বেলুচিস্তান লিবারেশন আর্মি কারা, তাদের বিরুদ্ধে কেন যুদ্ধে নেমেছে পাকিস্তান?
পাকিস্তানের বেলুচিস্তানে নিরাপত্তা বাহিনীর নজিরবিহীন অভিযানে ১৪৫ 'সন্ত্রাসী' নিহত হয়েছে বলে জানিয়েছেন প্রদেশটির মুখ্যমন্ত্রী সরফরাজ বুগতি।
সামরিক বাহিনীর গণমাধ্যম শাখা জানায়, শনিবার 'ফিতনা-আল-হিন্দুস্তান'-এর সন্ত্রাসীরা বেলুচিস্তানের বিভিন্ন স্থানে একযোগে হামলা চালায়। এর জবাবে নিরাপত্তা বাহিনী ৯২ সন্ত্রাসীকে হত্যা করে।
দেশটির প্রভাবশালী সংবাদমাধ্যম ডন বলছে, পাকিস্তান সরকার বেলুচিস্তানভিত্তিক সন্ত্রাসী গোষ্ঠীগুলোকে 'ফিতনা-আল-হিন্দুস্তান' হিসেবে অভিহিত করছে। পাকিস্তানে সন্ত্রাস ও অস্থিতিশীলতায় ভারতের মদদদানের অভিযোগ তুলে ধরতেই এ নামকরণ।
আজ রোববার কোয়েটায় সংবাদ সম্মেলনে মুখ্যমন্ত্রী বুগতি জানান, গত ৪০ ঘণ্টায় ১৪৫ সন্ত্রাসী নিহত হয়েছে এবং তাদের মরদেহ কর্তৃপক্ষের হেফাজতে রয়েছে।
তিনি বলেন, 'সন্ত্রাসবিরোধী যুদ্ধে পাকিস্তান যে লড়াই চালাচ্ছে, তাতে এটিই এখন পর্যন্ত সর্বোচ্চ সংখ্যা।'
বুগতি আরও জানান, পুলিশ, এফসি (ফ্রন্টিয়ার কর্পস) ও নৌবাহিনীর এক সদস্যসহ আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ১৭ জন নিহত এবং ৩১ বেসামরিক নাগরিক হতাহত হয়েছেন।
এর আগে শনিবার রাতে পাকিস্তানের আন্তঃবাহিনী জনসংযোগ পরিদপ্তর (আইএসপিআর) জানায়, অভিযানে ১৫ নিরাপত্তা সদস্য এবং হামলায় নারী ও শিশুসহ ১৮ বেসামরিক নাগরিক নিহত হন।
রাষ্ট্র শোকাহত পরিবারগুলোর পাশে আছে উল্লেখ করে মুখ্যমন্ত্রী জানান, তাদের কাছে এ ধরনের হামলার গোয়েন্দা তথ্য ছিল। তাই একদিন আগেই প্রাক-অভিযান শুরু করা হয়। সেসব অভিযানে শাবান ও পাঞ্জগুরে প্রায় ৪০ সন্ত্রাসী নিহত হয়।
বুগতি বলেন, সন্ত্রাসীরা শাবান থেকে কোয়েটায় হামলার পরিকল্পনা করেছিল, তবে বাহিনী ছিল 'খুবই সতর্ক'।
গদ্বরে পাঁচ নারী ও তিন শিশু নিহত হওয়ার ঘটনাটিকে 'সবচেয়ে বেদনাদায়ক' বলে উল্লেখ করেছেন মুখ্যমন্ত্রী।
স্বাধীনতার বয়ান তৈরির প্রসঙ্গে তিনি বলেন, 'আপনি যখন একটি ইউনিয়ন পরিষদ বা ওয়ার্ডও মুক্ত করতে পারেন না, তখন কেন বেলুচদের জ্বালানি হিসেবে ব্যবহার করছেন, কার নির্দেশে? ভারতের।'
