ফিতনা-আল-হিন্দুস্তান ও ফিতনা-আল-খারিজ কী, ভারতের সঙ্গে সংশ্লিষ্টতা আছে?

স্টার অনলাইন ডেস্ক

পাকিস্তানের বেলুচিস্তান প্রদেশে নিরাপত্তা বাহিনীর সঙ্গে ভয়াবহ সংঘর্ষে আজ শনিবার অন্তত ৬৭ 'সন্ত্রাসী' নিহত হয়েছেন বলে জানিয়েছে দেশটির প্রভাবশালী সংবাদমাধ্যম ডন।

প্রতিবেদনে বলা হয়, বেলুচিস্তানের অন্তত ১২টি স্থানে সন্ত্রাসীদের সমন্বিত হামলার চেষ্টা ব্যর্থ করে দিলেও নিরাপত্তা বাহিনী ও পুলিশের ১০ সদস্য প্রাণ হারিয়েছেন।

ডন বলছে, পাকিস্তান রাষ্ট্রীয়ভাবে বেলুচিস্তানভিত্তিক সন্ত্রাসী গোষ্ঠীগুলোকে 'ফিতনা-আল-হিন্দুস্তান' নামে অভিহিত করছে। এর মাধ্যমে দেশটিতে সন্ত্রাস ও অস্থিতিশীলতা সৃষ্টিতে ভারতের কথিত ভূমিকার বিষয়টিও তুলে ধরা হচ্ছে বলে জানিয়েছে রাষ্ট্রীয় কর্তৃপক্ষ।

বেলুচিস্তানে এই সংঘর্ষের ঘটনায় নড়েচড়ে বসেছে পাকিস্তান সরকার। দেশটির প্রেসিডেন্ট আসিফ আলী জারদারি ও প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ 'ফিতনা-আল-হিন্দুস্তান' সন্ত্রাসীদের কুচক্রী প্রচেষ্টা ঠেকিয়ে দেওয়ায় নিরাপত্তা বাহিনীর ভূয়সী প্রশংসাও করেছেন।

তথ্যমন্ত্রী আতাউল্লাহ তারার এসব হামলাকে 'সন্ত্রাসীদের মরিয়া চেষ্টা' উল্লেখ করে জিও নিউজকে বলেছেন, 'নিরাপত্তা বাহিনী ফিতনা-আল-হিন্দুস্তান ও ফিতনা-আল-খারিজের যোদ্ধাদের পরাজিত করার দ্বারপ্রান্তে রয়েছে।'

পাকিস্তানের আন্তঃবাহিনী জনসংযোগ পরিদপ্তরের (আইএসপিআর) মহাপরিচালক লেফটেন্যান্ট জেনারেল আহমেদ শরীফ চৌধুরী গত ৬ জানুয়ারির এক সংবাদ সম্মেলনে জানান, ২০২৫ সালে পাকিস্তানজুড়ে আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলো ৭৫ হাজার ১৭৫টি গোয়েন্দা অভিযান পরিচালনা করেছে। গত বছর দেশে ৫ হাজার ৩৯৭টি সন্ত্রাসী হামলার ঘটনা ঘটেছে। পাল্টা অভিযানে ২ হাজার ৫৯৭ জন 'সন্ত্রাসী' নিহত হয়েছেন।

এখন প্রশ্ন হলো 'ফিতনা-আল-হিন্দুস্তান' ও 'ফিতনা-আল-খারিজ' কী, বাস্তবে এমন কোনো সংগঠনের অস্তিত্ব আছে, কিংবা ভারতের সঙ্গেই বা তাদের সম্পর্ক কী? চলুন জেনে নেই।

'ফিতনা-আল-হিন্দুস্তান' ও 'ফিতনা আল-খারিজ'

পাকিস্তানের নিরাপত্তা বাহিনী ও রাষ্ট্রীয় সূত্র সাম্প্রতিক সহিংসতার প্রেক্ষাপটে নিয়মিতভাবে দুটি পরিভাষা ব্যবহার করছে 'ফিতনা-আল-হিন্দুস্তান' ও 'ফিতনা-আল-খারিজ'।

