চীন, ইরান, রাশিয়ার সঙ্গে দক্ষিণ আফ্রিকার নৌ মহড়া, আশঙ্কা নতুন উত্তাপের

স্টার অনলাইন ডেস্ক

কেপটাউনের উপকূলে রাশিয়া, ইরান ও চীনের সঙ্গে সপ্তাহব্যাপী যৌথ নৌ মহড়া শুরু করেছে দক্ষিণ আফ্রিকা।

আজ শনিবার 'উইল ফর পিস ২০২৬' নামের এই মহড়া শুরু হয়। যা শেষ হবে আগামী ১৬ জানুয়ারি।

বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা, এই মহড়া ওয়াশিংটনের সঙ্গে প্রিটোরিয়ার কূটনৈতিক সম্পর্কে আরও চাপ তৈরি করতে পারে।

উপকূলের কাছে এই মহড়াগুলো কেবল শক্তি প্রদর্শন নয় বরং ক্রমবর্ধমান সামুদ্রিক উত্তেজনার প্রেক্ষাপটে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতিক্রিয়া।

এর মাত্র কয়েক দিন আগে যুক্তরাষ্ট্র উত্তর আটলান্টিক মহাসাগরে একটি রুশ তেলবাহী জাহাজ ধাওয়া করে জব্দ করে। যুক্তরাষ্ট্রের দাবি, জাহাজটি পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞা লঙ্ঘন করে ভেনেজুয়েলা, রাশিয়া ও ইরানের উদ্দেশে অপরিশোধিত তেল বহন করছিল।

তার কিছুদিন আগেই কারাকাসে মার্কিন সামরিক অভিযানে ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট ও মস্কোর মিত্র নিকোলাস মাদুরোকে অপহরণ ও ক্ষমতাচ্যুত করা হয়।

চীনের নেতৃত্বে পরিচালিত এই মহড়াগুলো কেবল সামরিক অনুশীলন নয়, বরং উদীয়মান অর্থনীতির জোট ব্রিকসের দেশগুলোর মধ্যে একটি যৌথ সংকল্পের বহিঃপ্রকাশ বলে উল্লেখ করেন দক্ষিণ আফ্রিকার ন্যাশনাল ডিফেন্স ফোর্স (এসএএনডিএফ) এর জয়েন্ট অপারেশন ডিভিশনের কমান্ডার ক্যাপ্টেন নন্ডওয়াখুলু থমাস থামাহা।

উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে তিনি বলেন, 'এটি একসঙ্গে কাজ করার বিষয়ে আমাদের সম্মিলিত অঙ্গীকারের প্রদর্শন।' বার্তা সংস্থা এএফপি এ তথ্য জানিয়েছে।

থামাহা আরও বলেন, 'ক্রমশ জটিল হয়ে ওঠা সামুদ্রিক পরিবেশে এ ধরনের সহযোগিতা কোনো বিকল্প নয়, এটি অত্যাবশ্যক। আমাদের উদ্দেশ্য নৌপথ এবং সামুদ্রিক অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা।'

ব্রিকস জোটটি শুরুতে ব্রাজিল, রাশিয়া, ভারত, চীন ও দক্ষিণ আফ্রিকা নিয়ে গঠিত হলেও পরে এতে মিসর, ইথিওপিয়া, ইরান, সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও সবশেষ ইন্দোনেশিয়া যোগ দেয়।

এই নৌ মহড়ায় চীন ও ইরান ডেস্ট্রয়ার যুদ্ধজাহাজ মোতায়েন করেছে, রাশিয়া ও সংযুক্ত আরব আমিরাত পাঠিয়েছে করভেট শ্রেণির জাহাজ। স্বাগতিক দক্ষিণ আফ্রিকা একটি ফ্রিগেট যোগ করেছে। এছাড়া ইন্দোনেশিয়া, ইথিওপিয়া ও ব্রাজিল পর্যবেক্ষক হিসেবে মহড়ায় যোগ দিয়েছে।

'এক্সারসাইজ মোসি' নামে এই মহড়াগুলো গত বছরের নভেম্বরেই হওয়ার কথা ছিল, কিন্তু জোহানেসবার্গে অনুষ্ঠিত জি-২০ সম্মেলনের সঙ্গে সংঘাতের কারণে তা স্থগিত করা হয়। যুক্তরাষ্ট্র ওই সম্মেলন বর্জন করেছিল।

