যুক্তরাষ্ট্র ইরানে হামলা চালালে কী হতে পারে?

স্টার অনলাইন ডেস্ক

যুক্তরাষ্ট্র আগামী কয়েক দিনের মধ্যেই ইরানে হামলা চালাতে পারে, এমন ইঙ্গিত স্পষ্ট হয়ে উঠছে। বিবিসি বলছে, সম্ভাব্য লক্ষ্যবস্তুগুলো মোটামুটি অনুমানযোগ্য হলেও, এর পরিণতি কী হবে তা নিশ্চিত নয়।

সুতরাং, যদি শেষ মুহূর্তে তেহরানের সঙ্গে কোনো সমঝোতা না হয় এবং প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প যুক্তরাষ্ট্রের বাহিনীকে হামলার নির্দেশ দেন, তাহলে কী কী ঘটতে পারে?

সার্জিক্যাল স্ট্রাইক ও গণতন্ত্রে উত্তরণ

ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস (আইআরজিসি) ও তাদের অধীনস্থ আধাসামরিক বাহিনী বসিজের ঘাঁটি, ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণ ও সংরক্ষণ কেন্দ্র এবং ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচিকে লক্ষ্য করে সীমিত ও নিখুঁত হামলা চালাতে পারে যুক্তরাষ্ট্রের বিমান ও নৌবাহিনী।

এতে ইতোমধ্যেই দুর্বল হয়ে পড়া ইরানের শাসনব্যবস্থা ভেঙে পড়তে পারে এবং শেষ পর্যন্ত একটি প্রকৃত গণতন্ত্র রূপ নিতে পারে, যার মাধ্যমে দেশটি আবার বিশ্বের মূল ধারায় ফিরে আসতে পারবে।

তবে এটি অত্যন্ত আশাবাদী এক দৃশ্যপট। ইরাক ও লিবিয়ায় পশ্চিমা সামরিক হস্তক্ষেপ গণতন্ত্রে মসৃণ উত্তরণ আনেনি। যদিও উভয় ক্ষেত্রেই নৃশংস স্বৈরতন্ত্রের অবসান ঘটেছিল, তবে তারপর বহু বছর ধরে বিশৃঙ্খলা ও রক্তপাত চলেছে।

অন্যদিকে সিরিয়া, যেখানে ২০২৪ সালে পশ্চিমা সামরিক সহায়তা ছাড়াই প্রেসিডেন্ট বাশার আল-আসাদকে উৎখাত করে নিজস্ব বিপ্লব সংঘটিত হয়, এখন পর্যন্ত তুলনামূলকভাবে ভালো অবস্থায় আছে।

শাসন টিকে থাকবে, তবে নীতিতে নমনীয়তা আসবে

এটিকে মোটামুটিভাবে 'ভেনেজুয়েলা মডেল' বলা যেতে পারে, যেখানে যুক্তরাষ্ট্রের দ্রুত ও শক্তিশালী পদক্ষেপ শাসনব্যবস্থাকে অক্ষত রাখে, তবে তাদের নীতিতে পরিবর্তন আনতে বাধ্য করে।

ইরানের ক্ষেত্রে এর মানে হলো, ইসলামি প্রজাতন্ত্র টিকে থাকবে, যা বহু ইরানির কাছে গ্রহণযোগ্য নয়; তবে মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে সহিংস মিলিশিয়াদের প্রতি সমর্থন কমাতে হবে, পারমাণবিক ও ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি বন্ধ বা সীমিত করতে হবে এবং অভ্যন্তরীণ বিক্ষোভ দমনে কিছুটা সংযত হতে হবে।

এটিও সম্ভাবনার দিক থেকে কম সম্ভাব্য দৃশ্যপট।

ইসলামি প্রজাতন্ত্রের নেতৃত্ব গত ৪৭ বছর ধরে অনড় ও পরিবর্তনবিমুখ। এখনো তারা মনোভাব পরিবর্তনে সক্ষম বলে মনে হয় না।

শাসন ভেঙে পড়বে, সামরিক শাসনের আবির্ভাব 

অনেকেই মনে করেন, ইরানের এটিই সবচেয়ে সম্ভাব্য পরিণতি।

দেশটির শাসনব্যবস্থা বহু মানুষের কাছে অ-জনপ্রিয় হলেও এবং ধারাবাহিক বিক্ষোভ একে দুর্বল করে তুললেও, নিরাপত্তা-নির্ভর একটি শক্তিশালী 'ডিপ স্টেট' এখনো বিদ্যমান, যাদের বর্তমান ব্যবস্থায় স্বার্থ জড়িত রয়েছে।

