স্মৃতির পাতায় ধীরগতির শহর ঢাকা

নাদিয়া রহমান
নাদিয়া রহমান

একটা শহর থাকে মানচিত্রে, আরেকটা থাকে আমাদের স্মৃতিতে। ঢাকার অনেক জায়গা আজও আছে কাগজে-কলমে, ঠিকানায়। কিন্তু তাদের আসল রূপ, গন্ধ, শব্দ, সবই রয়ে গেছে পুরোনো ঠিকানার দিনগুলোর ভেতর। এই শহর এখন দ্রুতগতির, শব্দে ভরা, ধুলোয় আচ্ছন্ন। অথচ একসময় এই নগরীই ছিল ধীর, মানুষের মতোই আবেগী।

আমার জন্ম কিংবা বেড়ে ওঠা নব্বইয়ের দশকে। বড় হওয়া ধানমন্ডিতে, যখন এই লোকালয়ে চারপাশে এক বা দুইতলা বাড়ি, বারান্দা পেরিয়ে আলো-হাওয়া আসত নির্ভয়ে। বিকেলের ঢিলেঢালা সময় মানেই রাস্তার মোড়ে দাঁড়িয়ে গল্প, গাছের ছায়া, আর দূরে কোথাও সাইকেলের ঘণ্টা। রাস্তা ছিল মানুষের জন্য, শুধুই গাড়ির নয়। আজ সেই ধানমন্ডি কংক্রিটের এক জঙ্গলে পরিণত হয়েছে। উঁচু দালান আছে, মাশরুমের মতোন রয়েছে রেস্তোরাঁ। কিন্তু চোখের উচ্চতায় যে শহরটা ছিল, সে আর নেই। এখন মানুষের কাছে বিনোদনের খোরাক মানেই রেস্তোরাঁ।

নিউমার্কেটের দিকে যেতে বলাকা সিনেমা হল। শুধু একটা হল নয়, ছিল একটা আমেজ। টিকিটের লাইনে দাঁড়িয়ে থাকা, হলের ভেতরের আধো অন্ধকার, পর্দা জ্বলে ওঠার আগের সেই অপেক্ষা। ঢাকার পুরোনো সিনেমা হলগুলো, বলাকা, আজাদ, পূরবী শহরকে ধীরে ধীরে দেখার সুযোগ দিত। এখন সিনেমা আছে, কিন্তু সেই হল, সেই সামাজিকতা নেই। পর্দা আছে, কিন্তু আবহটা নেই।

অপরদিকে আজিমপুরের নিউ মার্কেট। আজকের নিউ মার্কেট আর আমার স্কুলজীবনের নিউ মার্কেটে কত তফাৎ! জীবন ছিল সেলুলয়েডের, ধীরগতির এক আশ্রয়। কেনাকাটা মানে তাড়াহুড়ো নয়, বরং হাঁটতে হাঁটতে থামা, দরদাম, চায়ের কাপে গল্প। পরিবারের হাত ধরে যাওয়া হতো দুই ঈদের সময়ে। আর যাওয়া হতো শুধু মাসের বাজার করবার সময় মায়ের সঙ্গে। মাসের বাজার করবার দিনগুলো ছিল আমার জন্য এক রকম উৎসবের। কিছুটা ভয়ে আবার কিছুটা স্নেহে মায়ের বাজার শেষ হলে আর্জি পেশ করতাম, কী কিনতে চাই। কিনে আনা সেই চকোলেট গুণে গুণে খেতাম, যাতে শেষ না হয়ে যায়।

এরপর ঢাকা শহরে ধীরে ধীরে গড়ে উঠলো সুপারস্টোর। এখন গলির মোড়েই একেকটি সুপারস্টোর। ভিড় বাড়তে লাগলো জনস্রোতের সঙ্গে। ফলে এই ঝক্কিঝামেলা এড়াবার জন্য আমরা গলির মোড়ে এই সুপারশপ থেকেই কেনাকাটা শুরু করলাম। মা-ও এক সময় বলা শুরু করলেন, ঘরের পাশের বাজার থেকেই মেলে সব কিছু, তার ওপর সময়ও বেঁচে যাচ্ছে। ফলে পুঁজিবাদের জোয়ারে সেই বাজারের দিনগুলোও মিলিয় গেল। সেদিনও বুঝতে পারিনি, নিউমার্কেটের বাইরে চকোলেট বা নীলক্ষেতে স্টেশনারি কেনার দিনগুলো এই তো ফুরিয়ে যাচ্ছে।

