রংপুরের মানুষ ভুলে যেতে বসেছে ‘অমপুরিয়া’ ভাষা

এস দিলীপ রায়
এস দিলীপ রায়

তিস্তাপাড়ের বারোঘরিয়া গ্রাম। দুই প্রবীণ কৃষক নিজেদের মধ্যে কথা বলছেন এক ভিন্ন সুরে—এ ভাষা শুদ্ধ বাংলা নয়আবার পুরোপুরি স্থানীয় উপভাষাও নয়। ভাষাটির নাম ‘অমপুরিয়া’। 

লালমনিরহাটের আদিতমারী উপজেলার তিস্তাপাড়ের এই গ্রামেই জন্ম ও বেড়ে ওঠা রফিজ উদ্দিন ও আজিজুল ইসলামের। দুজনেই পেরিয়েছেন জীবনের অন্তত ষাট বসন্ত। 

কথা বলতে বলতে রফিজ উদ্দিন বলছিলেন, ‘মোর তামকুগছগুলা জারোত টরটরা নাগি গ্যাইছে। গার আঙ্গাটাও ছিড়ি গ্যাইছে। একটা আঙ্গা কেনার পাইসাও নাই।’

আজিজুল ইসলামও আক্ষেপের সুরে বলেন, ‘জার নিয়া মুচিপদোত আছোং। বাড়ির ছওয়াগুলাতো মোর কথায় শোনে না। সাতসকালে মোক নিন থাকি ওঠা নাগে। ভুইয়োত যেয়া আইল কাটা নাগে। ফির গরুক ঘাস-পল খাওয়া নাগে।’

তিনি আরও যোগ করেন, ‘আর কইস না বাহেএ্যালা মোর ছওয়াগুলাও কথা শুইনবার নাইকছে না।’

এ দুই কৃষকের কথোপকথনে উঠে আসে কৃষিজীবনের সংকটের পাশাপাশি হারিয়ে যেতে বসা একটি ভাষার বাস্তবতা। গ্রামে এখনও ৫০ বছরের ঊর্ধ্বে বয়সী মানুষজন একসঙ্গে হলে অনেক সময় ‘অমপুরিয়া’ ভাষায় কথা বলেন। 

তবে বাড়ির ভেতরে কিংবা সন্তানদের সঙ্গে এই ভাষার ব্যবহার প্রায় নেই বললেই চলে। ফলে নতুন প্রজন্ম দিনের পর দিন এ ভাষা থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ছে।

অমপুরিয়া ভাষায় ব্যবহৃত কিছু শব্দের অর্থ শুদ্ধ বাংলায় বোঝালে ভাষাটির স্বাতন্ত্র্য আরও স্পষ্ট হয়। যেমন—‘আঙ্গা’ মানে জামা, ‘মুচিপদ’ মানে বিপদ, ‘আইল’ মানে জমির সীমানা, ‘ছওয়া’ মানে সন্তান, ‘নিন’ মানে ঘুম এবং ‘এ্যাদোন’ মানে এরকম, ‘জার’ মানে ঠান্ডা, ভুই’ মানে জমি।

রফিজ উদ্দিনের ছেলে বেলাল হোসেন (৪০) নিজেও কৃষিকাজ করেন। তবে এসব শব্দ তার কাছে প্রায় অপরিচিত। অমপুরিয়া ভাষায় প্রশ্ন করলে তিনি বুঝতে পারেননি। শুদ্ধ বাংলায় জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘আমাদের এলাকার মানুষ ঠান্ডায় কাবু হচ্ছে।’ এই উত্তরই ইঙ্গিত দেয়—ভাষাগত দূরত্ব কতটা গভীর হয়েছে।

লালমনিরহাট জেলা জাদুঘরের প্রতিষ্ঠাতা পরিচালক আশরাফুজ্জামান মন্ডল সবুজ দ্য ডেইলি স্টারকে বলেন, ‘ব্রিটিশ আমলে এই উপমহাদেশে আঞ্চলিক ভাষা নিয়ে একটি গবেষণাপত্র প্রকাশিত হয়েছিল। সেখানে ১৪টি আঞ্চলিক ভাষার উল্লেখ ছিলযার মধ্যে “অমপুরিয়া” ও “রাজবংশি” ভাষা ছিল চতুর্থ স্থানে।’

তিনি জানানভারতের কোচবিহার ও জলপাইগুড়ি অঞ্চলে রাজবংশি ভাষা এবং বাংলাদেশের রংপুর অঞ্চলে অমপুরিয়া ভাষার ব্যবহার দেখা যায়। দুই ভাষার মধ্যে ঘনিষ্ঠ মিল রয়েছে। গবেষণায় দেখা গেছেবর্তমানে মাত্র ৩০ শতাংশ মানুষ অমপুরিয়া ভাষা ব্যবহার করছেন।