তিনি দাবি, 'পাকিস্তান যখনই অর্থনৈতিক বা পররাষ্ট্র অঙ্গনে এগোতে শুরু করে, তখনই ভারতের নির্দেশে এ ধরনের হামলা চালিয়ে দেশকে অস্থিতিশীল করার চেষ্টা করা হয়।'
মুখ্যমন্ত্রী জানান, সন্ত্রাসীরা রেড জোনে ঢুকে গুরুত্বপূর্ণ সব স্থাপনা দখলের পরিকল্পনা করেছিল, কিন্তু তা ব্যর্থ করে দেওয়া হয়েছে।
ঘটনার পর তল্লাশি ও চিরুনি অভিযান চলছে জানিয়ে তিনি বলেন, 'আমরা তাদের ছাড়ব না।'
সন্ত্রাসকে 'রাজনৈতিক ইস্যু' হিসেবে দেখানোর চেষ্টারও সমালোচনা করেন বুগতি।
তিনি বলেন, 'বিএলএ (বেলুচিস্তান লিবারেশন আর্মি) কি কোনো নিবন্ধিত রাজনৈতিক দল, যাদের সঙ্গে সংলাপ করতে হবে? তারা বন্দুকের জোরে তাদের মতাদর্শ চাপিয়ে দিতে চায় এবং বেলুচদের একটি অর্থহীন যুদ্ধে ঠেলে দিচ্ছে। আপনারা এই যুদ্ধকে বঞ্চনার সঙ্গে যুক্ত করে সহিংসতাকে যুক্তিযুক্ত করার চেষ্টা করছেন।'
'জাতিগত জাতীয়তাবাদের নামে এই সহিংসতাকে যৌক্তিক বলা সরাসরি বিএলএকে সমর্থনের শামিল', বলেন তিনি।
সংলাপের সম্ভাব্য ফল কী? এই প্রশ্ন তুলে মুখ্যমন্ত্রী বলেন, 'সংলাপের নামে কি তারা আমাদের আত্মসমর্পণ করাতে চায়? আমরা করব না। হাজার বছর লাগলেও আমরা এই যুদ্ধ লড়ব।'
তিনি আরও বলেন, 'এক সেকেন্ডের জন্যও আমরা আত্মসমর্পণে প্রস্তুত নই। তারা হাজারটা হামলা চালাতে পারে, আমাদের অস্থিতিশীল করার চেষ্টা করতে পারে, কিন্তু এক ইঞ্চিও নিতে পারবে না। এই পাকিস্তান ভাঙার জন্য নয়। তারা পারবে না, তাদের প্রভুরাও পারবে না।'
বুগতি বলেন, 'কিছু সর্দার ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের মতো উপকরণ ব্যবহার করে তরুণদের রাষ্ট্র থেকে বিচ্ছিন্ন করার চেষ্টা চলছে।'
তিনি জনগণ ও তরুণদের সঙ্গে সম্পৃক্ততা আরও জোরদারের অঙ্গীকার করেছেন।
এক প্রশ্নের জবাবে তিনি জানান, সন্ত্রাসীরা কেবল সন্ত্রাসী, তাদের 'বেলুচ সন্ত্রাসী' বলা হলে তিনি কষ্ট পান।
তিনি বলেন, 'সন্ত্রাসীরা সাধারণ মানুষের ভেতর মিশে থাকে। আমরা কি তাদের মতো নৃশংস হব?'