গলির সেই ছোট মশলা ভাঙ্গারির দোকানগুলোতেও যাতায়াত মিলিয়ে গেল। এখন বড় পুঁজিবাদী কোম্পানিগুলোই আপনার হাতের কাছে সব পৌঁছে দিচ্ছে। বেকারির বদলে সব ধরনের বিকেলের নাশতা এখন প্যাকেটেই পাওয়া যায় সহজে। ফলে রুই-কাতলাদের দলে ছোট দোকানগুলো হারিয়ে যাওয়া শুরু হলো সেই সময়টা থেকে!

পুরোনো দিনের সেই নিউ মার্কেটের কাপড়ের দোকান, জুতোর গলি, বইয়ের স্টল, সবকিছুর মধ্যেই ছিল একটা ছন্দ, আনন্দ। পাশে নীলক্ষেত, বইয়ের ঘ্রাণে ভরা এক জগৎ। পকেট থাকত সীমিত, কিন্তু পুরোনো বই কেনার সুযোগ থাকায় জগতের নানান খবর পেয়ে যেতাম এর মধ্যেই। তখন বইঘরগুলো ছিল বহির্বিশ্বের সঙ্গে পরিচিত হওয়ার এক আশ্রয়স্থল। কেননা আমরা ইন্টারনেট পেয়েছি অনেক অনেক পরে। একইসঙ্গে এই নীলক্ষেত আর আশপাশের বইঘরগুলো ছিল ঢাকার চিন্তাশীল মানুষের আশ্রয়।

ছিল আজিজ সুপার মার্কেটে লেখক, কবিদের আড্ডা। সেখানে গেলে মনে হতো, শহরটা এখনো ভাবতে জানে। এখন নীলক্ষেত আছে, বইও আছে, কিন্তু চারপাশে শব্দ, ধুলো, অস্থিরতা, আর প্রচুর হকার্স। জায়গাটা যে বইয়ের বোঝা গেলেও সেই ছন্দটা নেই। বইয়ের পাতার শব্দ চাপা পড়ে যায় হর্ন আর হাতুড়ির আওয়াজে। বরঞ্চ বইয়ের চেয়ে নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপাতিতে নীলক্ষেত হারিয়েছে আগেকার সেই ঘ্রাণ।

আর ঢাকার লাইব্রেরিগুলো? সেগুলোও যেন পুরোনো ঠিকানায় আটকে আছে। কিংবা আরও হারিয়ে গেছে। কিছু নাম টিকে আছে, কিন্তু পাঠক কোথায়? কেননা সময় নেই। তার থেকেও বড় আধুনিকতার এই যুগে আমরা হারিয়েছি আমাদের মননশীলতা, আমাদের রুচি আর ইতিহাসকে। জাদুঘরগুলো, ইতিহাসের ঘর, ধীরে ধীরে অপ্রাসঙ্গিক হয়ে পড়ছে ব্যস্ত শহরের কাছে। যেখানে একসময় নীরবে দাঁড়িয়ে থাকা মানেই শেখা, এখন সেখানে যাওয়াই যেন বিলাসিতা। এখন অনেক লাইব্রেরি তালাবদ্ধ, কিছুতে পাঠক নেই। শহর যেন নিজের অতীত দেখার সময় পায় না।

বর্তমানে এই শহরের হৃদয়টা মরছে শব্দে, গতিতে, অবহেলায়। জায়গাগুলো আছে, কিন্তু জায়গাগুলোর যেন প্রাণ নেই। পুরোনো ঠিকানাগুলো তাই শুধু পোস্টকার্ড হয়ে থাকে, যেখানে লেখা থাকে একটা শহরের স্মৃতি, যে শহরটা আর ফিরে আসবে না, কিন্তু আমাদের স্মৃতির পাতায় থেকে যাবে চিরকাল।