এখন পর্যন্ত বিক্ষোভগুলো সফল না হওয়ার প্রধান কারণ হলো, ক্ষমতাসীন কাঠামোর ভেতর উল্লেখযোগ্য ভাঙন ধরেনি, আর যারা ক্ষমতায় আছে তারা টিকে থাকার জন্য সীমাহীন বলপ্রয়োগ ও নিষ্ঠুরতা চালাতে প্রস্তুত।

যুক্তরাষ্ট্রের হামলার পরবর্তী বিশৃঙ্খলায় ইরান শেষ পর্যন্ত আইআরজিসি-প্রধান একটি শক্ত সামরিক সরকারের অধীনে চলে যেতে পারে, এমন সম্ভাবনা উড়িয়ে দেওয়া যায় না।

যুক্তরাষ্ট্র ও প্রতিবেশীদের ওপর ইরানের পাল্টা হামলা

ইরান ঘোষণা দিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের যেকোনো হামলার জবাব দেওয়া হবে। তাদের ভাষায়, 'ট্রিগারে আঙুল রাখা আছে'।

যুক্তরাষ্ট্রের নৌ ও বিমান বাহিনীর শক্তির সঙ্গে ইরান পাল্লা দিতে না পারলেও, তাদের কাছে ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোনের বড় ভাণ্ডার রয়েছে, যার অধিকাংশ গুহা, ভূগর্ভস্থ স্থাপনা বা দুর্গম পাহাড়ি এলাকায় লুকানো।

বাহরাইন ও কাতারসহ উপসাগরীয় অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের বহু ঘাঁটি রয়েছে। পাশাপাশি, যুক্তরাষ্ট্রের হামলায় যারা সহযোগী বলে বিবেচিত হবে, যেমন জর্ডান—তাদের গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোতেও ইরান আঘাত হানতে পারে।

২০১৯ সালে সৌদি আরামকোর তেল ও পেট্রোকেমিক্যাল স্থাপনায় ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা, যার দায় ইরান-সমর্থিত ইরাকি মিলিশিয়ার ওপর চাপানো হয়, সৌদি আরবকে দেখিয়ে দিয়েছিল তারা কতটা ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে।

যুক্তরাষ্ট্রের মিত্র উপসাগরীয় আরব দেশগুলো এই আশঙ্কায় চরম উদ্বিগ্ন যে, মার্কিন সামরিক পদক্ষেপ শেষ পর্যন্ত তাদের ওপরই প্রতিঘাত হয়ে ফিরে আসতে পারে।

উপসাগরে মাইন পেতে প্রতিশোধ

ইরান-ইরাক যুদ্ধ (১৯৮০–৮৮) থেকে শুরু করে এটি দীর্ঘদিন ধরেই বৈশ্বিক নৌপরিবহন ও জ্বালানি সরবরাহের জন্য একটি বড় হুমকি হিসেবে বিবেচিত। সেসময় ইরান সত্যিই নৌপথে মাইন পেতেছিল, আর ব্রিটিশ রয়্যাল নেভির মাইন অপসারণকারী জাহাজগুলো সেগুলো পরিষ্কার করতে সহায়তা করেছিল।

ইরান ও ওমানের মাঝের সংকীর্ণ হরমুজ প্রণালি একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ 'চোকপয়েন্ট'। প্রতিবছর বিশ্বের প্রায় ২০ শতাংশ তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) এবং ২০–২৫ শতাংশ তেল ও তেলজাত পণ্য এই প্রণালি দিয়ে পরিবাহিত হয়।

ইরান দ্রুত সমুদ্র-মাইন মোতায়েনের মহড়া চালিয়েছে। যদি তারা সত্যিই এটি করে, তাহলে বৈশ্বিক বাণিজ্য ও তেলের দামে বড় ধরনের প্রভাব পড়বে।

মার্কিন যুদ্ধজাহাজ ডুবিয়ে দিতে পারে ইরান

উপসাগরে থাকা একটি যুদ্ধজাহাজে একবার এক মার্কিন নৌ-ক্যাপ্টেন বিবিসির সংবাদদাতাকে বলেছিলেন, ইরান থেকে আসা সবচেয়ে ভয়ংকর হুমকিগুলোর একটি হলো 'সোয়ার্ম অ্যাটাক'।

