গরুর মাংস দিয়ে ইউরোপীয় খাবার ‘গুলাশ’ রান্না করেছেন কখনো?
বাংলাদেশে কোরবানির ঈদ মানেই সাধারণত কোরমা, রেজালা, কালাভুনা, পোলাও, তেহারি, ভুনা খিচুড়ি কিংবা ঝাল ঝোল। কিন্তু গত কয়েক বছরে শহুরে রান্নাঘরে আরেকটি পরিবর্তনও দেখা যাচ্ছে। অনেকেই এখন কোরবানির মাংস দিয়ে আন্তর্জাতিক নানা পদ রান্না করছেন—স্টেক, ভিন্দালু, শেফার্ডস পাই কিংবা বিফ স্ট্রোগানফ। কিংবা মধ্য ইউরোপের বিখ্যাত খাবার গুলাশ।
এই সময়ে আমাদের এখানেও দারুণ উপযোগী হতে পারে মধ্য ইউরোপের বিখ্যাত খাবার ‘গুলাশ’। তাজা গরুর মাংস, পরিবারের দীর্ঘ আড্ডা, অতিথি আসা-যাওয়া আর ধীরে রান্না হওয়া খাবারের আবহ—সবকিছুর সঙ্গে দারুণভাবে মানিয়ে যায় বিশ্বজুড়ে জনপ্রিয় এই ধীর আঁচের বিফ স্ট্যুটি।
রাখালের হাঁড়ি থেকে ঈদের টেবিলে
গুলাশের জন্ম হাঙ্গেরিতে। স্থানীয় ভাষায় ‘গুলাইয়াশ’ নামে পরিচিত এই খাবারের অর্থ অনেকটা ‘রাখালের রান্না’। শত শত বছর আগে হাঙ্গেরীয় গরুর রাখালরা বড় পাত্রে গরুর মাংস, পেঁয়াজ ও মসলা দিয়ে ধীরে ধীরে রান্না করতেন এই ঝোলজাতীয় খাবার।
আজকের পৃথিবীতে গুলাশ নানা রূপ নিয়েছে। কোথাও এটি পাতলা স্যুপ, কোথাও ঘন স্ট্যু। তবে মূল উপাদান একই—গরুর মাংস, পাপরিকা, পেঁয়াজ, টমেটো আর ধীর আঁচ।
কোরবানির মাংস দিয়ে ‘গুলাশ’
গুলাশে সাধারণত ব্যবহার করা হয় গরুর মাংসের কাঁধের অংশ, যেটিকে পশ্চিমা রান্নায় ‘চক স্টেক’ বলা হয়। এই অংশে চর্বি ও কোলাজেন বেশি থাকায় ধীরে রান্না করলে মাংস খুব নরম হয়ে যায়।
বাংলাদেশে কোরবানির গরুর যেসব অংশ সাধারণত ভুনা বা ঝোলের জন্য রাখা হয়, সেগুলোর অনেকটাই গুলাশের জন্য আদর্শ। বিশেষ করে হাড়বিহীন সামান্য চর্বিযুক্ত মাংস কয়েক ঘণ্টা রান্নার পর অসাধারণ কোমল হয়ে যায়।
ঈদের দ্বিতীয় বা তৃতীয় দিনে যখন একটানা মসলাদার ভুনা খাওয়ার পর একটু ভিন্ন স্বাদের কিছু খেতে ইচ্ছা করে, তখন গুলাশ হতে পারে দারুণ বিকল্প। এতে ঝাল কম, কিন্তু স্বাদ গভীর এবং মুখে লেগে থাকার মতো।
গুলাশের প্রাণ: পাপরিকা
গুলাশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ উপাদান পাপরিকা। শুকনো লাল মরিচ থেকে তৈরি এই মসলাটি ঝালের জন্য নয়, বরং উষ্ণ, মোলায়েম স্বাদের জন্য বিখ্যাত।
বিশেষ করে ‘সুইট পাপরিকা’ গুলাশে সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত হয়। এটি মাংসকে দেয় লালচে-বাদামি রঙ এবং গভীর সুবাস।
অনেকে ভুল করে স্মোকড পাপরিকা ব্যবহার করেন। সেটিও সুস্বাদু, তবে ট্র্যাডিশনাল গুলাশে সাধারণত সুইট পাপরিকাই বেশি উপযোগী। কারণ এটি মাংসের স্বাদকে ঢেকে দেয় না।
‘গুলাশ’ রেসিপি
উপকরণ
