আশা করছি ইরানের বিরুদ্ধে সেনা অভিযানের প্রয়োজন পড়বে না: ট্রাম্প
ইরানের দোরগোড়ায় পৌঁছে গেছে মার্কিন নৌবহর। যেকোনো মুহূর্তে তেহরানে হামলা চালাতে প্রস্তুত রণতরী। অপেক্ষা শুধু মার্কিন প্রেসিডেন্ট ও দেশটির সেনাবাহিনীর সর্বাধিনায়ক ডোনাল্ড ট্রাম্পের নির্দেশের। যার ফলে স্বভাবগতই মধ্যপ্রাচ্যে নতুন করে সংঘাত ছড়িয়ে পড়ার উদ্বেগ-আশংকা পুরো বিশ্ববাসীকে আক্রান্ত করেছে।
এমন পরিস্থিতিতে আশার আলো দেখাচ্ছেন ট্রাম্প। তিনি আশাবাদ প্রকাশ করে বলেছেন, খুব সম্ভবত ইরানে হামলা চালানোর প্রয়োজন পড়বে না।
আজ শুক্রবার এই তথ্য জানিয়েছে বার্তা সংস্থা এএফপি।
ট্রাম্পের বক্তব্য
বুধবার ট্রাম্প হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, তেহরানের 'সময় ফুরিয়ে আসছে'। মধ্যপ্রাচ্যে সুবিশাল নৌবহর পাঠিয়ে তার হুমকিকে আরও বাস্তব করে তোলেন এই নেতা।
তবে বৃহস্পতিবার ট্রাম্প জানান, তিনি ইরানের সঙ্গে কথা বলছেন। আশ্বস্ত করেন, এখনো সামরিক অভিযান এড়ানোর উপায় আছে।
ইরানের সঙ্গে কোনো আলোচনা হয়েছে কী না, এ প্রশ্নের জবাবে ট্রাম্প সাংবাদিকদের বলেন, 'আমি কথা বলেছি আগে। আরও কথা বলার পরিকল্পনা করছি।'
'ইরান নামে একটি জায়গা আছে। সেখানে একটি সেনাদল রওনা হয়েছে। তবে আমি আশাবাদী, তাদেরকে ব্যবহার করার প্রয়োজন হবে না', যোগ করেন ট্রাম্প।
স্ত্রী মেলানিয়ার জীবন নিয়ে নির্মিত একটি তথ্যচিত্রের উদ্বোধনী অনুষ্ঠান শেষে তিনি গণমাধ্যমকর্মীদের প্রশ্নের জবাব দেন।
যে কারণে হামলার হুমকি
ডিসেম্বরের শেষের দিকে ইরানে সরকারবিরোধী বিক্ষোভ শুরু হয়। জানুয়ারির ৮ ও ৯ তারিখে পরিস্থিতি চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছায়। সে সময় বিক্ষোভকারীদের হত্যা করা হলে ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযান চালানোর অঙ্গীকার করেন ট্রাম্প।
তবে সাম্প্রতিক সময়ে ট্রাম্পের হুমকিগুলো মূলত পরমাণু কর্মসূচিকে ঘিরে। যুক্তরাষ্ট্র ও তার ঘনিষ্ঠ মিত্র ইসরায়েলের ভাষ্য, ইরানের পরমাণু কর্মসূচি এ অঞ্চলের নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতার প্রতি বড় হুমকি।
ইরান গোপনে 'পারমাণবিক বোমা' ও অন্যান্য অস্ত্র তৈরি করছে—এমন দাবি হরহামেশাই করে থাকেন ইসরায়েলি নেতা বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু। যদিও অদ্যাবধি এ বিষয়ে কোনো সুস্পষ্ট প্রমাণ দেখাতে পারেননি তিনি বা তার 'বন্ধু' ট্রাম্প।
অপরদিকে তেহরানের ভাষ্য, তারা শান্তিপূর্ণ কাজে ব্যবহারের জন্য পরমাণু সমৃদ্ধকরণ প্রকল্প নিয়ে কাজ করছে।
যুক্তরাষ্ট্রের দাবি, ইরানকে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ বন্ধ করতে হবে এবং তাদের হাতে থাকা তেজস্ক্রিয় উপাদানের সব তথ্য প্রকাশ করতে হবে। ইরানের দাবি, শান্তিপূর্ণ কাজে ব্যবহারের জন্য পরমাণু সমৃদ্ধ করার অধিকার সব দেশের আছে এবং বাইরের কোনো দেশ এ বিষয়টিতে নাক গলাতে পারে না।
