প্যারেন্টিং

শিশুর ঘুম নিয়ে যেসব ভুল ধারণা অভিভাবকদের দুশ্চিন্তা বাড়ায়

রবিউল কমল
রবিউল কমল

শিশুদের ঘুম নিয়ে বাবা-মায়ের মধ্যে অনেক ভুল ধারণা রয়েছে, যা তাদের মধ্যে অহেতুক দুশ্চিন্তা তৈরি করে। অনেক সময় বই, কোচিং বা অনলাইন থেকে অভিভাবকরা এ ধরনের ধারণা পেয়ে থাকে। যেমন¬—শিশুদের ঘুম নির্দিষ্ট নিয়মে হওয়া উচিত। কিন্তু বাস্তবে ব্যাপারটা এত সহজ নয়।

রাতের টানা ঘুম

গবেষণা বলছে, বেশিরভাগ শিশু রাতে টানা ঘুমায় না। বরং তারা রাতের মধ্যে অন্তত একবার বা তারও বেশি বার জেগে ওঠে, যা সম্পূর্ণ স্বাভাবিক।

উদাহরণ হিসেবে নরওয়ের এক গবেষণায় দেখা গেছে, ছয় মাস বয়সী প্রায় ৭০ শতাংশ শিশু রাতে অন্তত একবার জেগে ওঠে। দেশটির ৫৫ হাজার শিশুর তথ্য নিয়ে এই গবেষণা করা হয়।

ফিনল্যান্ডের আরেকটি গবেষণায় দেখা যায়, তিন থেকে আট মাস বয়সী শিশুরা গড়ে রাতে দুই বারের বেশি জেগে ওঠে, আর ১২ মাস বয়সেও অনেক শিশু একাধিকবার জাগে। এমনকি ১৮ থেকে ২৪ মাস বয়সী শিশুরাও মাঝে মাঝে রাতে জেগে ওঠে। ২০২০ সালে ৫ হাজার ৭০০ শিশুর তথ্য নিয়ে এই গবেষণা করা হয়।

সুতরাং গবেষণার ফল বলছে, সব শিশুর ‘রাতভর ঘুমানোর’ ব্যাপারটা মোটেও সাধারণ নয়।

আরেকটি প্রচলিত ধারণা হলো, শিশুদের প্রতিদিন প্রায় ১২ ঘণ্টা ঘুমানো উচিত। অনেক শিশু এর চেয়ে কম ঘুমায় এবং সুস্থভাবে বেড়ে ওঠে। তাই নির্দিষ্ট সংখ্যাকে বাধ্যতামূলক নিয়ম হিসেবে ধরা ঠিক নয়। একইভাবে অনেকেই মনে করেন, দিনের ঘুম রাতের ঘুম নষ্ট করে, কিন্তু বাস্তবে সব শিশুর ক্ষেত্রে এটি প্রযোজ্য নয়। বরং অনেক শিশুর জন্য দিনের ঘুম তার রাতের ঘুমকে আরও ভালো করে।

অনেকে আবার ভাবেন, শিশুর ঘুম অবশ্যই একটানা ও নিরবচ্ছিন্ন হতে হবে। কিন্তু বাস্তবে শিশুদের ঘুম স্বাভাবিকভাবেই ভাঙা-ভাঙা হয়। তারা ঘুমের মধ্যে জাগে, আবার ঘুমায়—এটা তাদের বিকাশেরই অংশ। তাই এটিকে সবসময় সমস্যা হিসেবে দেখার দরকার নেই। অনেক ক্ষেত্রে বয়স বাড়ার সাথে সাথে এসব সমস্যা নিজে থেকেই কমে যায়।

ফিনল্যান্ডের গবেষণায় দেখা গেছে, আট মাস বয়সী প্রায় ৮০ শতাংশ শিশু রাতে জাগলেও, দুই বছর বয়সে এসে এটি কমে প্রায় ২৫ শতাংশে নেমে আসে।

এই গবেষণাগুলো সাধারণত বাবা-মায়ের রিপোর্টের ওপর ভিত্তি করে করা। অর্থাৎ শিশু হয়তো আরও বেশি বার জেগেছে, কিন্তু বাবা-মা সব তা টের পাননি। আবার যখন আরও নির্ভুল পদ্ধতি ব্যবহার করা হয়, যেমন ভিডিও রেকর্ডিংয়ের মাধ্যমে শিশুদের ঘুম বিশ্লেষণ, তখন দেখা যায় শিশুরা আরও বেশি বার জেগে ওঠে।