গরুর মাংস (হাড়বিহীন, মাঝারি টুকরা)—১ কেজি
পেঁয়াজ কুচি—৩ কাপ
রসুন কুচি—৬ কোয়া
টমেটো কুচি বা ক্যানড টমেটো—২ কাপ
টমেটো পেস্ট—২ টেবিল চামচ
ক্যাপসিকাম—১টি (কিউব করে কাটা)
সুইট পাপরিকা—৩ টেবিল চামচ
গোলমরিচ গুঁড়া—১ চা চামচ
লবণ—স্বাদমতো
তেজপাতা—২টি
তেল—৪ টেবিল চামচ
বিফ স্টক বা গরম পানি—৩ কাপ
আলু—২টি (ঐচ্ছিক)
সামান্য চিলি ফ্লেক্স (ঝাল চাইলে)
রান্নার পদ্ধতি
প্রথমে বড় পাত্রে তেল গরম করে পেঁয়াজ ধীরে ধীরে ভাজতে হবে। পেঁয়াজ বাদামি নয়, বরং নরম ও হালকা মিষ্টি হওয়া পর্যন্ত রান্না করতে হবে। এরপর রসুন দিয়ে কিছুক্ষণ নেড়ে নিতে হবে।
এবার চুলার আঁচ কমিয়ে পাপরিকা দিতে হবে। খুব বেশি সময় নাড়িয়ে ভাজা যাবে না। কারণ পাপরিকা পুড়ে গেলে তেতো স্বাদ চলে আসে।
এরপর মাংস দিয়ে ভালোভাবে নেড়ে নিতে হবে, যাতে মসলার সঙ্গে মিশে যায়। তারপর টমেটো, টমেটো পেস্ট, তেজপাতা, গোলমরিচ ও লবণ দিতে হবে।
সবশেষে গরম পানি বা বিফ স্টক ঢেলে ঢাকনা দিয়ে খুব কম আঁচে অন্তত দুই থেকে আড়াই ঘণ্টা রান্না করতে হবে। মাঝেমধ্যে নেড়ে দিতে হবে।
শেষের দিকে ক্যাপসিকাম ও আলু যোগ করা যায়। তখন গ্রেভি ঘন হয়ে আসবে এবং মাংস একদম নরম হয়ে যাবে।
স্লো কুকারে করতে চাইলে সব উপকরণ একসঙ্গে দিয়ে ৪-৫ ঘণ্টা ‘লো’ সেটিংয়ে রান্না করলেই হবে।
গুলাশের সঙ্গে কী খাওয়া যায়
হাঙ্গেরিতে সাধারণত রুটি বা আলুর সঙ্গে গুলাশ খাওয়া হয়। ইউরোপের অনেক জায়গায় এটি ডাম্পলিং বা নুডলসের সঙ্গেও পরিবেশন করা হয়।
বাংলাদেশের খাবার টেবিলে গুলাশ সবচেয়ে ভালো মানিয়ে যায় সাদা পোলাও, পরোটা, চালের রুটি, লুচি, বাটার নান, খিচুড়ি ও সাদা ভাতের সঙ্গে৷
ঈদের রাতে এক বাটি গরম গুলাশ, পাশে নরম রুটি অথবা পোলাও আর পরিবারের সঙ্গে আড্ডা—এই পুরো অভিজ্ঞতাটাই আলাদা স্বস্তি এনে দিতে পারে।
ঈদের রান্নায় নতুন স্বাদের সম্ভাবনা
বাংলাদেশের ঈদ মানেই নানান মুখরোচক খাবারের ঐতিহ্য। কিন্তু সেই ঐতিহ্যের ভেতরেও নতুন কিছু যোগ করার জায়গা সবসময় থাকে। গুলাশ হয়তো কালাভুনা বা রেজালার জায়গা নেবে না। কিন্তু ঈদের দীর্ঘ মাংসভোজে এটি একটি ভিন্ন মাত্রা যোগ করতে পারে৷
বিশেষ করে যারা কম ঝাল কিন্তু গভীর স্বাদের খাবার পছন্দ করেন, তাদের জন্য গুলাশ হতে পারে কোরবানির মাংসের সবচেয়ে আরামদায়ক রূপগুলোর একটি।
একই টেবিলে যখন পরিচিত স্বাদের পাশে একটা নতুন রেসিপিও জায়গা পায়, তখন ঈদের খাবারটা শুধু ভরপেট খাওয়ার বিষয় হয়ে থেমে থাকে না, সেটা হয়ে ওঠে সারাজীবনের স্মৃতি। সময় যতই বদলাক, খাবার টেবিলে সবাই মিলে ভাগাভাগি করে মজাদার খাবার খাওয়ার আনন্দটাই হয়তো ঈদের সবচেয়ে চেনা রূপ৷