বুধবার ট্রাম্প হুমকি দেন, ইরানের জন্য পরমাণু চুক্তিতে সই দেওয়ার সময় ফুরিয়ে আসছে। তিনি জানান, মধ্যপ্রাচ্যের পূর্বাঞ্চলে মোতায়েন করা নৌবহর ইরানে হামলা চালাতে 'প্রস্তুত, ইচ্ছুক ও সক্ষম।'
ইরানের পাল্টা হুঁশিয়ারি
গত বছরের জুনে ইসরায়েল-ইরানের ১২ দিনের যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রও যোগ দিয়েছিল। ইরানের সামরিক মুখপাত্র ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মোহাম্মাদ আকরামিনিয়া হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, ওই যুদ্ধে মার্কিনিরা অংশ নিলেও তাদেরকে শুধু 'আংশিক' জবাব দেওয়া হয়েছে। কিন্তু আবারও ওয়াশিংটনের পক্ষ থেকে হামলা এলে 'তাৎক্ষণিক ভাবে' এবং পূর্ণাঙ্গ আকারে পাল্টা জবাব দেবে তেহরান।
ব্রিগেডিয়ার জেনারেল আকরামিনিয়া রাষ্ট্রীয় টিভিতে দেওয়া সাক্ষাৎকারে বলেন, 'মার্কিন রণতরীগুলোর গুরুতর দুর্বলতা আছে এবং উপসাগরীয় অঞ্চলের অসংখ্য মার্কিন সেনা ঘাঁটি আমাদের মধ্যম পাল্লার ক্ষেপণাস্ত্রের আওতার মধ্যে।'
তিনি বলেন, 'আমেরিকানরা যদি হিসাবে ভুল করে (আমাদের ওপর হামলা চালিয়ে বসে) তাহলে নিশ্চিতভাবেই বলতে পারি, ট্রাম্প যেমনটা ভাবছেন, সেরকম কিছুই হবে না। দ্রুত অভিযান চালাবেন আর দুই ঘণ্টা পর টুইট করে বলবেন, অভিযান শেষ—পরিস্থিতি এমন হবে না।'
মার্কিন সেনাঘাঁটি আছে এমন একটি উপসাগরীয় দেশের এক কর্মকর্তা এএফপিকে বলেন, ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের হামলার আশংকা 'খুবই স্পষ্ট'।
নাম না প্রকাশের শর্তে কর্মকর্তা বলেন, 'এতে পুরো অঞ্চলে গোলযোগ দেখা দেবে। এটা শুধু এ অঞ্চলের অর্থনীতিকেই বিঘ্নিত করবে না। যুক্তরাষ্ট্রও বিপদে পড়বে। কারণ তেল ও গ্যাসের দাম আকাশ ছোঁবে।'
উত্তেজনা কমানোর যত উদ্যোগ
কাতারের নেতা শেখ তামিম বিন হামাদ আল থানি ও ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান ফোনে আলোচনা করেছেন।
কাতার নিউজ এজেন্সি (কিউএনএ) জানিয়েছে, দুই নেতা ফোনে '(ওয়াশিংটন-তেহরানের) টানাপোড়েন কমিয়ে আনা ও স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনার উপায়' খুঁজতে আলোচনা করেছেন।
ইরানের পারমাণবিক প্রকল্প নিয়ে ওয়াশিংটন-তেহরানের টানাপোড়েনের মধ্যে জাতিসংঘের মহাসচিব সংকট এড়ানোর আহ্বান জানিয়েছেন। উভয় পক্ষকে পরমাণু চুক্তিতে সম্মতি অনুরোধ করে আন্তোনিও গুতেরেস বলেন, 'আপনারা এই সংকট এড়ান। যা পুরো অঞ্চলে ভয়াবহ বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে।'
আজ শুক্রবার ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাকচি আঙ্কারা সফরে যাচ্ছেন। ওই সফরে তার সঙ্গে বৈঠক করবেন তুরস্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রী হাকান ফিদান।
কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, ওই বৈঠকে ওয়াশিংটন-তেহরানের মধ্যে আলোচনার আয়োজন ও মধ্যস্থতার আনুষ্ঠানিক প্রস্তাব রাখবেন হাকান।



