ঝাড়বাতির আলো থেকে নগরের অলিগলি: শংকর যেভাবে জীবন দেখালেন
বাংলা সাহিত্যের জনপ্রিয় কথাশিল্পী শংকর—আসল নাম মণিশংকর মুখোপাধ্যায়—চলে গেলেন। তার প্রয়াণে যেন বাংলা উপন্যাসের এক পরিচিত শহর হঠাৎ আলোহীন হয়ে পড়ল। অথচ তিনি আমাদের যে শহর, যে মানুষ, যে জীবন দেখিয়েছেন, তা কোনোদিন নিভে যাবে না। তাই তাকে স্মরণ করার সবচেয়ে ভালো উপায় হয়তো একটু ফিরে দেখা—শংকর আমাদের জীবনকে কীভাবে দেখতে শিখিয়েছিলেন।
শংকর ছিলেন শহরের কথক। কিন্তু তার শহর শুধু ইট-কাঠ-সিমেন্টের নয়; সেই শহর ভরা স্বপ্নভঙ্গ, উচ্চাকাঙ্ক্ষা, প্রেম, লজ্জা, লোভ, বেঁচে থাকার লড়াই আর এক ধরনের নীরব মর্যাদাবোধে। তার লেখায় কলকাতা কখনো ঝলমলে, কখনো নির্মম। তবু সবসময় জীবন্ত।
এই জীবন্ত শহরের প্রথম বড় চেহারা আমরা দেখি তার বহুলপঠিত উপন্যাস ‘কত অজানারে’-তে। এক সাধারণ যুবকের চাকরির অভিজ্ঞতার ভেতর দিয়ে তিনি যে অফিস-জীবনের জগৎ তুলে ধরেছেন, তা শুধু গল্প নয়, এক প্রজন্মের বাস্তবতা। বড় দালান, বড় সাহেব, ছোট কর্মচারী—এই শ্রেণিবিন্যাসের ভেতরে কীভাবে মানুষ তার আত্মসম্মান বাঁচিয়ে রাখে, কীভাবে অপমান গিলে নিয়ে পরদিন আবার কাজে যায়—শংকর তা দেখিয়েছেন একেবারে ভেতর থেকে।
এখানে নায়ক কোনো বীরপুরুষ নয়; সে আমাদের মতোই দ্বিধাগ্রস্ত, স্বপ্নবান, কখনো ভীত, কখনো আশাবাদী। শংকর আমাদের শিখিয়েছেন, সাহিত্যের নায়ক মানেই অসাধারণ কেউ নয়—অতি সাধারণ মানুষও উপন্যাসের কেন্দ্র হতে পারে।
এই সাধারণ মানুষের জীবন যখন আরও জটিল, আরও কূটনীতিময় হয়ে ওঠে, তখন আমরা পৌঁছে যাই ‘চৌরঙ্গী’-তে। একটি অভিজাত হোটেলকে কেন্দ্র করে যে কাহিনী, তা আসলে সমাজের এক ক্ষুদ্র সংস্করণ। এখানে আছে ক্ষমতার খেলা, প্রেমের ভঙ্গুরতা, সামাজিক ভান, অর্থের মোহ। হোটেলের ঝাড়বাতির আলোয় যে সম্পর্কগুলো উজ্জ্বল মনে হয়, তার আড়ালে কত অন্ধকার, কত একাকীত্ব—শংকর তা নির্মোহ চোখে দেখিয়েছেন। তিনি কাউকে একেবারে খলনায়ক বানাননি, আবার পুরোপুরি নায়কও বানাননি। মানুষ তার কাছে ধূসর—ভালো-মন্দ মিশ্রিত। এটাই তার বাস্তবতাবোধ ও লেখনীর শক্তি।