কখনো কখনো রাতে জেগে ওঠা স্বাভাবিক নয়

রাতে মাঝে মাঝে শিশুর ঘুম ভাঙার ব্যাপারটা সবসময় স্বাভাবিক নাও হতে পারে। কারণ কিছু ক্ষেত্রে ঘুমের পেছনে শারীরিক সমস্যা থাকতে পারে, যেগুলো আমরা অনেক সময় খেয়াল করি না।

যেমন—শরীরে আয়রনের ঘাটতি থাকলে শিশুরা বারবার জেগে ওঠে, কিংবা অস্থির থাকে বা ঘুমাতে সমস্যা হতে পারে। যুক্তরাষ্ট্রে প্রায় ১৫ শতাংশ শিশুর মধ্যে এই সমস্যা দেখা যায় বলে বিবিসির প্রতিবেদনে বলা হয়।

এছাড়া খাবারে অ্যালার্জি, পেটের সমস্যা বা কানের ইনফেকশন থাকলেও শিশুর ঘুম ভেঙে যেতে পারে।

বিবিসির প্রতিবেদনে বলা হয়, আবার কিছু শিশুর ক্ষেত্রে ঘুমের বিশেষ সমস্যা থাকতে পারে, যেমন স্লিপ অ্যাপনিয়া। এতে ঘুমের মধ্যে শ্বাস নিতে সমস্যা হয়, ফলে শিশু বারবার জেগে ওঠে। এই সমস্যা সাধারণত ২ থেকে ৬ বছর বয়সের মধ্যে বেশি দেখা যায়।

ইন্টারনেটে ‘শিশুর ঘুমানোর সময়’ লিখে খুঁজলে প্রায় সব জায়গায় একটা বিষয়ই দেখা যায়, শিশুদের প্রায় ১২ ঘণ্টা ঘুমানো উচিত। পশ্চিমা ও শিল্পোন্নত দেশে ‘৭টা থেকে ৭টা’ (রাত ৭টা থেকে সকাল ৭টা) ঘুমের ধারণা জনপ্রিয় হওয়ার পর থেকে এর চেয়ে কম ঘুমকে অপর্যাপ্ত বলে ধরা হয়।

কিন্তু বাস্তবতা হলো, কিছু শিশুর জন্য ১২ ঘণ্টা ঘুম দরকার হলেও অনেক শিশুর জন্য এটা বেশি হয়ে যায়। সেক্ষেত্রে খুব তাড়াতাড়ি ঘুম পাড়ানোর চেষ্টা করলে উল্টো সমস্যা দেখা দিতে পারে।

অস্ট্রেলিয়ার প্রায় ৫ হাজার শিশুর ওপর করা একটি গবেষণায় দেখা গেছে, নবজাতক থেকে প্রায় পাঁচ বছর বয়স পর্যন্ত শিশুরা গড়ে রাতে ১১ ঘণ্টা ঘুমায়, ১২ ঘণ্টা নয়। এমনকি সবচেয়ে ছোট, চার থেকে ছয় মাস বয়সী শিশুদের ক্ষেত্রেও একই ফল পাওয়া গেছে।

বিশ্বের অন্যান্য অংশেও শিশুদের ঘুমের সময় কম পাওয়া গেছে। যেমন—এক গবেষণায় দেখা গেছে, তিন বছর বয়স পর্যন্ত শিশুরা গড়ে রাতে ঘুমায় অস্ট্রেলিয়ায় ১০ ঘণ্টা ১৭ মিনিট, কানাডায় ৯ ঘণ্টা ৯৬ মিনিট, যুক্তরাজ্যে ১০ ঘণ্টা ৫১ মিনিট, যুক্তরাষ্ট্রে ৯ ঘণ্টা ৭৪ মিনিট, তাইওয়ানে ৮ ঘণ্টা ৭৩ মিনিট, হংকংয়ে ৯ ঘণ্টা ২ মিনিট, আর ভারত ও ইন্দোনেশিয়ায় ৯ ঘণ্টা ১৫ মিনিট।

যেসব সমাজে ‘৭-৭ ঘুম’ আদর্শ হিসেবে ধরা হয়, সেখানেও ঘুম বিশেষজ্ঞদের নির্দেশনায় দেখা যায় ১২ ঘণ্টা ঘুম বাধ্যতামূলক নয়, বরং এটি সর্বোচ্চ সীমার কাছাকাছি।

