বোর্নিও থেকে রুয়ান্ডা: অ্যাটেনবোরোর সঙ্গে প্রকৃতির ৭ বিস্ময়কর গন্তব্যের পথে

মাহমুদ নেওয়াজ জয়
মাহমুদ নেওয়াজ জয়

প্রকৃতির ভাষ্যকার হিসেবে স্যার ডেভিড অ্যাটেনবোরো সাত দশকেরও বেশি সময় ধরে পৃথিবীর সবচেয়ে বিস্ময়কর প্রাকৃতিক দৃশ্য ও প্রাণিজগতকে মানুষের সামনে তুলে ধরেছেন। তার শান্ত, আস্থাভরা কণ্ঠ দর্শকদের নিয়ে গেছে পৃথিবীর এক প্রান্ত থেকে আরেক প্রান্তে; অদেখা প্রাণী, অজানা বাস্তুতন্ত্র আর অবিশ্বাস্য প্রাকৃতিক ঘটনার ভেতরে।

১৯৫৪ সালে শুরু হওয়া তার প্রথম বিখ্যাত সিরিজ ‘জু কোয়েস্ট থেকে শুরু করে সাম্প্রতিক আল্ট্রা এইচডি প্রজেক্ট পর্যন্তঅ্যাটেনবোরো পৃথিবীর নানা প্রান্তে ঘুরে প্রকৃতির গল্প বলেছেন। 

গতকাল তার শততম জন্মবার্ষিকী উপলক্ষে অ্যাটেনবোরোর ভ্রমণ ও কাজের অনুপ্রেরণা নিয়ে সাজানো হয়েছে সাতটি বিশেষ গন্তব্য, যেখানে প্রকৃতির সবচেয়ে মনোমুগ্ধকর দৃশ্যগুলো দেখা যায়।

১. বোর্নিও

১৯৫৬ সালে অ্যাটেনবোরো প্রথমবার বোর্নিও যান ‘জু কোয়েস্ট সিরিজের অংশ হিসেবে। স্থানীয় দায়াক জনগণের সহযোগিতায় তিনি বনে মধ্যে খুঁজে বের করেন ওরাংওটান। এক পর্যায়ে দেখা যায়, গাছের ডালে দুলছে লালচে লোমে মোড়া সেই বিরল প্রাণী।

এরপর বহু দশক ধরে তিনি বারবার বোর্নিও ফিরে গেছেন। ২০১৯ সালের ‘সেভেন ওয়ার্ল্ডস, ওয়ান প্ল্যানেট সিরিজে তিনি দেখান, কীভাবে বন উজাড় করায় ওরাংওটানের আবাসস্থল ধ্বংস হচ্ছে। 

আজ পর্যটকেরা বোর্নিওর টানজুং পুটিং ন্যাশনাল পার্কের ক্যাম্প লিকিতে যেতে পারেন। এটি একটি ওরাংওটান পুনর্বাসন ও গবেষণা কেন্দ্র। এখানে নিরাপদ দূরত্বে থেকে গাইডের সঙ্গে এই প্রাণীগুলো দেখা যায়।

ছবি: সংগৃহীত

২. অ্যান্টার্কটিকা

১৯৯৩ সালের ৬ পর্বের সিরিজ ‘লাইফ ইন দ্য ফ্রিজার-এ অ্যাটেনবোরো অ্যান্টার্কটিকার কঠিন পরিবেশে ঋতুভিত্তিক জীবনের গল্প তুলে ধরেন। আলবাট্রস, পেঙ্গুইন, সীলসবাই কীভাবে বরফাচ্ছন্ন পৃথিবীতে টিকে থাকে, তা দেখানো হয় এই সিরিজে। পর্যটকেরা সাধারণত আর্জেন্টিনার উশুয়াইয়া থেকে ক্রুজে করে এখানে পৌঁছান। ভয়ংকর ড্রেক প্যাসেজ পাড়ি দিয়ে অ্যান্টার্কটিক উপদ্বীপে পৌঁছালে দেখা যায় নীল তিমি, উইডেল সীল, হলুদ পালকের ম্যাকারনি আর পেঙ্গুইনের মতো প্রাণী।

লোনসাম জর্জ, ছবি: সংগৃহীত

৩. গ্যালাপাগোস দ্বীপপুঞ্জ

ইকুয়েডরের উপকূল থেকে ৬০০ মাইল দূরের এই দ্বীপপুঞ্জ চার্লস ডারউইনের বিবর্তন তত্ত্বের অনুপ্রেরণা। এখানে দেখা যায় বিশাল কচ্ছপ, নীল পায়ের বুবি পাখি, আর সামুদ্রিক ইগুয়ানা।

২০১৩ সালের ‘গ্যালোপাগোস উইথ ডেভিড অ্যাটেনবোরো সিরিজে তিনি ‘লোনসাম জর্জ নামের পিন্টা দ্বীপের শেষ কচ্ছপটিকে দেখেছিলেনযেটি ছিল তার প্রজাতির একমাত্র জীবিত সদস্য।

আজ পর্যটকেরা কুইটো বা গুয়ায়াকিল থেকে উড়ে এসে দ্বীপে পৌঁছান। ইসাবেলা দ্বীপে আগ্নেয়গিরির ভূখণ্ডে হাঁটা অথবা গ্যালাপাগোস সামুদ্রিক সংরক্ষণ এলাকায় স্নরকেলিং করা যায়।

