৫ ট্যাংকারে মার্কিন হামলার জবাবে ১০ জাহাজে ইরানের আঘাত

স্টার অনলাইন ডেস্ক

ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে গত ছয় মাস ধরে চলা যুদ্ধে উভয় পক্ষের জাহাজ চলাচলে সবচেয়ে বড় হামলার ঘটনা ঘটেছে।

গতকাল বুধবার ইরান জানিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র তাদের পাঁচটি তেলবাহী ট্যাংকার ডুবিয়ে দেওয়ার পর প্রতিশোধ নিতে হরমুজ প্রণালির কাছে মার্কিন বাহিনীর সুরক্ষার আওতায় থাকা ১০টি জাহাজে তারা হামলা চালিয়েছে।

আজ বৃহস্পতিবার এই তথ্য জানিয়েছে বার্তা সংস্থা রয়টার্স।

এসব হামলার প্রভাব পড়েছে তেলের দামে। জুলাইয়ের পর প্রথমবারের মতো আন্তর্জাতিক বাজারের মানদণ্ড হিসেবে বিবেচিত ব্রেন্ট ক্রুডের দাম ব্যারেলপ্রতি ১০০ ডলার ছাড়িয়েছে।

হামলার ঘটনায় অন্তত একজন নাবিক নিহত এবং আরেকজন নিখোঁজ আছেন বলে জানা গেছে।

তুলনামূলক শান্ত একটি মাসের পর এসব হামলার ঘটনা ঘটল।

ওই সময়ে যুক্তরাষ্ট্র অর্থনৈতিক চাপ প্রয়োগের মাধ্যমে ইরানকে নতি স্বীকার করানোর উদ্যোগ নিয়েছিল।

ইরান আরও জানিয়েছে, তারা জর্ডানে অবস্থিত মার্কিন সামরিক ঘাঁটি লক্ষ্য করে ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ছুড়েছে। জর্ডান জানিয়েছে, তারা ১৮টি ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিহত করেছে এবং বাকি দুটি জনবসতিহীন এলাকায় আঘাত হানায় কোনো ক্ষয়ক্ষতি হয়নি।

এক মার্কিন কর্মকর্তা জানিয়েছেন, ওই ঘাঁটিতে মোতায়েন সব মার্কিন সেনার অবস্থান নিশ্চিত করা হয়েছে।

ইরানের বিপ্লবী রক্ষীবাহিনী জানিয়েছে, ভবিষ্যতে আরও হামলা হলে তারা আরও বড় আকারে পাল্টা জবাব দেবে।

তারা আরও জানিয়েছে, খুব শিগগির ইরানের উপকূলবর্তী একটি ‘সীমিত চলাচল’ এলাকার মানচিত্র প্রকাশ করা হবে। এটি পাকিস্তানের কাছাকাছি ইরানের উপকূলের চাবাহার পর্যন্ত বিস্তৃত হবে।

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প দাবি করেছেন, তেহরান নভেম্বরের মার্কিন মধ্যবর্তী নির্বাচনে প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা করছে। 

এই নির্বাচনের মাধ্যমে কংগ্রেসে রিপাবলিকান পার্টির নিয়ন্ত্রণ বহাল থাকবে কি না, তা নির্ধারিত হবে।

গণমাধ্যমকর্মীদের উদ্দেশে ট্রাম্প বলেন, ‘আমি মনে করি, নির্বাচনের পরপরই যুদ্ধ শেষ হবে, কারণ তারা আর বেশিদিন টিকে থাকতে পারবে না। নির্বাচনে প্রভাব ফেলার জন্য তারা উঠেপড়ে লেগেছে।’

বুধবার দিনের পরবর্তী অংশে ওয়াল স্ট্রিট জার্নালের একটি প্রতিবেদনে জানা যায়, ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিওসহ হোয়াইট হাউসের শীর্ষ উপদেষ্টারা ব্যক্তিগতভাবে ট্রাম্পকে সতর্ক করেছেন যে তার মেয়াদের পুরোটা জুড়েই (২০২৯ সালের জানুয়ারি পর্যন্ত) এই সংঘাত চলতে পারে।

রয়টার্স তাৎক্ষণিকভাবে ওই প্রতিবেদনের সত্যতা যাচাই করতে পারেনি।

সাম্প্রতিক দিনগুলোতে ইয়েমেনে সৌদি আরব ও হুতি বিদ্রোহীদের মধ্যেও লড়াই বেড়েছে। বর্তমান সংঘাতের এই ‘দ্বিতীয় যুদ্ধক্ষেত্র’ মধ্যপ্রাচ্য থেকে বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহের জন্য নতুন হুমকি তৈরি করছে।

মার্কিন সামরিক বাহিনীর দাবি, রাতভর অভিযান চালিয়ে তারা ইরানের পাঁচটি তেলবাহী ট্যাংকার ধ্বংস করেছে। ট্যাংকারগুলো ডুবে যাওয়ার আগে সেগুলোতে আগুন জ্বলতে থাকার ভিডিও প্রকাশ করেছে ওয়াশিংটন। 

সেন্ট্রাল কমান্ড বলেছে, ইরানের রক্ষীবাহিনী ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র দিয়ে একটি মার্কিন নৌবাহিনীর যুদ্ধজাহাজে দুবার হামলার চেষ্টা করায় এর জবাবে এসব হামলা চালানো হয়েছে।

