মনে পড়ে সেই নিউমার্কেট…

নাদিয়া রহমান
নাদিয়া রহমান

‘আজ মঙ্গলবার, নিউমার্কেট বন্ধ!’ কিংবা ‘আজ শুক্রবার, নিউমার্কেট থেকে ঘুরে আসি!’—এই কথাগুলোর সঙ্গে অনেকেই পরিচিত। খাবার দোকানে বসে এক প্লেট ফুচকা আর লাচ্ছি থেকে শুরু করে, স্কুলের ব্যাগ, জুতা, বইঘরের বই, মায়ের রান্নাঘরের যাবতীয় জিনিসপত্র, সবকিছুর একটি ঠিকানা ছিল। তা হলো নিউমার্কেট।

নব্বইয়ের ঢাকা নিয়ে যদি স্মৃতি রোমন্থন করতে বলা হয়, তাহলে আমার উত্তর হবে, ছিমছাম নিউমার্কেট। আমরা যারা সনি টেলিভিশনের হাতেগোনা কয়েকটি চ্যানেল দেখে সময় পার করতাম, আর যাদের ঘরে ছিল বাজেটের কড়াকড়ি, তাদের কাছে সেই সময়ের নিউমার্কেটই ছিল এক বিস্ময়ের রাজ্য! মায়ের হাত ধরে ঢুকলে মনে হতো শহরের ভেতর আরেকটি শহরে প্রবেশ করেছি।

ঈদ আসুক কিংবা স্কুল খোলার মৌসুম, বাসার রান্নাঘরের নতুন প্রয়োজন হোক কিংবা হঠাৎ কোনো আত্মীয়ের বিয়ের দাওয়াত—সব কিছুর শেষ ঠিকানা ছিল নিউমার্কেট। যেদিনই আজিমপুরের এই মার্কেটে যাওয়ার প্রসঙ্গ আসতো, ওদিন ঈদের আনন্দ শুরু হতো। কারণ, সে সময় এত শপিং মল ছিল না। আর অনলাইন কেনাকাটার তো কোনো অস্তিত্বই ছিল না! তার ওপর দরদামের মধ্যে পছন্দের জিনিসটাও তো মিলছে। ফলে পরিবারের ছোট-বড় সব চাহিদার সমাধান যেন এক জায়গাতেই মিলত।

মায়ের সঙ্গে নিউমার্কেটে যাওয়ার স্মৃতি আজও স্পষ্ট। এখন এত এত সুপারশপ, দোকানপাটের ভিড়ে মনে হয়—সেই সীমিত জিনিসের মধ্যে দিনগুলোই ভালো ছিল। ধানমন্ডি থেকে ৮-১০ টাকার রিকশা ভাড়া নিয়ে চলে যেতাম নিউমার্কেট। পৌঁছাতে লাগতো ১০ মিনিট। সে সময় ঢাকার রাস্তায় এমন বাস, টেম্পো চলতো না। ধানমন্ডির এদিকটায় তো নয়ই। ছিল শুধু রিকশা, আর হাতেগোনা কয়েকজনের ব্যক্তিগত গাড়ি। রাস্তাঘাট, লোকালয়ে এত মানুষ, শব্দদূষণ তো ছিলই না। তাই কোনো কিছুর দরকার হলেই সহজে চলে যাওয়া যেত নিউমার্কেট। সেই রিকশা একেবারে এসে থামতো হলদে রঙের ফটক দেওয়া ২ নম্বর গেটের সামনে।

গেট পেরিয়ে ঢুকতেই চারপাশের দোকান, দোকানিদের ডাক আর দর-কষাকষির শব্দ মিলে এক আলাদা পরিবেশ তৈরি করত। কোথাও কাপড়ের দোকান, কোথাও জুতার সারি, কোথাও আবার রঙিন কাঁচের চুড়ি আর গয়নার ঝলকানি। মা এক দোকান থেকে আরেক দোকানে ঘুরতেন, আর আমি বিস্মিত চোখে চারপাশ দেখতাম। কারণ আমার কাছে তখন সবই ভালো লাগতো। যদিও সব থেকে বেশি ভাল লাগতো মশলাপাতির দোকান, যেখানে নানান রকমের চকলেটের বয়াম পাওয়া যেত। আর ভালো লাগতো স্টেশনারি দোকানগুলো। হরেক রকমের রাবার, নকশা করা পেনসিল, স্টিকার, রঙ-তুলি মিলতো ওখানে।

বন্ধুদের দেখতাম একেকদিন একে রকমের রঙের বাক্স, স্কুলের ব্যাগ নিয়ে আসছে। যারা এমনটা করতে পারতো, বন্ধুমহলে তাদের একটু দাপট থাকতো বেশি! আর আমাদের মতোন শিক্ষার্থীরা ছিলাম দর্শক শ্রেণিতে। কখনো সাহস হলে কিংবা পরীক্ষায় ভালো নম্বর পেলে ঘরে আবদার করতাম। কিন্তু দেখতে তো আর খরচা নেই। তাই অপেক্ষা ছিল, মায়ের গজ কাপড় কেনা কখন শেষ হবে, কখন একটু স্টেশনারি দোকানটার সামনে যেয়ে দাঁড়াতে পারবো!