নামের ধরন দেখে এগুলোকে অনেক সময় স্বতন্ত্র সশস্ত্র সংগঠন মনে হলেও বাস্তবে এই দুটি কোনো নির্দিষ্ট সংগঠনের নাম নয়। বরং এগুলো পাকিস্তানের রাষ্ট্রীয়ভাবে তৈরি করা রাজনৈতিক ও আদর্শিক নিরাপত্তা বয়ান, যার মাধ্যমে ভিন্ন ধরনের সহিংস হুমকিকে আলাদা ফ্রেমে ব্যাখ্যা করা হচ্ছে।

দুটি পরিভাষা, দুটি ভিন্ন ফ্রেম

রাষ্ট্রীয় ভাষ্যে 'ফিতনা-আল-হিন্দুস্তান' এবং 'ফিতনা-আল-খারিজ' এই দুটি শব্দের মাধ্যমে মূলত সহিংসতার দুটি ভিন্ন উৎসকে আলাদা করে উপস্থাপন করা হয়।

'ফিতনা-আল-হিন্দুস্তান' শব্দটি ব্যবহার করা হয় মূলত বেলুচিস্তানভিত্তিক বিচ্ছিন্নতাবাদী সহিংসতা বোঝাতে। পাকিস্তানের অভিযোগ, এসব গোষ্ঠী ভারতের মদদে দেশটির অখণ্ডতা ও নিরাপত্তা ক্ষুণ্ন করার চেষ্টা করছে। এই পরিভাষার মাধ্যমে বেলুচিস্তানের সহিংসতাকে একটি বহিঃশক্তি-সমর্থিত ষড়যন্ত্রের কাঠামোতে উপস্থাপন করা হয়।

অন্যদিকে 'ফিতনা-আল-খারিজ' ব্যবহৃত হয় ধর্মের নামে সহিংসতা চালানো চরমপন্থি গোষ্ঠী বোঝাতে। এখানে 'খারিজ' শব্দটি ইসলামের প্রাথমিক যুগের খারিজি মতবাদ থেকে নেওয়া, যারা চরমপন্থী ব্যাখ্যার মাধ্যমে সহিংসতাকে বৈধতা দিয়েছিল। রাষ্ট্রীয় ভাষ্যে আজকের কিছু উগ্রপন্থী গোষ্ঠীকে সেই ঐতিহাসিক ধারার আধুনিক রূপ হিসেবে তুলে ধরা হয়।

বাংলায় 'ফিতনা' শব্দটিকে বিশৃঙ্খলা, কলহ বা ফাসাদ এবং 'খারিজ' শব্দটিকে বাতিল বা বর্জন বোঝাতে ব্যবহৃত হয়।

afp_20260131_94np2zq_v1_highres_pakistanunrestsouthwest.jpg
বিধ্বস্ত গাড়ি। ছবি: এএফপি

একাধিক গোষ্ঠী, কিন্তু কোনো 'সংগঠন' নয়

এই দুটি পরিভাষার একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য হলো, এগুলো কোনো একক সংগঠনকে নির্দেশ করে না। বাস্তবে এগুলোর আওতায় আসে একাধিক আলাদা সশস্ত্র গোষ্ঠী, যাদের লক্ষ্য, কৌশল ও আদর্শ এক নয়। তবে রাষ্ট্রীয় বয়ানে এসব পার্থক্য গৌণ হয়ে যায়, গুরুত্ব পায় একটি সম্মিলিত 'হুমকি'র চিত্র।

ফলে নিরাপত্তা অভিযানের বর্ণনায় বলা হয়, 'ফিতনা-আল-হিন্দুস্তান' বা 'ফিতনা-আল-খারিজ'-এর বিরুদ্ধে অভিযান, যা বাস্তবে একাধিক ভিন্ন গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে পরিচালিত হয়—যেসব গোষ্ঠীর হয়তো ভিন্ন নামও রয়েছে।

কেন এই পরিভাষা ব্যবহার করছে পাকিস্তান?