তার মতে, ‘অমপুরিয়া ভাষা টিকিয়ে রাখতে হলে এর চর্চা বাড়াতে হবে এবং নতুন প্রজন্মকে সচেতনভাবে এই ভাষার সঙ্গে পরিচিত করাতে হবে।’

কুড়িগ্রামের রাজারহাট উপজেলার সিঙ্গারডাবরি এলাকার স্কুলশিক্ষক মনজুরুল ইসলাম (৪৫) দ্য ডেইরি স্টারকে বলেন, ‘আমি নিজেও আমাদের আঞ্চলিক ভাষা প্রায় ভুলে গেছি। আগে এ ভাষায় কথা বলতাম। জানি ঠিকইকিন্তু ব্যবহার করি না। বর্তমান প্রজন্ম তো জানেই না।’

তিনি আরও বলেন, ‘অনেকে মনে করেন বাড়িতে আঞ্চলিক ভাষায় কথা বললে সন্তানের আধুনিকতা নষ্ট হবে। এই মানসিকতার কারণেই পরিবার থেকেই ভাষার চর্চা কমে গেছে।’

রংপুরের কারমাইকেল কলেজের ইংরেজি বিভাগের শিক্ষার্থী নয়ন কুমার সেন বলেন, ‘আমরা রংপুরের আঞ্চলিক ভাষায় কথা বললে অনেক সময় ঠাট্টা করা হয়। এ লজ্জার কারণেই আমরা এ ভাষায় কথা বলি না। ধীরে ধীরে ভুলে যাচ্ছি। এমনকি বাড়িতে গেলেও এখন কেউ আমাদের সঙ্গে অমপুরিয়া ভাষায় কথা বলে না।’

দ্য ডেইলি স্টারকে লালমনিরহাট সদর উপজেলার সিন্দুরমতি গ্রামের প্রবীণ কৃষক সুরেশ চন্দ্র বর্মণ (৮০) বলেন, ‘অমপুরিয়া ভাষা খুব মধুর। এ ভাষায় কথা বললে প্রাণ জুড়িয়ে যায়। কিন্তু এখন মানুষকে এই ভাষায় কথা বলতে শোনা যায় না।’

অমপুরিয়া ভাষায় তিনি বলেন, ‘মুই এ্যালাং অমপুরিয়া ভাষায় কথা কং। হামরাগুলা যত উপড়া যাইনা ক্যানে অমপুরিয়া ভাষা হইল হামার গাছের গোড়া।’

লালমনিরহাট সাংস্কৃতিক কেন্দ্রের পরিচালক সুফী মোহাম্মদ দ্য ডেইলি স্টারকে বলেন, ‘রংপুর অঞ্চলের নিজস্ব আঞ্চলিক ভাষা হলো অমপুরিয়া। একসময় এই ভাষায় সাংস্কৃতিক চর্চা ছিল ব্যাপক। এখন তা অনেকটাই কমে গেছে।’

তিনি বলেন, ‘সময়ের প্রয়োজনে আমরা নিজেরাই এই ভাষাকে গুরুত্ব দিচ্ছি না। ফলে ধীরে ধীরে আমাদের প্রাণের ভাষা হারিয়ে যাচ্ছে। লজ্জা আর ঠাট্টাকে উপেক্ষা করে নিজস্ব পরিচয়ের প্রতি সম্মানবোধ তৈরি করলেই অমপুরিয়া ভাষা টিকে থাকবে।’

বর্তমানে ভাওয়াইয়া গানেই অমপুরিয়া ভাষার চর্চা সবচেয়ে বেশি টিকে আছে বলে জানান কুড়িগ্রামের উলিপুর ভাওয়াইয়া একাডেমির প্রতিষ্ঠাতা পরিচালক ও ভাওয়াইয়া গবেষক ভূপতি ভূষণ বর্মা। 

তিনি বলেন, ‘ভাওয়াইয়া শিল্পীরা এখনও এই ভাষায় গান গাইছেন। ভাওয়াইয়া হারিয়ে গেলে অমপুরিয়া ভাষাও হারিয়ে যাবে। গ্রামে কিছুটা চর্চা থাকলেও শহরে এ ভাষা প্রায় নেই বললেই চলে।’

তিনি দৃঢ় কণ্ঠে জানান, ‘আমি যতদিন বেঁচে থাকবঅমপুরিয়া ভাষাকে লালন করবএ ভাষায় গান লিখব ও গাইব। অমপুরিয়া ভাষা হইল হামার প্রাণের ভাষা।’