'একটি মর্টার ছুড়ে ১০ জন সন্ত্রাসীকে মারতে পারি, কিন্তু তাদের সঙ্গে থাকা ২০ জন বেসামরিক মানুষের কী হবে? এই কারণেই আমরা তাদের মতো নৃশংস হতে চাই না', বলেন তিনি।
বেলুচিস্তান সমস্যা 'বলপ্রয়োগে সমাধান সম্ভব নয়', এমন বক্তব্যেরও সমালোচনা করে তিনি প্রশ্ন তোলেন, 'কবে বেলুচিস্তানে বলপ্রয়োগ করা হয়েছে?' তিনি দাবি করেন, কোনো শহরে সামরিক অভিযান চালানো হয়নি।
তিনি জোর দিয়ে বলেন, 'এটি পুরোপুরি গোয়েন্দাভিত্তিক যুদ্ধ এবং বেলুচিস্তানে কেবল গোয়েন্দা তথ্যভিত্তিক অভিযান চালানো হচ্ছে।'
ভারতের 'র'-এর বিরুদ্ধে সন্ত্রাসে মদদ দেওয়ার অভিযোগ তুলে তিনি বলেন, 'কর্তৃপক্ষের কাছে এর সুস্পষ্ট প্রমাণ আছে।'
সাম্প্রতিক হামলাগুলোতে 'সব ধরনের' অস্ত্র ব্যবহৃত হয়েছে দাবি করে মুখ্যমন্ত্রী বলেন, 'যুক্তরাষ্ট্রের আফগানিস্তান ত্যাগের পর যেসব অস্ত্র বাজারে ছড়িয়ে পড়েছে, সেগুলো তাদের প্রভুদের মাধ্যমে সন্ত্রাসীদের হাতে পৌঁছেছে।'
'ক্লিয়ারেন্স' অভিযান চলছে: প্রতিরক্ষামন্ত্রী
গতকালের হামলার পর বেলুচিস্তানে শান্তি প্রতিষ্ঠিত হয়েছে এবং নিরাপত্তা বাহিনী এখন 'ক্লিয়ারেন্স অভিযান' চালাচ্ছে বলে জানিয়েছেন দেশটির প্রতিরক্ষামন্ত্রী খাজা আসিফ।
শিয়ালকোটে সাংবাদিকদের তিনি বলেন, 'এই মুহূর্তে শান্তি প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। সমন্বিত হামলা পুরোপুরি প্রতিহত করা হয়েছে এবং সন্ত্রাসীরা পিছু হটেছে।'
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মহসিন নাকভির বক্তব্যের প্রতিধ্বনি করে আসিফ বলেন, প্রতিবেশী ভারত এসব ঘটনার জন্য দায়ী এবং এসব হামলার উদ্দেশ্য ছিল 'দেশ যখন অগ্রগতির পথে, তখন তাকে অস্থিতিশীল করা'।
তিনি বলেন, 'আমাদের গোয়েন্দা তথ্য ও সন্ত্রাসীদের স্বীকারোক্তি, সবই ভারতের সঙ্গে সংযোগ প্রমাণ করে।'
বিএলএ নারী আত্মঘাতী হামলাকারীদের ব্যবহার করছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, 'শনিবারের দুটি হামলায় নারীরা জড়িত ছিলেন।'
'তরুণ নারীদের মন বিষাক্ত করা হচ্ছে এবং বিএলএ এখন জীবিকা নির্বাহে সংগ্রামরত শ্রমিক ও দরিদ্র মানুষকেও টার্গেট করছে', যোগ করেন তিনি।
শান্তি নিশ্চিতে পাকিস্তানের 'অটল অংশীদার' যুক্তরাষ্ট্র
যুক্তরাষ্ট্রের চার্জ দ্য অ্যাফেয়ার্স নাটালি বেকার বেলুচিস্তানে সন্ত্রাসী হামলার তীব্র নিন্দা জানিয়ে বলেছেন, শান্তি নিশ্চিতে যুক্তরাষ্ট্র পাকিস্তানের পাশে 'অটল অংশীদার' হিসেবে থাকবে।
