছিল। প্রযুক্তি খাতে বিদেশি নির্ভরতা, জ্বালানি আমদানির ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা এবং বৈশ্বিক বাজারের ওপর অতিমাত্রায় নির্ভরতা চীনের জন্য ঝুঁকির কারণ হয়ে দাঁড়ায়। যখন যুক্তরাষ্ট্র চীনের প্রযুক্তি খাতকে লক্ষ্য করে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে, তখন এই দুর্বলতাগুলো স্পষ্ট হয়ে ওঠে।

এই প্রেক্ষাপটে চীন তার অর্থনৈতিক কৌশল পুনর্বিন্যাস শুরু করে, যার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে ডুয়েল সার্কুলেশন স্ট্র্যাটেজি বা দ্বৈত প্রবাহ ব্যবস্থা।

এই দ্বৈত প্রবাহ ব্যবস্থা এমন একটি কৌশল, যেখানে অভ্যন্তরীণ অর্থনীতিকে শক্তিশালী করার পাশাপাশি আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও সংযোগকে সম্পূর্ণভাবে ত্যাগ না করে কৌশলগতভাবে ব্যবহার করা হয়।

চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং ২০২০ সালের মে মাসে এই ধারণাটি প্রথম আনুষ্ঠানিকভাবে সামনে আনেন। এটি চিনা পলিটব্যুরোর মিটিংয়ে উত্থাপিত হওয়ার পর এর ওপর বিস্তারিত আলোচনা করা হয়।

পরবর্তীতে এটি চীনের নতুন অর্থনৈতিক কৌশল হিসেবে গ্রহণ করে চীনের চৌদ্দতম পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনার অংশ হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা হয়।

ডুয়েল সার্কুলেশন স্ট্র্যাটেজি মূলত দুটি স্তরের ওপর ভিত্তি করে গড়ে উঠেছে। প্রথমত, অভ্যন্তরীণ প্রবাহ—যার লক্ষ্য হলো দেশের অভ্যন্তরীণ চাহিদা, উৎপাদন ও প্রযুক্তিগত সক্ষমতা বৃদ্ধি করা। অর্থাৎ, দেশীয় বাজারকে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির প্রধান চালিকাশক্তি হিসেবে গড়ে তোলা। পাশাপাশি তেল, খাদ্যশস্য ও গুরুত্বপূর্ণ ধাতব খনিজের মজুত গড়ে তোলা।

এর আওতায় ২০২২ সাল নাগাদ চীনের কাছে বিশ্বের ৬৯ শতাংশ ভুট্টা, ৬০ শতাংশ চাল ও ৫১ শতাংশ গম মজুত ছিল। তাদের তেলের স্টকপাইল আনুমানিক ১ দশমিক ২ বিলিয়ন ব্যারেল—যা দিয়ে অন্তত ৩-৪ মাস তারা আমদানি ছাড়াই চলতে পারবে। অনেকে ধারনা করেন, চীনের স্টকপাইল এরচেয়ে অনেক বেশি।

দ্বিতীয়ত, বহির্মুখী প্রবাহ—যেখানে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও বিনিয়োগ বজায় রাখা, তবে কৌশলগতভাবে নিয়ন্ত্রিত। চীন আর আগের মতো অন্ধভাবে বৈশ্বিক বাজারের ওপর নির্ভর করতে চায় না।

এই দ্বৈত কৌশলই মূলত কেল্লা অর্থনীতির বাস্তব প্রয়োগ। চীনের কেল্লা অর্থনীতির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো প্রযুক্তিগত আত্মনির্ভরতা। সেমিকন্ডাক্টর শিল্প এর উৎকৃষ্ট উদাহরণ।

উন্নত চিপ উৎপাদনে চীন দীর্ঘদিন ধরে বিদেশি প্রযুক্তির ওপর নির্ভরশীল ছিল। যুক্তরাষ্ট্র যখন এই খাতে রপ্তানি নিয়ন্ত্রণ আরোপ করে, তখন চীন নিজস্ব চিপ উৎপাদন সক্ষমতা বাড়ানোর দিকে জোর দেয়।

এই লক্ষ্য অর্জনে সরকার ব্যাপক ভর্তুকি, গবেষণা বিনিয়োগ ও রাষ্ট্রীয় সহায়তা দিয়েছে। একইসঙ্গে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, কোয়ান্টাম কম্পিউটিং ও নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতেও চীন দ্রুত অগ্রসর হচ্ছে।

এই প্রচেষ্টা শুধু অর্থনৈতিক নয়; জাতীয় নিরাপত্তার অংশ হিসেবেও বিবেচিত হচ্ছে। চীনের অর্থনৈতিক মডেল একটি অনন্য মিশ্রণ, যেখানে বাজার অর্থনীতির উপাদান থাকলেও রাষ্ট্রের ভূমিকা অত্যন্ত শক্তিশালী। ব্যাংকিং, জ্বালানি, টেলিযোগাযোগ ও অবকাঠামো খাতে রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণ এখনো দৃঢ়।

