উচ্চশিক্ষায় বিদেশে একাকিত্বের ভয় কাটাতে যা করতে পারেন

নাদিয়া রহমান
নাদিয়া রহমান

বিদেশে উচ্চশিক্ষা শুরু করার সময় বেশিরভাগ শিক্ষার্থীই ভবিষ্যৎ নিয়ে উত্তেজিত থাকে। স্বাভাবিক! অনেক পরিশ্রমের পরই মেলে এই সুযোগ। নতুন দেশ, নতুন কিছুর হাতছানি, নতুন জীবন, সবই তখন সম্ভাবনার গল্প।

কিন্তু এই সম্ভাবনার পেছনে অনেকের মধ্যেই কাজ করে হোমসিকনেস, একাকিত্ব কিংবা পুরোনো-চেনাকে ছেড়ে যাওয়ার এক ধরনের ভীতি। অনেক শিক্ষকও একটা নির্দিষ্ট সময় শিক্ষকতা ও গবেষণায় দেওয়ার পরে এই ভীতির সম্মুখীন হন। এমনও দেখেছি, যিনি একটি ডিগ্রি নিয়ে এসেছেন, তার ক্ষেত্রেও পুনরায় যাওয়ার সময় এই আশঙ্কা কাজ করে।

এই ভয় কাজ করে মূলত পরিচিত কাঠামো, পরিচিত ঠিকানা, পরিবেশ ভেঙে পড়ার মধ্য দিয়ে। নিজের দেশ, পরিবার, ভাষা, দৈনন্দিন অভ্যাস, সবকিছু একসঙ্গে হারিয়ে গেলে মন স্বাভাবিকভাবেই নিরাপত্তাহীন হয়ে পড়ে। দেশে থাকলে বিপদের সময় ‘কাছে কেউ আছে’—এই ধারণাটাই হলো সবচেয়ে বড় মানসিক ভরসা। বিদেশ-বিভূঁইয়ে সেই ভরসাটুকু নেই। ফলে মন ছোট ছোট বিষয়েও ভয় পেতে শেখে। যেমন: অসুখ হলে কী হবে, মন খারাপ হলে কে শুনবে, বা একা হয়ে গেলে কীভাবে সামলাব।

হঠাৎ করে মায়ের রান্নার গন্ধ, সন্ধ্যার আজানের শব্দ, কিংবা বাড়ির উঠোনের দৃশ্য মনে পড়ে যায়। এই নস্টালজিয়াগুলো আসলে দুর্বলতা নয়, এগুলো আমাদের মানসিক শেকড়ের প্রমাণ। কিন্তু ভীতি তখন তৈরি হয়, যখন আমরা এই স্মৃতিগুলোকে বর্তমানের শূন্যতার সঙ্গে তুলনা করতে শুরু করি। এমন পরিস্থিতিতে ব্যক্তি এক ধরনের ‘ডিনায়াল’ পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যান। আর এটি সবচেয়ে বেশি কাজ করে, পুরোপুরি ভিন্ন একটি সংস্কৃতির দেশে।

নিজের অভিজ্ঞতা থেকে বললে, যুক্তরাষ্ট্রের একেকটি স্টেটের রয়েছে একেক ধরনের সংস্কৃতি। এমনকি একই স্টেটের ভিন্ন শহরের রয়েছে ভিন্ন জীবনযাত্রা, যাতায়াত ব্যবস্থা, আবহাওয়া। এই বিষয়গুলো কিন্তু আপনার নিত্যদিনের জীবনে প্রভাব রাখে। আপনি যে বাজার করবেন, তা আপনার ডর্মিটরি থেকে কতখানি দূরত্বে, সে শহরে তুষারপাত হলে আপনার জন্যও যাতায়াত ব্যবস্থা থাকবে কি না, ক্লাসে যাওয়ার পথে পর্যাপ্ত পরিবহন ব্যবস্থা আছে কি না, এই ছোটখাট বিষয়গুলো তখন বড় হয়ে ওঠে।

এই ভীতি আরও বাড়ে কারণ বিদেশে সবাই নিজের মতো করে শক্ত থাকার অভিনয় করে। ক্লাসে, কাজে, আড্ডায় সবাই আত্মবিশ্বাসী দেখালেও ভেতরে ভেতরে অনেকেই একই শূন্যতা বহন করে। কিন্তু সেই কথা প্রকাশ না হওয়ায় মনে হয়, আমি একাই ভুগছি। বাস্তবে ভয়টা ব্যক্তিগত নয়। এটা অভিবাসী শিক্ষাজীবনের একটি সাধারণ মানসিক অভিজ্ঞতা এবং এই বিষয়টিকে সহজভাবে দেখতে শেখাটাই এই সমস্যার সঙ্গে মোকাবিলা করার সর্ব প্রথম কাজ।

এই অবস্থায় সবচেয়ে জরুরি বিষয় হলো ভয়কে অস্বীকার না করা। অনেকেই মনে করে, হোমসিকনেস মানে আমি দুর্বল। এই ধারণাটাই সমস্যার মূল। ভীতি বা এই আশঙ্কাগুলোকে স্বীকার করে নিলে, সেটাকে বোঝার সুযোগ তৈরি হয়। নিজেকে প্রশ্ন করা দরকার, আমি ঠিক কী মিস করছি? মানুষ, না অনুভূতি? নাকি ভবিষ্যতের অনিশ্চয়তা?

পরামর্শ হিসেবে বলা যায়, বিদেশে থাকাকালীন নিজের জন্য একটি ‘নতুন পরিচিতি’ তৈরি করা জরুরি। ছোট ছোট রুটিন, নিজের পছন্দের খাবার রান্না, নিয়মিত হাঁটা, নির্দিষ্ট দিনে পরিবারের সঙ্গে কথা বলা, এই বিষয়গুলো মনকে স্থির রাখতে সাহায্য করে। একইসঙ্গে নিজের দেশের সংস্কৃতির সঙ্গে সংযোগ রাখা দরকার। তবে সেটাতে ডুবে না গিয়ে ভারসাম্য বজায় রাখা গুরুত্বপূর্ণ।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পরামর্শ হলো, একাকিত্বকে একেবারে এড়িয়ে চলার মতোন করে না দেখা। এটা বুঝতে শেখা প্রয়োজন যে, একা থাকা মানেই একা হয়ে যাওয়া নয়। এই সময়টা নিজেকে চেনার সুযোগ হিসেবেও দেখা যায়। ভয় থাকবে, নস্টালজিয়া আসবে, মাঝেমধ্যে মন ভেঙেও পড়বে। কিন্তু ধীরে ধীরে এই ভয়টাই শেখাবে, কীভাবে নিজেকে নিজের পাশে দাঁড়াতে হয়।

বিদেশে উচ্চশিক্ষা শুধু অ্যাকাডেমিক অর্জন নয়; এটি মানসিক পরিণতিরও একটি দীর্ঘ প্রক্রিয়া। আর সেই প্রক্রিয়ায় একাকিত্বের ভয় থাকাটা অস্বাভাবিক নয়। বরং মেনে নিতে হবে, এই পরিশ্রমের যাত্রাপথের পর নিশ্চয়ই ভালো একটি সময় অপেক্ষা করছে।