এক্সে (সাবেক টুইটার) তিনি বলেন, 'যুক্তরাষ্ট্র ৩১ জানুয়ারির হামলা এবং বেলুচিস্তানে নিরাপত্তা সদস্য ও বেসামরিক নাগরিকদের বিরুদ্ধে সন্ত্রাসী সহিংসতার তীব্র নিন্দা জানায়, যার দায় স্বীকার করেছে বেলুচিস্তান লিবারেশন আর্মি, যা যুক্তরাষ্ট্র ঘোষিত বিদেশি সন্ত্রাসী সংগঠন।'
নিহতদের পরিবার ও ক্ষতিগ্রস্তদের প্রতি সমবেদনা জানিয়ে তিনি বলেন, 'পাকিস্তানের জনগণের সহিংসতা ও ভয়মুক্ত জীবনযাপনের অধিকার রয়েছে।'
২০২৫ সালের আগস্টে যুক্তরাষ্ট্র বিএলএ ও এর মাজিদ ব্রিগেড স্কোয়াডকে বিদেশি সন্ত্রাসী সংগঠন (এফটিও) ঘোষণা করে।
যুক্তরাষ্ট্র ছাড়াও ব্রিটিশ হাইকমিশন, কাতার ও সৌদি আরব বেলুচিস্তানে সর্বশেষ সন্ত্রাসী তৎপরতার নিন্দা জানিয়েছে।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মহসিন নাকভি ধারাবাহিক হামলার জন্য ভারতকে দায়ী করে বলেছেন, জড়িত প্রত্যেকের বিরুদ্ধে এবং 'পেছনের প্রভুদের' বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
২০২৪ সালে পাকিস্তানে সন্ত্রাসী সহিংসতার অন্যতম প্রধান গোষ্ঠী হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে বিএলএ।
বেলুচিস্তান লিবারেশন আর্মি (বিএলএ)
১৯৭৪ সালের আগস্টে আবদুল মজিদ বেলুচ নামের এক যুবক হাতে গ্রেনেড নিয়ে একটি গাছে লুকিয়ে ছিলেন। কোয়েটার ওই স্থানে তখন পাকিস্তানের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী জুলফিকার আলী ভুট্টো এক জনসভায় ভাষণ দিচ্ছিলেন। সেসময় বেলুচিস্তান ছিল বিদ্রোহের কবলে। তরুণ বেলুচ বিদ্রোহী মজিদের উদ্দেশ্য ছিল ভুট্টোকে হত্যা করা, কিন্তু তিনি ব্যর্থ হন। নিরাপত্তা বাহিনীর হাতে ধরা পড়ার পর দুর্ঘটনাবশত তার হাতে থাকা গ্রেনেডটি বিস্ফোরিত হয় এবং ঘটনাস্থলেই তার মৃত্যু হয়।
ছত্রিশ বছর পর প্রদেশটিতে আরেক দফা বিদ্রোহ চলাকালে বিএলএ আত্মঘাতী হামলাকারীদের একটি ইউনিট গঠন করে। সেই ইউনিটের নাম রাখা হয় মজিদের নামে—মজিদ ব্রিগেড।
২০০০ সালে বিএলএ গঠিত হয় বলে ধারণা করা হয়। বাস্তবে ২০০৬ সালের পর সংগঠনটি ক্রমেই আরও সহিংস হয়ে ওঠে, যখন পাকিস্তানের তৎকালীন সামরিক শাসক জেনারেল পারভেজ মোশাররফ একটি অভিযান পরিচালনার নির্দেশ দেন, যার ফলে প্রভাবশালী বেলুচ গোত্রনেতা আকবর বুগতি নিহত হন। মোশাররফ বেলুচ গোত্রনেতাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ করেছিলেন যে তারা 'বেলুচিস্তানের অগ্রগতি ব্যাহত করছেন' এবং 'প্রদেশের জন্য বরাদ্দ রাষ্ট্রীয় তহবিল আত্মসাৎ করছেন'। যদিও ১৯৭০–এর দশকের বিদ্রোহের সময় বুগতি রাষ্ট্রের পক্ষেই অবস্থান নিয়েছিলেন।