এর অর্থ—একসঙ্গে বিপুল সংখ্যক উচ্চ-ক্ষমতাসম্পন্ন ড্রোন ও দ্রুতগামী টর্পেডো নৌকা দিয়ে হামলা চালানো, যাতে মার্কিন নৌবাহিনীর শক্তিশালী প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা সবগুলো ঠেকাতে না পারে।

উপসাগরীয় অঞ্চলে প্রচলিত ইরানি নৌবাহিনীর জায়গা অনেক আগেই আইআরজিসি নৌবাহিনী দখল করেছে। তাদের কিছু কমান্ডার শাহের আমলে যুক্তরাষ্ট্রের ডার্টমাউথেও প্রশিক্ষণ নিয়েছিলেন।

এই বাহিনী মূলত 'অপ্রথাগত' যুদ্ধকৌশলে প্রশিক্ষিত, যার উদ্দেশ্য হলো প্রযুক্তিগতভাবে এগিয়ে থাকা মার্কিন পঞ্চম নৌবহরের সুবিধাকে পাশ কাটানো।

কোনো মার্কিন যুদ্ধজাহাজ ডুবে যাওয়া এবং এর নাবিকদের কেউ কেউ বন্দী হওয়া, যুক্তরাষ্ট্রের জন্য ভয়াবহ অপমানজনক হবে।

যদিও এই দৃশ্যপটকে তুলনামূলকভাবে কম সম্ভাব্য ধরা হয়, তবু ২০০০ সালে ইয়েমেনের এডেন বন্দরে আল-কায়েদার আত্মঘাতী হামলায় এক বিলিয়ন ডলারের ডেস্ট্রয়ার ইউএসএস কোল অচল হয়ে যায় এবং ১৭ জন মার্কিন নাবিক নিহত হন।

এরও আগে, ১৯৮৭ সালে এক ইরাকি যুদ্ধবিমান ভুলবশত ইউএসএস স্টার্কে দুটি এক্সোসেট ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করলে ৩৭ জন নাবিক নিহত হন।

ইরানজুড়ে বিশৃঙ্খলা ও গৃহযুদ্ধের আশঙ্কা

এটি একটি বাস্তব ও বড় ঝুঁকি এবং কাতার ও সৌদি আরবের মতো প্রতিবেশী দেশগুলোর অন্যতম প্রধান উদ্বেগ।

গৃহযুদ্ধের আশঙ্কার পাশাপাশি (যেমন সিরিয়া, ইয়েমেন ও লিবিয়ায় দেখা গেছে) বিশৃঙ্খলার মধ্যে জাতিগত উত্তেজনাও সশস্ত্র সংঘাতে রূপ নিতে পারে। কুর্দি, বেলুচসহ অন্যান্য সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠী জাতীয় ক্ষমতার শূন্যতায় নিজেদের সুরক্ষায় অস্ত্র ধরতে পারে।

মধ্যপ্রাচ্যের অনেক দেশই ইসলামি প্রজাতন্ত্রের পতন দেখতে চাইবে, বিশেষ করে ইসরায়েল, যারা ইতোমধ্যে এই অঞ্চলে ইরানের প্রক্সি গোষ্ঠীগুলোর ওপর বড় আঘাত হেনেছে এবং ইরানের সন্দেহভাজন পারমাণবিক কর্মসূচিকে অস্তিত্বগত হুমকি হিসেবে দেখে।

তবে কেউই চায় না, প্রায় ৯ কোটি ৩০ লাখ মানুষের এই মধ্যপ্রাচ্যের সবচেয়ে জনবহুল দেশটি বিশৃঙ্খলায় ডুবে যাক এবং এক ভয়াবহ মানবিক ও শরণার্থী সংকটের সৃষ্টি হোক।

সবচেয়ে বড় আশঙ্কা হলো, ইরানের সীমান্তের কাছে এই বিপুল সামরিক শক্তি জড়ো করার পর প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প হয়তো ভাববেন, এখন পদক্ষেপ না নিলে মুখরক্ষা হবে না। আর সেখান থেকেই শুরু হতে পারে এমন এক যুদ্ধ, যার শেষ পরিণতি অস্পষ্ট এবং যার প্রভাব হবে অনিশ্চিত ও ভয়াবহ।