বরফের মহাদেশে মানুষের চাপ, রক্ষা পাবে তো ‘সম্রাট পেঙ্গুইন’?

স্টার অনলাইন ডেস্ক

অ্যান্টার্কটিকার বিস্তীর্ণ প্রান্তরে সম্রাট পেঙ্গুইনের দল যেন বরফের রাজ্যের নীরব প্রতীক। বছরের পর বছর জমাট সমুদ্রের বরফে ডিম পেড়ে, ছানা বড় করে টিকে আছে তারা। কিন্তু সেই বরফই এখন দ্রুত গলছে। আর তাতেই অনিশ্চিত হয়ে উঠছে পৃথিবীর সবচেয়ে বড় পেঙ্গুইন প্রজাতিটির ভবিষ্যৎ।

এই উদ্বেগের মধ্যেই জাপানের হিরোশিমায় শুরু হয়েছে অ্যান্টার্কটিকা বিষয়ক বার্ষিক আন্তর্জাতিক বৈঠক।

আজ মঙ্গলবার বার্তাসংস্থা এএফপির প্রতিবেদনে বলা হয়, বৈঠকে অংশ নিচ্ছে অ্যান্টার্কটিক চুক্তিতে সই করা মূল ১২টি দেশসহ মোট ৫৮টি দেশের প্রতিনিধিরা। পাশাপাশি উল্লেখযোগ্য গবেষণা কার্যক্রম পরিচালনাকারী আরও ১৭টি দেশের কর্মকর্তারাও সেখানে রয়েছেন।

হিরোশিমায় শুরু হয়েছে অ্যান্টার্কটিকা বিষয়ক বার্ষিক আন্তর্জাতিক বৈঠক। ছবি: এএফপি

১৯৫৯ সালের অ্যান্টার্কটিক চুক্তির মাধ্যমে মহাদেশটিকে ‘বিজ্ঞান ও শান্তির ভূমি’ হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছিল। একইসঙ্গে এর পরিবেশ ও বন্যপ্রাণী সংরক্ষণের অঙ্গীকারও করা হয়।

তবে এখন সেই বরফের মহাদেশই জলবায়ু পরিবর্তন ও মানুষের বাড়তে থাকা উপস্থিতির চাপে নতুন সংকটের মুখে।

হিরোশিমায় আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে অ্যান্টার্কটিক চুক্তি সচিবালয়ের নির্বাহী সচিব ফ্রান্সিসকো বার্গুনো বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনের মতো বৈশ্বিক চ্যালেঞ্জে যখন অ্যান্টার্কটিকা ক্রমেই বেশি প্রভাবিত হচ্ছে, তখন এই আলোচনা বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ।

তিনি সতর্ক করে বলেন, অ্যান্টার্কটিকা পৃথিবীর জলবায়ু ও মহাসাগর নিয়ন্ত্রণে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। এখানে নেওয়া সিদ্ধান্তগুলো অ্যান্টার্কটিকায় মানবিক কার্যক্রম সতর্কভাবে পরিচালনা নিশ্চিত করতে সহায়তা করে।

অ্যান্টার্কটিকার উত্তরাঞ্চলীয় উপদ্বীপ এলাকায় পেঙ্গুইনদের দেখা যাচ্ছে। ১৫ জানুয়ারি ২০২২। ছবি: রয়টার্স

এবারের বৈঠকের সবচেয়ে আলোচিত বিষয়গুলোর একটি হয়ে উঠেছে সম্রাট পেঙ্গুইনের ভবিষ্যৎ।

এএফপির প্রতিবেদনে বলা হয়, গত মাসে আন্তর্জাতিক প্রকৃতি সংরক্ষণ সংঘ (আইইউসিএন) প্রাণীটিকে ‘বিপন্ন’ হিসেবে ঘোষণা করে।

সংরক্ষণবাদী সংস্থা ওয়ার্ল্ড ওয়াইল্ডলাইফ ফান্ডও (ডব্লিউডব্লিউএফ) চাইছে, সম্রাট পেঙ্গুইনকে ‘বিশেষভাবে সংরক্ষিত প্রজাতি’ হিসেবে ঘোষণা করা হোক। এতে জাহাজ চলাচল ও পর্যটনের ওপর নতুন বিধিনিষেধ আরোপ করা হতে পারে।

মূলত জলবায়ু পরিবর্তনের কারণেই তাদের সংখ্যা দ্রুত কমে যাচ্ছে। কারণ সমুদ্রের বরফ আগেভাগেই গলে বা ভেঙে যাচ্ছে, যা তাদের বাসস্থান, শিকার ও প্রজননের জন্য অপরিহার্য।

ডব্লিউডব্লিউএফের মেরু অঞ্চল ও মহাসাগরবিষয়ক প্রধান উপদেষ্টা রড ডাউনি বলেন, এখনই ব্যবস্থা না নিলে বরফের এই প্রতীকী প্রাণীগুলো হয়তো এই শতাব্দীর শেষ নাগাদ বিলুপ্তির পথে এগোবে।

তবে হিরোশিমার বৈঠকে এ বিষয়ে দ্রুত কোনো ঐকমত্য হবে কি না, তা নিয়ে সংশয় রয়েছে। কয়েকটি সূত্র বলছে, তাৎক্ষণিক কোনো সিদ্ধান্ত হওয়ার সম্ভাবনা কম।

অন্যদিকে অ্যান্টার্কটিকায় দ্রুত বাড়তে থাকা পর্যটনও উদ্বেগ তৈরি করেছে বলে জানায় এএফপি।

ভেঙে পড়ছে বিশ্বের সবচেয়ে বড় বরফখণ্ড এ২৩এ। ছবি: রয়টার্স

তাদের প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪-২৫ মৌসুমে প্রায় ১ লাখ ২০ হাজার পর্যটক সেখানে ভ্রমণ করেছেন। একসময় যেখানে গবেষক ও বিজ্ঞানীদের উপস্থিতিই বেশি ছিল, এখন সেখানে বাড়ছে বিলাসবহুল ক্রুজ ভ্রমণ, কায়াকিং, হট এয়ার বেলুন ভ্রমণ, এমনকি মোটরবাইক চালানোর মতো কার্যক্রমও।

প্রতিনিধিরা এখন নির্দিষ্ট এলাকা বা কার্যক্রমের ওপর বিধিনিষেধ এবং পর্যটকের সংখ্যা সীমিত করার প্রস্তাব নিয়ে আলোচনা করছেন।

বিশেষজ্ঞদের মতে, বর্তমান নিয়মকানুন অ্যান্টার্কটিকায় পর্যটনের নতুন প্রবণতাগুলো সামাল দেওয়ার জন্য যথেষ্ট নয়।

জাপানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তা হিদেকি উয়ামা বলেন, অ্যান্টার্কটিকায় পর্যটন কীভাবে নিয়ন্ত্রণ ও পরিচালনা করা হবে, তা এখন একটি গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু হয়ে উঠেছে।