১৯৪৮ সাল থেকে এখন পর্যন্ত বেলুচ জাতীয়তাবাদীদের অন্তত পাঁচটি সশস্ত্র অভ্যুত্থান ঘটেছে। এর একটি এখনো চলমান।
২০১১ সালের পর থেকে বিএলএ তাদের প্রভাববলয় বিস্তৃত করতে শুরু করে এবং প্রদেশের বাইরের গণমাধ্যমের নজরেও আসতে থাকে, বিশেষ করে আত্মঘাতী হামলা কৌশল গ্রহণের পর, যা একসময় ইসলামপন্থী সন্ত্রাসী গোষ্ঠীগুলোর ক্ষেত্রেই সীমিত ছিল। বিএলএ পুরোপুরি ধর্মনিরপেক্ষ একটি সংগঠন এবং তাদের পূর্বসূরিদের 'বামপন্থী' উত্তরাধিকারও কিছুটা ধরে রাখতে পেরেছে, যদিও তাদের লেখালেখিতে এখন আর মার্ক্স বা মাওয়ের প্রভাব তেমন নেই, বরং সেখানে রয়েছে অস্পষ্টভাবে বামঘেঁষা এক ধরনের বেলুচ জাতীয়তাবাদ।
এ কারণেই অবাক হওয়ার কিছু নেই যে, অনেক অ-বেলুচ 'প্রগতিশীল', যারা দীর্ঘদিন ধরে বিএলএকে ইসলামপন্থী সশস্ত্র গোষ্ঠী থেকে আলাদা করে দেখানোর চেষ্টা করেছেন, তারা এখন বিএলএর ক্রমবর্ধমান চরমপন্থী কৌশলের কারণে ক্ষোভ ও বিদ্রুপের মুখে পড়েছেন, যেখানে এখন জাতিগত নির্মূলের মতো সহিংসতা ও আত্মঘাতী হামলাও অন্তর্ভুক্ত।
সাধারণত বেলুচ লিবারেশন ফ্রন্ট (বিএলএফ)-এর মধ্যে বিএলএর শিকড় খোঁজা হয়। ১৯৭০–এর দশকের বিদ্রোহের সময় বিএলএফ ছিল অন্যতম বৃহৎ বেলুচ সশস্ত্র সংগঠন। বিএলএফ স্বাধীন বেলুচিস্তান এবং 'জাতীয় কমিউনিজম'-এর পক্ষে ছিল, যে ধারণাটি প্রথম যুগোস্লাভ মার্ক্সবাদী মিলোভান জিলাস কমিউনিজম ও জাতিগত জাতীয়তাবাদের সংমিশ্রণ বোঝাতে ব্যবহার করেন। তবে বহু বছর পর যখন বিএলএ গঠিত হয়, তখনও বিএলএফ অস্তিত্বশীল ছিল।
বিএলএ'র আরও নিকটবর্তী উৎস পাওয়া যায় ১৯৮৮ সালের নির্বাচনী পরীক্ষার মধ্যে। সেসময় অধিকাংশ বেলুচ সংগঠনের নেতৃত্বে ছিলেন গোত্রনেতারা, আর একইসঙ্গে ধীরে ধীরে বিকশিত হচ্ছিল একটি বেলুচ মধ্যবিত্ত শ্রেণি। বেলুচ ছাত্রসংগঠনগুলো গোত্রনেতাদের প্রতি হতাশা প্রকাশ করতে শুরু করেন। তাদের অভিযোগ ছিল, গোত্রনেতারা 'বেলুচ স্বার্থের' তীব্রতা কমিয়ে দিচ্ছেন। ১৯৮৮ সালের নির্বাচনের মাত্র কয়েক মাস আগে তরুণ মধ্যবিত্ত বেলুচ কর্মীরা বেলুচিস্তান ন্যাশনাল মুভমেন্ট (বিএনএম) গঠন করেন। দলটি বেলুচিস্তানের কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ আসনে জয়লাভ করে বিশ্লেষকদের বিস্মিত করে দেয়, যেগুলো একসময় গোত্রনেতাদের শক্ত ঘাঁটি হিসেবে বিবেচিত হতো।