ওয়াশিংটন দক্ষিণ আফ্রিকা ও ব্রিকস জোটের বিরুদ্ধে 'মার্কিনবিরোধী' নীতির অভিযোগ তুলেছে। বিশ্বজুড়ে আগে থেকেই আরোপিত শুল্কের ওপর সদস্য দেশগুলো অতিরিক্ত ১০ শতাংশ শুল্কের মুখে পড়তে পারে বলেও সতর্ক করেছে।

রাশিয়ার সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্কসহ বিভিন্ন নীতিগত সিদ্ধান্তের কারণে দক্ষিণ আফ্রিকা আগেও যুক্তরাষ্ট্রের সমালোচনার মুখে পড়েছে। গাজা যুদ্ধ নিয়ে ওয়াশিংটনের মিত্র ইসরায়েলের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক বিচার আদালতে গণহত্যার মামলা দায়েরের সিদ্ধান্ত- তার মধ্যে একটি।

গত বছর যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প দক্ষিণ আফ্রিকার বিরুদ্ধে আফ্রিকানারদের—যারা শ্বেতাঙ্গ বসতিস্থাপনকারীদের বংশধর—উপর কথিত 'গণহত্যা' এবং তাদের জমি বাজেয়াপ্ত করার অভিযোগও তোলেন। দক্ষিণ আফ্রিকা এ অভিযোগ অস্বীকার করে।

দক্ষিণ আফ্রিকার প্রেসিডেন্ট সিরিল রামাফোসার আফ্রিকান ন্যাশনাল কংগ্রেসের (এএনসি) নেতৃত্বাধীন জাতীয় ঐক্য সরকারের অন্যতম অংশ দ্য ডেমোক্রেটিক অ্যালায়েন্স (ডিএ) এই মহড়ার সমালোচনা করেছে।

এক বিবৃতিতে ডিএ বলেছে, 'এই মহড়াগুলোকে "ব্রিকস সহযোগিতা" বলা আসলে একটি রাজনৈতিক কৌশল, যার মাধ্যমে আসল সত্য আড়াল করা হচ্ছে। বাস্তবে সরকার রাশিয়া ও ইরানের মতো বিতর্কিত ও নিষেধাজ্ঞাভুক্ত রাষ্ট্রগুলোর সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সামরিক সম্পর্ক বেছে নিচ্ছে।'

দেশটির নর্থ ওয়েস্ট ইউনিভার্সিটির রাজনৈতিক বিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক আন্দ্রে ডুভেনহাগে তুরস্কের বার্তা সংস্থা আনাদোলুকে শুক্রবার আশঙ্কা প্রকাশ করেন, এই যৌথ নৌ মহড়া ওয়াশিংটন ও প্রিটোরিয়ার সম্পর্ক আরও খারাপ করতে পারে।

তিনি বলেন, 'আমার কোনো সন্দেহ নেই যে এটি যুক্তরাষ্ট্রসহ অন্যান্য পশ্চিমা দেশের সঙ্গে সম্পর্ককে আরও জটিল করে তুলবে। বিষয়টি খুবই গুরুতর হতে পারে। এই মুহূর্তে আমাদের দেশের বিনিয়োগ, অর্থনৈতিক ও আর্থিক সহায়তা প্রয়োজন। এটি সমস্যাজনক; এটি ভুল মানুষের কাছে ভুল বার্তা দিচ্ছে।'

শুক্রবার স্থানীয় সম্প্রচারমাধ্যম নিউজরুম আফ্রিকাকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে দক্ষিণ আফ্রিকার উপপ্রতিরক্ষামন্ত্রী বান্তু হলোমিসা জানান, এসএএনডিএফ দীর্ঘদিন ধরেই অন্যান্য দেশের সঙ্গে এ ধরনের যৌথ নৌ মহড়ায় অংশ নিচ্ছে।

তিনি বলেন, 'এটা প্রথমবার নয় যে এসএএনডিএফ বন্ধুসুলভ দেশগুলোর সঙ্গে এমন মহড়া করছে। মনে রাখতে হবে, দক্ষিণ আফ্রিকা এখন ব্রিকসের অংশ এবং আরও অনেক দেশ ব্রিকসে যোগ দিয়েছে।'

২০২৩ সালে রাশিয়া ও চীনের সঙ্গে নৌ মহড়া আয়োজন করায়ও সমালোচিত হয়েছিল দক্ষিণ আফ্রিকা, কারণ তা ইউক্রেনে মস্কোর আগ্রাসনের প্রথম বার্ষিকীর সঙ্গে মিলে গিয়েছিল।

এই তিন দেশ প্রথমবারের মতো যৌথ নৌ মহড়া চালায় ২০১৯ সালে।