বিশ্লেষকদের মতে, এই ভাষ্য ব্যবহারের পেছনে রাষ্ট্রীয় কর্তৃপক্ষের কয়েকটি কৌশলগত উদ্দেশ্য রয়েছে।

প্রথমত, সহিংসতার নৈতিক বৈধতাকে সম্পূর্ণভাবে নাকচ করা। 'ফিতনা' শব্দটি ব্যবহার করে রাষ্ট্র বোঝাতে চায়, এই শক্তিগুলো ধর্ম, জাতিসত্তা বা রাজনৈতিক অধিকারের প্রতিনিধি নয়, তারা কেবল বিশৃঙ্খলা সৃষ্টিকারী।

দ্বিতীয়ত, জনসমর্থন ও নিরাপত্তা ঐক্য তৈরি করা। বহিঃশত্রু বা ধর্ম-বিকৃতির ফ্রেম সাধারণ জনগণের কাছে কঠোর নিরাপত্তা অভিযানের গ্রহণযোগ্যতা বাড়ায়।

তৃতীয়ত, আন্তর্জাতিক বার্তা দেওয়া। বিশেষ করে 'ফিতনা-আল-হিন্দুস্তান' পরিভাষার মাধ্যমে পাকিস্তান আঞ্চলিক প্রতিদ্বন্দ্বিতাকে আন্তর্জাতিক মঞ্চে তুলে ধরতে চায়।

আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি ও বিতর্ক

এই দুটি নামের কোনোটিরই আন্তর্জাতিক পর্যায়ে স্বীকৃতি নেই। জাতিসংঘ বা পশ্চিমা দেশগুলোর সন্ত্রাসী তালিকায় 'ফিতনা-আল-হিন্দুস্তান' বা 'ফিতনা-আল-খারিজ' নামে কোনো সংগঠন নেই। ফলে আন্তর্জাতিক বিশ্লেষণে এগুলোকে মূলত পাকিস্তানের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক ভাষ্য হিসেবে দেখা হয়।

ভারতের অবস্থান

ভারত 'ফিতনা-আল-হিন্দুস্তান' সংক্রান্ত পাকিস্তানি কর্তৃপক্ষের অভিযোগগুলোকে ধারাবাহিকভাবে অস্বীকার করে আসছে। এ বিষয়ে নয়াদিল্লির বক্তব্য, পাকিস্তান বেলুচিস্তানের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক সংকট ও শাসনব্যবস্থার ব্যর্থতা আড়াল করতে প্রায়ই এমন অভিযোগ তোলে।

অন্যদিকে ধর্মীয় চরমপন্থা নিয়ে আন্তর্জাতিক উদ্বেগ থাকলেও 'ফিতনা-আল-খারিজ' নামটি বাইরে খুব কম ব্যবহৃত হয়।

বাস্তব সংকট কোথায়?

সমালোচকদের মতে, এই ধরনের পরিভাষা ব্যবহার সহিংসতার একটি দিক ব্যাখ্যা করলেও মূল রাজনৈতিক ও সামাজিক সংকটকে আড়াল করে দিতে পারে।

বেলুচিস্তানে সহিংসতার পেছনে দীর্ঘদিনের অভিযোগ, যেমন রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্বের ঘাটতি, প্রাকৃতিক সম্পদের বণ্টন নিয়ে অসন্তোষ ও নিরাপত্তা অভিযান ঘিরে মানবাধিকারের প্রশ্ন রয়েছে।

এ ছাড়া, ধর্মীয় চরমপন্থা রোধের ক্ষেত্রে মাদ্রাসা সংস্কার, আদর্শিক মোকাবিলা ও সামাজিক পুনর্বাসনের মত বিষয়গুলোও রয়েছে।

এই বিষয়গুলো কেবল নিরাপত্তা বয়ানের ভেতরে সমাধান করা কঠিন।