১৯৯০–এর দশকের মাঝামাঝি সময়ে বিএনএম বিভক্ত হলেও, এটি ছিল 'বিদ্রোহী' বেলুচ গোত্রনেতা ও তরুণ মধ্যবিত্ত বেলুচ জাতীয়তাবাদীদের মধ্যকার বাড়তে থাকা বিভাজনের প্রথম দিককার প্রকাশগুলোর একটি। এই প্রেক্ষাপটে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় প্রায়ই চোখ এড়িয়ে যায়, বিএনএম গঠনের সময়ই মূলত বিএলএও সংগঠিত হচ্ছিল, যার অধিকাংশ সদস্যই ছিল চরমপন্থী বেলুচ ছাত্র।
২০১১ সালে মার্কিন, পাকিস্তানি ও ভারতীয় সাংবাদিকদের একটি দল মস্কোতে সাবেক দুই সোভিয়েত গোয়েন্দা কর্মকর্তার সাক্ষাৎকার নেয়। তারা জানান, বিএলএ মূলত সোভিয়েত গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর একটি প্রকল্প ছিল, যার উদ্দেশ্য ছিল ১৯৮০–এর দশকে আফগানিস্তানে সোভিয়েতবিরোধী বিদ্রোহে পাকিস্তানের সম্পৃক্ততার প্রতিক্রিয়ায় বেলুচিস্তানে অস্থিরতা সৃষ্টি করা।
অর্থাৎ বিএলএ প্রথমে ১৯৮০–এর দশকেই গড়ে উঠেছিল, কিন্তু সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের সঙ্গে সঙ্গে তা দুর্বল হয়ে পড়ে। বাস্তবতা হলো—বিএলএ ২০০০ সালে নতুন করে 'গঠিত' হয়নি, বরং পুনর্জীবিত হয়েছিল। সংগঠনটি আগেই বিদ্যমান ছিল। যেসব বিএনএম গোষ্ঠী নির্বাচনী রাজনীতি ছেড়ে দিয়েছিল, তারা প্রথম দিকেই পুনর্জাগ্রত বিএলএতে যোগ দেয়। ২০০০–এর দশকের মাঝামাঝি সময়ে এসে বিএলএ'র নেতৃত্ব প্রায় পুরোপুরি মধ্যবিত্ত বেলুচদের হাতে চলে যায়।
বর্তমানে বিএলএ রাষ্ট্রবিরোধী বেলুচ সশস্ত্র সংগঠনগুলোর মধ্যে অন্যতম বৃহৎ ও সবচেয়ে ভয়ংকর এবং একইসঙ্গে সবচেয়ে সম্পদশালী। ১৯৭০–এর দশকে বিএলএফের মতো সংগঠনগুলো ইরাকের তৎকালীন বাথ সমাজতান্ত্রিক সরকার এবং সর্দার দাউদের নেতৃত্বাধীন আফগান জাতীয়তাবাদী সরকারের কাছ থেকে কিছু অর্থ ও অস্ত্র সহায়তা পেয়েছিল। তবে বিএলএফ কখনো ভারত বা সোভিয়েত ইউনিয়ন থেকে উল্লেখযোগ্য সহায়তা পেয়েছে, এ স্বপক্ষে পর্যাপ্ত প্রমাণ নেই।
১৯৮০–এর দশকে বেলুচিস্তানে সোভিয়েত আগ্রহ উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছিল, কিন্তু ১৯৯১ সালে সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের পর তা হ্রাস পায়। একই সময়ে প্রদেশের 'পাখতুন বেল্ট' ইসলামপন্থী গোষ্ঠীগুলোর প্রভাবাধীন হয়ে ওঠে, যাদের অনেককেই ১৯৮০–এর দশকের 'আফগান জিহাদ' জোরদারে ব্যবহার করেছিল রাষ্ট্র।