মানুষের উচ্চাকাঙ্ক্ষা ও নৈতিকতার টানাপোড়েনকে আরও গভীরভাবে দেখি ‘সীমাবদ্ধ’-এ। করপোরেট দুনিয়ার প্রতিযোগিতা, পদোন্নতির লোভ, সাফল্যের মোহ—এসবের মধ্যে একজন মানুষ কীভাবে ধীরে ধীরে নিজের ভেতরের সরলতাকে হারিয়ে ফেলে, সেই কাহিনী আজও সমান প্রাসঙ্গিক। শংকর এখানে কোনো বক্তৃতা দেন না; তিনি শুধু পরিস্থিতি তৈরি করেন। পাঠক নিজেই বুঝতে পারে—উন্নতি সবসময় মুক্তি নয়, কখনো কখনো তা হয়ে ওঠে এক নতুন বন্দিত্ব।
একইভাবে ‘জনঅরণ্য’-এ তিনি দেখিয়েছেন বেকার যুবকের হতাশা ও শহুরে বাজারব্যবস্থার নির্মমতা। কাজের খোঁজে ঘুরতে ঘুরতে এক তরুণ যখন বুঝতে পারে, এই অরণ্যে টিকে থাকতে হলে তাকে নিজের নৈতিকতার সঙ্গে আপস করতে হবে—তখন গল্পটি শুধু ব্যক্তিগত থাকে না, হয়ে ওঠে সময়ের দলিল। শংকর আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখান, সমাজ যদি তরুণদের জন্য পথ না রাখে, তারা অন্ধগলিতে ঢুকতেই বাধ্য হবে।
শংকরের লেখার আরেকটি দিক হলো সংবাদমাধ্যম ও জনজীবনের ভেতরের টানাপোড়েন, যা আমরা পাই ‘স্থানীয় সংবাদ’-এ। এখানে সংবাদ শুধু তথ্য নয়, ক্ষমতার হাতিয়ারও। একটি ছোট পরিসরের সংবাদজগৎ কীভাবে বড় রাজনীতির সঙ্গে জড়িয়ে পড়ে, কীভাবে ব্যক্তিগত স্বার্থ আর জনস্বার্থের সীমা ঝাপসা হয়ে যায়—শংকর তা সূক্ষ্মভাবে ধরেছেন। তার সাংবাদিক চরিত্রগুলো একদিকে আদর্শবাদী, অন্যদিকে বাস্তবতার চাপে ক্লান্ত। যেন আমাদের চারপাশের মানুষই। আর এরসঙ্গে যুক্ত হয় নকশাল আন্দোলনের সেই উত্তাল সময়। একদিকে ব্যক্তিগত আদর্শ আর বিবেক, অন্যদিকে পত্রিকার মালিকপক্ষের স্বার্থ—এর ভেতরই টিকে থাকতে হয় সেই তরুণকে।
বিজ্ঞান ও গবেষণার জগৎ নিয়েও তিনি লিখেছেন ‘নিবেদিতা রিসার্চ ল্যাবরেটরি’-তে। এখানে ল্যাবরেটরি শুধু গবেষণার জায়গা নয়, মানুষের স্বপ্ন আর ব্যর্থতার ক্ষেত্র। বিজ্ঞানীও মানুষ—তারও অহং আছে, ভালোবাসা আছে, প্রতিযোগিতা আছে। জ্ঞানের সাধনা কখনো মহৎ, কখনো স্বার্থপর—এই দ্বৈততা শংকর দেখাতে ভয় পাননি। ফলে তার উপন্যাসে বিজ্ঞানও রক্তমাংসের হয়ে ওঠে।
শক্তি, সৌন্দর্য ও আকাঙ্ক্ষার সম্পর্ক নিয়ে তিনি লিখেছেন সম্রাট ও সুন্দরী-তে। এখানে সম্পর্কের ভেতরে ক্ষমতার খেলা স্পষ্ট। প্রেম কি নিছক আবেগ, নাকি তার ভেতরেও আধিপত্যের রাজনীতি কাজ করে? শংকর এই প্রশ্ন তোলেন, কিন্তু উত্তর চাপিয়ে দেন না। পাঠককে ভাবতে বাধ্য করেন।