ছবি: সংগৃহীত

৪. গ্রেট ব্যারিয়ার রিফ, অস্ট্রেলিয়া

অস্ট্রেলিয়ার পূর্ব উপকূল বরাবর ১ হাজার ৪৩০ মাইল বিস্তৃত এই প্রবাল প্রাচীর পৃথিবীর সবচেয়ে বড় সামুদ্রিক বাস্তুতন্ত্র। এখানে আছে দেড় হাজারের বেশি মাছের প্রজাতি এবং ৪০০ ধরনের প্রবাল।

অ্যাটেনবোরো প্রথম এখানে ডাইভ করেন ১৯৫৭ সালে। ২০১৫ সালের সিরিজে, ৮৯ বছর বয়সে তিনি সাবমেরিনে ৩০০ মিটার গভীরে নেমে অজানা প্রবাল প্রজাতি আবিষ্কার করেন এবং বিশাল গ্রুপার মাছের মুখোমুখি হন।

আজ এটি ডাইভিং ও স্নরকেলিংয়ের স্বর্গ। পাশাপাশি অনেক ট্যুরে প্রবাল পুনরুদ্ধার প্রকল্পে অংশ নেওয়ার সুযোগও থাকে।

৫. আলাস্কা, যুক্তরাষ্ট্র

২০০৯ সালের ‘ন্যাচারস গ্রেট ইভেন্টস সিরিজে আলাস্কার ‘স্যামন দৌড় দেখানো হয়। এটি একটি অভূতপূর্ব প্রাকৃতিক ঘটনা।

প্রতি বছর লাখ লাখ স্যামন প্রশান্ত মহাসাগর থেকে ফিরে আসে নিজেদের জন্মস্থানের নদীতে ডিম পাড়তে। পথে তারা শক্তিশালী স্রোত, শিকারি ভালুক ও অন্যান্য বিপদের মুখোমুখি হয়।

আলাস্কার কাটমাই ন্যাশনাল পার্কের ব্রুকস ফলসে দাঁড়িয়ে পর্যটকেরা এই দৃশ্য সরাসরি দেখতে পারেন। বিশেষ করে জুন থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত, যখন ভাল্লুকেরা মাছ ধরতে ব্যস্ত থাকে।

ছবি: সংগৃহীত

৬. রিচমন্ড পার্ক, লন্ডন

অ্যাটেনবোরো পৃথিবীর দূর-দূরান্তে কাজ করলেও তার সাম্প্রতিক প্রকল্পে তিনি নিজের শহর লন্ডনের প্রকৃতিও তুলে ধরেছেন।

ওয়াইল্ড লন্ডন নামে সিরিজটিতে দেখা যায়, শহরের ভেতরকার প্রাণীদের জীবনপিজনরা টিউব ট্রেনে ওঠে, ফ্যালকন সংসদ ভবনে বাসা বাঁধে আর রিজেন্টস ক্যানালে দেখা মেলে সাপের। 

রিচমন্ড পার্কে তিনি ৭০ বছরের বেশি সময় ধরে থাকেন। সেখানে আড়াই হাজার একর বিস্তৃত সবুজ ভূমি, প্রাচীন ওক গাছ, বাগান এবং শত শত হরিণ দেখা যায়। শহরটিতে যাদের বাস সেই ১৬৩৭ সাল থেকে।

ছবি: সংগৃহীত

৭. রুয়ান্ডা

১৯৭৮ সালের ‘লাইফ অন আর্থ সিরিজে অ্যাটেনবোরোর সবচেয়ে স্মরণীয় মুহূর্তগুলোর একটি ছিল রুয়ান্ডার ভলকানোস ন্যাশনাল পার্কে পর্বত গরিলাদের সঙ্গে তার সাক্ষাৎ।

একটি শুটিংয়ের সময় ছোট একটি গরিলা তার গায়ে উঠে বসে পড়ে৷ এই দৃশ্যটি আজও বিশ্বজুড়ে স্মরণীয়।

আজ পর্যটকেরা গাইডেড গরিলা ট্রেকিংয়ের মাধ্যমে সেই অভিজ্ঞতার কাছাকাছি যেতে পারেন। এই ট্যুর থেকে পাওয়া অর্থ সরাসরি সংরক্ষণ কার্যক্রমে ব্যবহৃত হয়। পাশাপাশি স্থানীয় পরিবেশ রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

আমাদের কৃতজ্ঞতার জায়গা 

স্যার ডেভিড অ্যাটেনবোরোর কাজ শুধু প্রকৃতির সৌন্দর্য দেখানো নয়। বরং মানুষকে এটা বোঝাতে পারা যে, এই সৌন্দর্য রক্ষা করা আমাদের দায়িত্ব। 

বোর্নিওর বন থেকে অ্যান্টার্কটিকার বরফ, গ্যালাপাগোসের দ্বীপ থেকে আফ্রিকার গরিলাসব জায়গায় তার গল্প আমাদের মনে করিয়ে দেয়, পৃথিবী কতটা বৈচিত্র্যময় এবং ভঙ্গুর।

এই সাতটি গন্তব্য শুধু ভ্রমণের জায়গা নয়, বরং প্রকৃতির জীবন্ত পাঠশালাযেখানে অ্যাটেনবোরোর চোখ দিয়ে পৃথিবীকে দেখা যায় নতুনভাবে।