আর যেদিন মাসের বাজার হতো নিউমার্কেট থেকে, ওদিন একেবারে নিতান্তই ভদ্র মানুষ সেজে নিতাম, মা যাতে মাসের বাজার শেষে এক বয়াম চকলেট কিনে দেয়। মা যদিও কপট হুমকি দিতেন, কিন্তু কিনে দিবেন ঠিকই, এই বিশ্বাসটা মায়ের প্রতি সব সময়েই অটুট ছিল। সেই চকলেট কেনার পরেও শান্তি ছিল না! একটা মাত্রও বয়াম, বোনের সঙ্গে ভাগ করো, বন্ধুকে দাও। নিজেও যেখানে মন ভোরে একসঙ্গে পুরো বক্সটা শেষ করতে পারতাম না!

এরপর ছিল বইঘর। নিউমার্কেট মানেই ছিল বইয়ের দোকানের ঘ্রাণ। নীলক্ষেতের তুলনায় নিউমার্কেটের বইয়ের দোকানগুলোয় দাম বেশ বেশিই ছিল। পাঠ্যবই কিনতাম আমরা নীলক্ষেত থেকে। তবে যখন একেবারে প্রথম কিংবা দ্বিতীয় শ্রেণিতে পড়ি, ডিজনি’র রাজকুমারী, উইনি-দ্য-পুহ, মিকি মাউস আর তার বন্ধুরা কিংবা গ্রিম ব্রাদারসের সঙ্গে পরিচয় এই নিউমার্কেটের কেনা বইয়ের মাধ্যমেই। এখনো মনে আছে, মাত্রও কয়েক পাতার চোখ জুড়ানো পশ্চিমা কার্টুন ভরা ডিজনির একেকটা বই ছিল ২৫ টাকা করে। ২০০০ সালের শুরুর দিকের সময়ে কিন্তু এটাই অনেক। আর বইগুলো শেষ করতে লাগতো মাত্র ১০ মিনিট। তারপর ঘরে আবার নতুন বইয়ের বায়না। এজন্য বকুনি কম খাইনি। তারপরেও ডিজনির মন ভোলান রঙ্গিন কার্টুনের জন্যই বছরে দু-তিন বার সুযোগ হলে বইগুলো কিনতাম। আজ এত বছর পরেও বেশ কিছু বই আমার শেলফে আছে। খুললেই চোখে পড়ে, বড় বড় অক্ষরে, সেই সময়ে লিখে রেখেছি নাম, শ্রেণি আর রোল!

আর ঈদের আগে নিউমার্কেট যেন অন্য এক রূপ নিত। এই মার্কেটের একটা জিনিস ভালো লাগার, তা হলো এখানে সব শ্রেণির মানুষই তার নিজের পছন্দসই জিনিসটা খুঁজে নেয়। সকল শ্রেণি ও পেশার মানুষের মাঝেও মায়ের হাত শক্ত করে ধরে রাখার মধ্যে ছিল একধরনের নিরাপত্তা। সেই হাত ছেড়ে গেলে হারিয়ে যাওয়ার ভয় ছিল, আর সেই হাত ধরে থাকলেই পুরো পৃথিবীটাকে নিজের মনে হতো।

ঈদের সময় নিউমার্কেটে ১০ টাকার এক ধরনের মেহেদী পাওয়া যেত। রঙ খুব হতো না, কিন্তু এই এটা কিনতে পারতাম বছরে এক কি দুবার। সে সময় ঢাকা শহরের মানুষের আয়ের উৎস খুব ছিল না। বিশ্বায়নের হাওয়া তখনো এ প্রান্তে এসে লাগেনি, তাই জিনিসের বৈচিত্র্যও ছিল সীমিত। কিন্তু সেই সীমিত জিনিসের মধ্যেও আমাদের আনন্দটা ছিল আজকের থেকেও অনেক অনেক বেশি। আমরা তখন ধৈর্য ধরতে জানতাম, কোনো একটা জিনিসের জন্য অপেক্ষা করতে জানতাম। তেমনি সমাজে নৈতিকতা, সততার পরিসংখ্যানটাও বেশি ছিল।

এখনো তো নিউমার্কেট আছে। সেই নীলক্ষেত, চাঁদনি চক, গাউসিয়া মার্কেট। কিন্তু আসলে সেই নিউমার্কেটটা আর নেই। এর মূল কারণ, আজকের ঢাকা বদলে গেছে। ঝকঝকে শপিং মল, ব্র্যান্ডের আউটলেট আর অনলাইন স্টোরের ভিড়ে কেনাকাটার অভিজ্ঞতাও অনেক বদলেছে। আর বেড়েছে মানুষ। ট্রাফিক ঠিক নেই, অতিরিক্ত জ্যাম। তাই সেই নিউমার্কেট এখন যাওয়া হয় কালে-ভদ্রে! কিছু দরকারে মনে হয়, অনলাইনে বলে দেই, সময় বাঁচবে। এই যান্ত্রিক নগরীতে এত সময় এখন কোথায়? পকেটে হয়তো এখন এ শহরের মানুষের অর্থ বেড়েছে। কিন্তু কেন জানি সেই আমেজটা আর নেই।

তাই আজও নিউমার্কেটের নাম শুনলে পড়ে যায় মায়ের কাছে বায়না, বইয়ের গন্ধ, চকলেটের লোভ আর এক ব্যস্ত বাজারের ভেতরে লুকিয়ে থাকা শৈশবকে। যে শৈশব বয়ামে ভরা রঙ্গিন চকলেটের মোড়কের মতোই।