আর তার আত্মস্মৃতিমূলক রচনার সুর আমরা পাই ‘কথা মন্থন’-এ। সেখানে লেখক নিজেই নিজের জীবন ও সময়কে ফিরে দেখেছেন। কীভাবে এক সাধারণ পরিবার থেকে উঠে এসে সাহিত্যজগতে জায়গা করে নেওয়া, কীভাবে অভিজ্ঞতা জমা হতে হতে গল্প হয়ে ওঠে—এই বইয়ে তার আভাস আছে। এতে বোঝা যায়, শংকরের শক্তি কল্পনায় যত না, তার চেয়ে বেশি পর্যবেক্ষণে। তিনি জীবনকে গভীর মনোযোগ দিয়ে দেখতেন, তারপর সহজ ভাষায় লিখে ফেলতেন।
শংকরের ভাষা ছিল সহজ, কিন্তু সরল নয়। তিনি জটিল ভাবনাও এমনভাবে বলতেন, যেন পাশের ঘরের কেউ গল্প করছে। এই সহজতা পাঠককে টেনে নেয়। তার উপন্যাস পড়তে গিয়ে মনে হয়—এ তো আমাদেরই গল্প। আমাদের অফিস, আমাদের রাস্তা, আমাদের ব্যর্থতা, আমাদের গোপন লজ্জা। তিনি শহুরে মধ্যবিত্তের জীবনকে এমনভাবে লিখেছেন, যা একদিকে সময়ের দলিল, অন্যদিকে চিরকালীন।
শংকর জীবনকে নির্দিষ্ট কোনো এক রঙে দেখেননি। তিনি দেখিয়েছেন, সাফল্যের ভেতরে ভয় থাকে, প্রেমের ভেতরে ক্ষমতা থাকে, উচ্চাকাঙ্ক্ষার ভেতরে একাকীত্ব থাকে। তিনি দেখিয়েছেন- মানুষ ভেঙে পড়ে, তবু আবার উঠে দাঁড়ায়। আপস করে, তবু ভেতরে কোথাও স্বপ্ন লালন করে। তার চরিত্ররা সম্পূর্ণ ভালো নয়, সম্পূর্ণ খারাপও নয়—তারা আমাদের মতোই অসম্পূর্ণ।
আজ যখন তিনি আর নেই, তখন তার লেখা যেন আরও বেশি প্রাসঙ্গিক মনে হয়। কারণ আমাদের শহর বদলেছে, অফিস বদলেছে, প্রযুক্তি বদলেছে—কিন্তু মানুষের ভেতরের টানাপোড়েন বদলায়নি। বেকারত্ব, প্রতিযোগিতা, সাফল্যের চাপ, সম্পর্কের ভঙ্গুরতা—এসব আজও একই রকম তীব্র।
শংকর আমাদের শিখিয়েছেন, জীবনকে দেখার জন্য খুব বড় দর্শনের দরকার নেই; দরকার খোলা চোখ ও সততার দৃষ্টি। তিনি আমাদের দেখিয়েছেন, সাহিত্যের কাজ শুধু বিনোদন নয়—পাঠকের সামনে একটি আয়না ধরা। সেই আয়নায় আমরা নিজেদের দেখি, কখনো লজ্জা পাই, কখনো সাহস পাই।
তার প্রয়াণে বাংলা সাহিত্য এক মহীরুহ হারাল। কিন্তু তিনি যে জীবনদর্শন রেখে গেলেন—মানুষকে কাছ থেকে দেখা, ক্ষমতার আড়াল সরিয়ে ফেলা, সাধারণ মানুষের সংগ্রামকে মর্যাদা দেওয়া—তা আমাদের সঙ্গে থাকবে। শংকর যেভাবে জীবন দেখালেন, তাতে আমরা বুঝেছি, গল্প আসলে দূরের নয়; গল্প রয়েছে আমাদের মাঝেই। আর যতদিন এই শহর থাকবে, যতদিন মানুষ স্বপ্ন দেখবে ও ভাঙনের যন্ত্রণায় পুড়বে, ততদিন শংকরের উপন্যাসও বেঁচে থাকবে—নীরবে, অথচ গভীরভাবে।