কোলে, দোলনায় ও চলতে পথে ঘুম

অনলাইনে প্রায়ই বলা হয়, দোলনায়, কোলে বা গাড়িতে ঘুমালে শিশুর ভালো ঘুম হয় না। কারণ এতে নাকি তারা হালকা ঘুমের মধ্যে থাকে এবং সেই ঘুমে শিশুকে পুরোপুরি বিশ্রাম দেয় না। কিন্তু এই দাবির পক্ষে কোনো শক্ত বৈজ্ঞানিক প্রমাণ নেই। বরং কিছু গবেষণায় উল্টো ফল দেখা গেছে।

দুই মাস বয়সী ৬৪ শিশুকে নিয়ে করা গবেষণায় দেখা গেছে, হালকা দোলে তারা দ্রুত ঘুমিয়ে পড়ে এবং কম কান্না করে। অর্থাৎ দোলনার দোলে তাদের ঘুমাতে সুবিধা হয়।

আরেকটি গবেষণার বরাতে বিবিসির প্রতিবেদনে বলা হয়, যেসব শিশু অবস্ট্রাকটিভ স্লিপ অ্যাপনিয়া (শ্বাস-প্রশ্বাসে সমস্যা) রোগে ভুগছে, তাদের যদি দোলানো ম্যাট্রেসে ঘুম পাড়ানো হয়, তাহলে তাদের ঘুমের সময় শ্বাস বন্ধ হওয়ার ঘটনা প্রায় অর্ধেক কমে যায়।

দিনে বেশি ঘুম হলে রাতে বেশি ঘুম হবে, তা নয়

এটা ঠিক যে, কিছু শিশু অতিরিক্ত ক্লান্ত থাকলে তাদের মধ্যে অস্থিরতা দেখা যায়। ফলে রাতে শান্ত হয়ে ঘুমানো কঠিন হতে পারে। কিন্তু অনেকেই মনে করেন, শিশু দিনে যত বেশি ঘুমাবে, রাতে তত ভালো ঘুম হবে। গবেষণা বলছে, এই ধারণা সবসময় ঠিক নয়।

বিবিসির প্রতিবেদনে বলা হয়, দুই বছরের বেশি বয়সী শিশুদের নিয়ে এক গবেষণায় দেখা গেছে, যারা দিনে বেশি ঘুমায় তাদের রাতে ঘুমাতে একটু দেরি হয় এবং রাতে বেশি বার জেগে ওঠে।

অবশ্য কম বয়সী শিশুদের নিয়ে আরেক গবেষণায় ভিন্ন ফল পাওয়া গেছে। সেখানে দেখা গেছে, ৬ সপ্তাহ বা ১৫ সপ্তাহ বয়সী শিশুদের ক্ষেত্রে দিনে বেশি বা কম ঘুমালে রাতে তেমন কোনো পরিবর্তন হয়নি। কিন্তু ২৪ সপ্তাহ বয়সী শিশুদের ক্ষেত্রে দিনে বেশি ঘুমালে রাতে একটু বেশি ঘুম হয়েছে। তবে এই পার্থক্য খুবই সামান্য—দিনে এক ঘণ্টা বেশি ঘুমালে রাতে মাত্র প্রায় ১৪ মিনিট বেশি ঘুম পাওয়া গেছে।

তবে এটাও নিশ্চিত না যে, দিনে বেশি ঘুমানোর কারণেই রাতে বেশি ঘুম হয়েছে। হতে পারে তখন শিশুদের শারীরিক বিকাশের জন্য দিন-রাত দুই সময়েই বেশি ঘুম দরকার হয়েছিল।

আসলে আমাদের শরীরে ‘ঘুমের চাপ’ নামে একটা প্রক্রিয়া আছে। আমরা যত বেশি সময় জেগে থাকি, তত বেশি ঘুম পায়। আর যদি দিনে বেশি ঘুম হয়ে যায়, তাহলে রাতে ঘুম আসতে দেরি হতে পারে।

সব মিলিয়ে, প্রতিটি শিশুর ঘুমের প্রয়োজন ভিন্ন ভিন্ন। তাদের শরীর যতটা ঘুম দরকার মনে করে, জোর করে তার চেয়ে বেশি ঘুম পাড়ানো যায় না।