যুক্তরাষ্ট্রের দাবি, এতে কোনো মার্কিন নাগরিক হতাহত হননি।

মার্কিন যুদ্ধজাহাজকে হুমকির মুখে ফেলে এমন হামলার জবাবে ইরানের ট্যাংকারে হামলার নতুন নীতি ঘোষণা করেছে ওয়াশিংটন।

যুক্তরাষ্ট্র বলেছে, গত এক সপ্তাহে তারা এখন পর্যন্ত ১০টি ট্যাংকারে হামলা চালিয়েছে।

কলম্বিয়া সফরের সময় সাংবাদিকদের রুবিও বলেন, ‘ইরান এখনো মার্কিন নৌবাহিনীর জাহাজে হামলার চেষ্টা করছে। তারা যতবার এমন করবে বা করার চেষ্টা করবে, ততবার তাদের ট্যাংকার হারাতে হবে।’

ইরান বলেছে, তারা দুটি মার্কিন জাহাজ ও আটটি ট্যাংকারে হামলা চালিয়েছে।

জাহাজটির তত্ত্বাবধায়ক প্রতিষ্ঠান পেনিনসুলা জানিয়েছে, দুবাই উপকূলে নোঙর করে থাকা তেলজাত পণ্যবাহী ট্যাংকার হারকিউলিস স্টারে এক নাবিক নিহত হয়েছেন এবং আরেকজন ক্রু নিখোঁজ রয়েছেন।

ব্রিটিশ সামুদ্রিক নিরাপত্তা সংস্থা ইউকেএমটিও জানিয়েছে, ওই এলাকার একটি জাহাজে প্রক্ষেপক আঘাত হানার পর সেটি একদিকে কাত হয়ে যায়।

রয়টার্স তাৎক্ষণিকভাবে নিশ্চিত করতে পারেনি, এটি একই জাহাজ কি না। প্রক্ষেপকের ধরনও জানা যায়নি।

ইরাকের দুই বন্দর কর্মকর্তা জানিয়েছেন, ইরাকের জলসীমায় ড্রোনের আঘাতে ২০ লাখ ব্যারেল ফুয়েল অয়েল বহনকারী নিউ অ্যান্ড্রোস নামের একটি ট্যাংকারে আগুন ধরে যায়।

জাহাজটির ২২ জন ক্রুর মধ্যে হতাহতের কোনো খবর পাওয়া যায়নি।

ইউকেএমটিও বলেছে, হরমুজ প্রণালির দুই পাশে উত্তর উপসাগর ও ওমান উপসাগরে বেশ কয়েকটি বাণিজ্যিক জাহাজে হামলা হয়েছে। হামলার জেরে ওই জাহাজগুলো অচল হয়ে পড়েছে।

একটি সামুদ্রিক নিরাপত্তা সূত্র জানিয়েছে, সংযুক্ত আরব আমিরাতের খোর ফাক্কান বন্দরে একটি তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসবাহী ট্যাংকার ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

ইরানের ফারস বার্তা সংস্থা বুধবার রাতে জানিয়েছে, দেশটির দক্ষিণাঞ্চলীয় বন্দরনগরী জাস্কের কাছে সমুদ্রের দিক থেকে একটি বিস্ফোরণের শব্দ শোনা গেছে। বিস্ফোরণের উৎস বা কারণ সম্পর্কে তাৎক্ষণিকভাবে কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি।

হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল ব্যাহত

সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে ওয়াশিংটন বেশ কয়েকবার দাবি করেছে, হরমুজ সম্পূর্ণ নিরাপদ এবং তারা এই গুরুত্বপূর্ণ নৌপথটি নিয়ন্ত্রণ করছে। যুদ্ধ শুরুর আগে বিশ্বের মোট তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস সরবরাহের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ এই প্রণালি দিয়ে পরিবহন করা হতো।

তবে বাস্তবতা ভিন্ন। কার্যত ইরানের নিয়ন্ত্রণে থাকা প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচল নেই বললেই চলে।

রিস্তাদ এনার্জি নামের গবেষণা প্রতিষ্ঠানের প্রধান অর্থনীতিবিদ ক্লদিও গালিমবার্তি বলেন, ‘হরমুজ প্রণালি দিয়ে জ্বালানি পরিবহনের পরিমাণ দিনে ২০ লাখ ব্যারেলে নেমে এসেছে। গত ৩০ আগস্ট নতুন করে দুই পক্ষের মধ্যে সংঘাত শুরুর আগের সপ্তাহে হরমুজ দিয়ে দৈনিক গড়ে ৮০ থেকে ৯০ লাখ ব্যারেল তেল পরিবহন হচ্ছিল।’

সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো, অপরিশোধিত ক্রুড ওয়েলের পাশাপাশি পরিশোধিত জ্বালানির দামও বাড়তে শুরু করেছে।

যুক্তরাষ্ট্রে খুচরা বাজারে ডিজেলের দাম সর্বকালের সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছে গেছে।

বুধবার যুক্তরাষ্ট্রে ডিজেলের গড় খুচরা দাম গ্যালনপ্রতি পাঁচ ডলার ৯৪ সেন্ট ছাড়িয়ে সর্বকালের সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছে।