ছোটমামার ম্যাজিক
ট্যাবে গেম খেলছিল রনি। মেজাজ গরম হয়ে আছে। শেষ কয়েকটা ধাপ পার হতেই পারছে না। আবার প্রথম থেকে শুরু করতে হচ্ছে। এমন সময় বাসায় ঢুকল ছোটমামা।
ছোটমামা হলো রনির বন্ধুর মতো। যে কয়দিন থাকে, আনন্দের বন্যা বয়ে যায় বাসায়। মামাকে দেখলেই প্রথম যে কাজটা করে রনি, দৌড়ে গিয়ে জড়িয়ে ধরে। এবারও মামা আসায় খুব খুশি। তবে দৌড়ে গিয়ে জড়িয়ে ধরল না। ধরবে কী করে? হাতে যে ট্যাব। সেই ট্যাবে চলছে গেম। ব্যাপারটা চোখ এড়াল না মামার।
বিকেলে ঘুম থেকে উঠে রনি ট্যাবে গেম খেলা শুরু করে। একটু পর মামা এসে পাশে বসল।
—কী রে, বিকেলে বন্ধুদের সঙ্গে বাইরে খেলতে যাস না?
: ওরা যেন কেমন! খেলার চাইতে চিল্লাচিল্লি করে বেশি। কান ধরে যায়। তারচেয়ে ট্যাবে খেলতেই বেশি মজা।
—চিল্লাচিল্লি তো করবেই। বন্ধুরা খেলতে লেখতে চিৎকার করবে, লাফালাফি করবে। তাদের চিৎকারে কান তো ধরবেই! চল এখন, বাইরে থেকে হেঁটে আসি।
: ইয়ে মামা, কিছুক্ষণ পরে যাই। গেমটা শেষ হতে আর মাত্র তিনটা স্টেজ বাকি।
মামা দীর্ঘশ্বাস ছাড়ে, ‘তোদের বাসায় আসি কেন জানিস? মামা-ভাগ্নে মিলে হা হা হি হি করব বলে। সেই তুই যদি সারাদিন ট্যাব নিয়ে থাকিস, তাহলে এসে কী করব।’
মামার কথায় রনি তাড়াতাড়ি ট্যাব বন্ধ করে। মামার হাত টেনে বলে, ‘ভুল হয়ে গেছে মামা। চলো, কোথায় যাবে?’
রাস্তায় হাঁটতে হাঁটতে রনি বলে, ‘আমার ওপর খুব রাগ করেছ, তাই না? জানো মামা, ট্যাবে গেম খেলতে খেলতে এমন অভ্যাস হয়ে গেছে এখন আর বন্ধুদের সাথে খেলতে, টিভি দেখতে, কারো সাথে কথা বলতে ভালো লাগে না। পড়ালেখা তো মোটেই ভালো লাগে না। এবারের পরীক্ষার রেজাল্টও খুব খারাপ হয়েছে। আমার সবকিছু নেগেটিভ। আমি কি দিনদিন খারাপ হয়ে যাচ্ছি?’
ছোটমামা দু’পাশে মাথা নাড়াল।
—তোর রক্তের গ্রুপ কী রে?
: এ পজিটিভ। কেন?
—তবে যে বললি, তোর সবকিছু নেগেটিভ। তুই তো একেবারে রক্তসূত্রে এ প্লাস।
: মামা, মজা করো না। আমি সিরিয়াসলি বলছি।
—আমিও সিরিয়াসলি বলছি। শোন, আগামী এক সপ্তাহ যা বলব শুধু তাই করবি। তারপর দেখবি ম্যাজিক। সন্ধ্যা নামছে। বাসায় ফিরতে হবে। তোর জন্য মজার একটা গল্পের বই এনেছি।
বাসায় ফিরে হাতে একটা বই ধরিয়ে দেয় মামা। ট্যাব ছেড়ে গল্পের বই হাতে নিতে মোটেও ইচ্ছা করছিল না। কিন্তু মামাকে খুশি করতে বইটা হাতে নিলো রনি। প্ল্যান অবশ্য করেই রেখেছে। অনেক কষ্ট করে চারটা পাতা পড়বে। তারপর মামাকে বলবে, আর পড়তে ভালো লাগছে না।
চোখ মুখ শক্ত করে পড়া শুরু করল। তারপর কী হলো, নিজেও বুঝল না। যখন বুঝল, তখন বই পড়া শেষ। অবাক হয়ে মামাকে বলল, ‘গল্পের বই পড়তে এত মজা! আগে তো বুঝিনি!’
মামা হেসে বলল, ‘আগে বুঝিসনি কারণ আগে পড়িসনি।’
পরদিনই মামার সঙ্গে কয়েকটা লাইব্রেরি ঘুরে এত্তগুলো গল্পের বই কিনল রনি।
সপ্তাহ খানেক পর দেখা গেল অন্য রনিকে। সে এখন আর ট্যাব নিয়ে বসে থাকে না। গল্পের বই খুলে ভ্রমণ করে গল্পের রাজ্যে। পড়তে পড়তে কখনো ফিক করে হেসে ওঠে, কখনও মন খারাপ করে। রনির অবস্থা দেখে মা-বাবা মুখ চেপে হেসে তাকায় ছোটমামার দিকে। মুচকি হেসে মামাও যোগ দেয় ওদের সাথে।
গল্পের বই পড়তে পড়তে রনি আড়চোখে দেখে আর ভাবে, মা-বাবা যেন কেমন! ট্যাব ছেড়ে গল্পের বই হাতে তোলা কি মুখের কথা? কোথায় তাকে ধন্যবাদ-টন্যবাদ দেবে তা না, নিজেরাই হাসাহাসি করে যাচ্ছে। কেন হাসছে, কে জানে? ছোটমামার ম্যাজিকের কারণে না তো?