কেল্লা অর্থনীতির প্রেক্ষাপটে এই নিয়ন্ত্রণ আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। কারণ, সংকটের সময়ে রাষ্ট্র দ্রুত সিদ্ধান্ত নিতে পারে এবং প্রয়োজনীয় সম্পদ নির্দিষ্ট খাতে সরিয়ে দিতে পারে।

চীন কেল্লা অর্থনীতি অনুসরণ করলেও এটি কোনো বিচ্ছিন্নতাবাদী নীতি নয়। বরং চীন বৈশ্বিক প্রভাব বিস্তার অব্যাহত রেখেছে। এর সবচেয়ে বড় উদাহরণ হলো চীনের বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ।

এই উদ্যোগের মাধ্যমে চীন এশিয়া, আফ্রিকা ও ইউরোপে অবকাঠামো উন্নয়নে বিনিয়োগ করছে বন্দর, রেলপথ, সড়ক ও জ্বালানি প্রকল্পে। এর ফলে একদিকে যেমন নতুন বাজার তৈরি হচ্ছে, অন্যদিকে চীন একটি বিকল্প অর্থনৈতিক নেটওয়ার্ক গড়ে তুলছে।

কেল্লা অর্থনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো নিজস্ব প্রভাব বলয় তৈরি করা, যাতে বৈশ্বিক চাপের মুখেও বিকল্প পথ খোলা থাকে।

কেল্লা অর্থনীতির কিছু ঝুঁকি থাকলেও এর সুবিধাই বেশি। সবচেয়ে বড় সুবিধা হলো স্থিতিশীলতা। বৈশ্বিক সংকট বা বাণিজ্যিক চাপের সময় একটি দেশ যদি অভ্যন্তরীণভাবে শক্তিশালী থাকে, তাহলে তুলনামূলকভাবে কম ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

এ ছাড়া, এই মডেল কৌশলগত স্বাধীনতা দেয়। বিদেশি প্রযুক্তি বা বাজারের ওপর নির্ভরতা কম থাকলে রাজনৈতিক চাপও কমে যায়। দীর্ঘমেয়াদে এটি দেশীয় শিল্পকে শক্তিশালী করে এবং প্রযুক্তিগত উন্নয়নের সুযোগ তৈরি করে।

চীনের কেল্লা অর্থনীতি শুধু চীনের জন্য নয়, বরং পুরো বিশ্বের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, চীন বৈশ্বিক সরবরাহ শৃঙ্খলের একটি কেন্দ্রবিন্দু। যদি চীন নির্দিষ্ট খাতে নিজেকে আলাদা করে ফেলে, তাহলে বিশ্বব্যাপী উৎপাদন ও বাণিজ্যে পরিবর্তন আসবে।

ইতোমধ্যে ‘ফ্রেন্ড-শোরিং’ ও ‘নেয়ার-শোরিং’য়ের মতো ধারণা জনপ্রিয় হয়ে উঠছে, যেখানে বিভিন্ন দেশ তাদের সরবরাহ শৃঙ্খল পুনর্গঠন করে রাজনৈতিকভাবে মিত্র দেশ ও ভৌগলিকভাবে নিকটবর্তী দেশে স্থানান্তর করছে।

বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশের জন্য চীনের কেল্লা অর্থনীতি গুরুত্বপূর্ণ কিছু শিক্ষা দেয়। প্রথমত, কৌশলগত খাতে আত্মনির্ভরতা জরুরি—বিশেষ করে খাদ্য, জ্বালানি ও প্রযুক্তিতে। দ্বিতীয়ত, বৈশ্বিক অর্থনীতির সঙ্গে সংযুক্ত থাকলেও অতিরিক্ত নির্ভরতা ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে। তৃতীয়ত, অবকাঠামো উন্নয়ন ও আঞ্চলিক সংযোগ বৃদ্ধির মাধ্যমে অর্থনৈতিক শক্তি বাড়ানো সম্ভব।

তবে বাংলাদেশকে চীনের মডেল হুবহু অনুসরণ না করে নিজের বাস্তবতা অনুযায়ী ভারসাম্যপূর্ণ কৌশল গ্রহণ করতে হবে।

চীনের কেল্লা অর্থনীতি আসলে সূক্ষ্ম ভারসাম্যের খেলা। এটি পুরোপুরি বন্ধ অর্থনীতি নয়, আবার সম্পূর্ণ উন্মুক্তও নয়। এর প্রধান উদ্দেশ্যই হলো অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা নিশ্চিত করে বিশ্ব ব্যবস্থায় যুক্ত হওয়া।

বিশ্ব অর্থনীতি এখন আর আগের মতো একমুখী নয়। বহুমাত্রিক, বিভক্ত ও প্রতিযোগিতামূলক এই নতুন বাস্তবতায় ভবিষ্যতে আরও অনেক দেশই হয়ত চীনের কেল্লা অর্থনীতি পথ অনুসরণ করার কথা ভাববে।

 

তরুন ইউসুফ: কবি ও কলামিস্ট