মতাদর্শগতভাবে একেবারেই বিপরীত অবস্থানে থাকলেও, বেলুচিস্তানে সক্রিয় বিএলএ ও ইসলামপন্থী গোষ্ঠীগুলো সাধারণত একে অপরকে সহ্য করেছে, এমনকি কখনো কখনো সহযোগিতাও করেছে। 'নারাজ বেলুচ' (ক্ষুব্ধ বেলুচ) ও রাষ্ট্রের মধ্যে অর্থবহ সংলাপের যে বয়ান ছিল তা এখন কার্যত শেষ, কারণ মধ্যবিত্ত বেলুচ চরমপন্থীরা এই বয়ানকে গুরুত্বই দেয় না, তাদের চোখে এটি অকার্যকর গোত্রনেতা ও প্রচলিত রাজনৈতিক দলগুলোর বিষয়। বিএলএর মূল অর্থদাতারা চায় সংগঠনটি তার কৌশল আরও কঠোর করুক এবং 'জিরো-সম' অবস্থান বজায় রাখুক, তাহলেই তাদের সহায়তা অব্যাহত থাকবে। ১৯৭০–এর দশকের অপরিচ্ছন্ন ও দুর্বল অস্ত্রসজ্জিত বেলুচ যোদ্ধাদের তুলনায় আজকের বিএলএ যোদ্ধারা সুশৃঙ্খল ইউনিফর্ম, উন্নত সামরিক সরঞ্জাম ও অত্যাধুনিক অস্ত্র ব্যবহার করছে। এগুলো আসছে কোথা থেকে?
রাষ্ট্রবিজ্ঞানী সীমা খানের মতে, ভারত এখন বিএলএ'র অন্যতম প্রধান অর্থদাতা। ২০২৪ সালের বই 'বেলুচিস্তান অ্যান্ড দ্য মেলাঞ্জ অব ভায়োলেন্স'-এ তিনি লিখেছেন, 'ভারত বেলুচ বিচ্ছিন্নতাবাদীদের অস্ত্র দেয়, অর্থ জোগায়, প্রশিক্ষণ দেয় এবং আশ্রয় দেয়।' চীনা প্রকল্পগুলো বাধাগ্রস্ত করতে বেলুচিস্তানকে অস্থির রাখাই এর লক্ষ্য।
একদিকে পাকিস্তান ও চীন এবং অন্যদিকে ভারত, ইরান ও আফগানিস্তান, এই আঞ্চলিক উত্তেজনাকে বিএলএ নিজের পক্ষে ব্যবহার করেছে। তবে এর মূল্য দিতে হতে পারে, কারণ আফগানিস্তানে নতুন করে গৃহযুদ্ধের সম্ভাবনা বাড়তে থাকলে, আফগানিস্তানে ঘাঁটি থাকা বিএলএকে কাবুলের 'ভারতপন্থী' তালেবান গোষ্ঠীর পক্ষে 'পাকিস্তানপন্থী' অসন্তুষ্ট তালেবান গোষ্ঠী—হাক্কানি নেটওয়ার্কের বিরুদ্ধে লড়তে হতে পারে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষক নাজাম শেঠির মতে, এমন গৃহযুদ্ধ হলে ভারতপন্থী তালেবান, ইরান-সমর্থিত সশস্ত্র গোষ্ঠী, তেহরিক-ই-তালেবান পাকিস্তান (টিটিপি) ও বিএলএর একটি জোট মুখোমুখি হবে সিরাজউদ্দিন হাক্কানির তালেবান এবং পাকিস্তান ও মধ্য এশিয়ার দেশগুলোর সমর্থনপুষ্ট অ-পাখতুন মিলিশিয়াদের। যদি তা ঘটে, তবে বিএলএ ছত্রভঙ্গ হয়ে যেতে পারে এবং সম্ভবত সেই সংঘাতের প্রথম শিকারও হতে পারে।

