জুলাই সনদের আলোকে সংবিধান সংশোধনে সংসদীয় কমিটি গঠনের প্রস্তাব সরকারের
জুলাই সনদের আলোকে সংবিধান সংশোধনের জন্য একটি বিশেষ সংসদীয় কমিটি গঠনের প্রস্তাব দিয়েছে সরকার।
আজ বুধবার সরকারের দেওয়া এই প্রস্তাবের পরিপ্রেক্ষিতে বিরোধীদল বলেছে, এই সংসদীয় কমিটিতে যোগদানের বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিতে তাদের সময় প্রয়োজন, কারণ তারা সংবিধান ‘সংস্কার’ চায়।
আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান বলেন, তিনি ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ এর আগে সংবিধানে সংশোধনী আনার জন্য একটি বিশেষ কমিটি গঠনের প্রস্তাব দিয়েছিলেন।
আইনমন্ত্রী বলেন, ‘আমরা ১২ সদস্যের একটি তালিকা তৈরি করেছি, যার মধ্যে বিএনপি, গণঅধিকার পরিষদ, গণসংহতি, বাংলাদেশ জাতীয় পার্টি (বিজেপি) ও স্বতন্ত্র সংসদ সদস্যরা রয়েছেন।’
জাতীয় সংসদে বিরোধীদলের প্রতিনিধিত্বের অনুপাত তুলে ধরে তিনি বলেন, ‘শতাংশের হিসাবে বিরোধীদলের ২৬ শতাংশ আসন রয়েছে। তাদের পক্ষ থেকে আমরা পাঁচটি নাম চাইছি। আমরা ১২ জনের একটি তালিকা তৈরি করেছি—বিএনপি থেকে সাতজন ও অন্যান্য দল থেকে পাঁচজন। বিরোধীদল যদি পাঁচটি নাম দেয়, তাহলে আমরা আগামীকাল (বৃহস্পতিবার) বিষয়টি উপস্থাপন করতে চাই এবং জুলাই সনদের আলোকে সংবিধান সংশোধন বিষয়ক বিশেষ কমিটি গঠনের প্রক্রিয়া এগিয়ে নিয়ে যেতে চাই।’
আইনমন্ত্রীর প্রস্তাবের পর ডেপুটি স্পিকার কায়সার কামাল বিরোধীদলীয় নেতাকে উদ্দেশ্য করে বলেন, ‘সরকারের পক্ষ থেকে ১২ সদস্যের একটি তালিকা তৈরি করা হয়েছে—বিএনপি থেকে সাতজন ও অন্যান্য দল থেকে পাঁচজন। আপনার বিরোধীদলের পক্ষ থেকে পাঁচটি নাম চাওয়া হয়েছে। ফলে, বিশেষ কমিটিতে ১৭ জন সদস্য থাকবেন। অনুগ্রহ করে আপনার পাঁচটি নাম দিন, যাতে গঠন প্রক্রিয়া এগিয়ে যেতে পারে।’
চিফ হুইপ সংসদ নেতা ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের পক্ষ থেকে তাকে শুভেচ্ছা জানিয়েছেন উল্লেখ করে বিরোধীদলীয় নেতা শফিকুর রহমান বলেন, ‘আমি তাকে বলেছি যে আমাদের নিজেদের মধ্যে আলোচনার বিষয় রয়েছে। ধারণাগত পার্থক্য আছে। আমরা এখনই কোনো মতামত দিতে পারছি না। আমরা পরে জানাবো। আজ হয়তো সেটা সম্ভব হবে না।’
তিনি বলেন, ‘আমরা (সংবিধান) সংস্কার চাই। কিন্তু এখানে সংশোধনী আনা হচ্ছে। আমাদের মধ্যে আগেও মতপার্থক্য ছিল এবং এখনও আছে। আমরা প্রস্তাবটি পেয়েছি এবং শুনেছি, কিন্তু আমরা পরে জবাব দেবো। এই মুহূর্তে আমরা কিছু বলতে চাইছি না।’
বিরোধীদলীয় নেতাকে ধন্যবাদ জানিয়ে আইনমন্ত্রী বলেন, ‘আমাদের কোনো আপত্তি নেই। আমরা অপেক্ষা করব। আমরা জুলাই সনদের আলোকে সাংবিধানিক সংশোধনী নিয়ে এগিয়ে যাবো। পরবর্তী অধিবেশন পর্যন্ত অপেক্ষা করা যাবে।’
সংবিধান সংস্কার বা সংশোধনী বিরোধীদল ও শাসক দলের জন্য একটি বিতর্কিত বিষয় হয়ে রয়েছে।
জুলাই সনদ বাস্তবায়ন আদেশকে ‘অসীম প্রতারণা ও জাতীয় বিশ্বাসঘাতকতার দলিল’ আখ্যা দিয়ে গত ৩১ মার্চ সরকারি দলের তরফে সংবিধান সংশোধনের জন্য একটি সর্বদলীয় বিশেষ সংসদীয় কমিটি গঠনের প্রস্তাব দেওয়া হয়।
এর জবাবে বিরোধীদলীয় নেতা শফিকুর রহমান সংবিধান সংস্কার পরিষদ আহ্বানের জন্য একটি পৃথক বিশেষ সংসদীয় কমিটি গঠনের প্রস্তাব দিয়ে বলেন, ‘আমাদের আবেদন হলো, কমিটিতে যেন উভয় পক্ষ থেকে সমান সংখ্যক সদস্য থাকেন, যাতে আমরা আমাদের মতামত যথাযথভাবে উপস্থাপন করতে পারি।’
বিরোধীদলীয় নেতার আনা একটি মুলতবি প্রস্তাবের ওপর আলোচনার সময় জুলাই সনদ বাস্তবায়ন আদেশ অনুসারে সংবিধান সংস্কার পরিষদ আহ্বান করার কথা বলা হয়েছিল।
জুলাই সনদ আদেশ অনুসারে, ১৩তম সংসদের সদস্যদের দ্বৈত ভূমিকা পালন করার কথা ছিল—সংসদ সদস্য ও সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য—যাতে ১৮০ কার্যদিবসের মধ্যে জুলাই সনদে বর্ণিত ৪৮টি সাংবিধানিক বিধান নিয়ে কাজ করা যায়।
এই উদ্দেশ্যে সংসদ সদস্যদের দুটি পৃথক শপথ গ্রহণ করতে হতো—একটি সংসদ সদস্য হিসেবে এবং অন্যটি পরিষদের সদস্য হিসেবে।
তবে, পরিষদ আহ্বান করা হয়নি।
আদেশ অনুসারে, সংসদের প্রথম অধিবেশনের মতোই পরিষদের প্রথম অধিবেশন আহ্বান করার কথা ছিল নির্বাচনের ফলাফল ঘোষণার ৩০ দিনের মধ্যে।
কিন্তু, সেটা এখনও করা হয়নি।
বিএনপি নেতৃত্বাধীন জোটের সংসদ সদস্যরা সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে শপথ নেননি। অন্যদিকে, জামায়াত নেতৃত্বাধীন ১১-দলীয় জোটের ৭৭ জন সংসদ সদস্য উভয় শপথ গ্রহণ করেছেন।
রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে আলোচনার মাধ্যমে জাতীয় ঐকমত্য কমিশন জুলাই জাতীয় সনদের খসড়া তৈরি করে। এর প্রস্তাবগুলোর মধ্যে ৪৮টি সংবিধান সম্পর্কিত।
এই মৌলিক সংস্কার প্রস্তাবগুলোর কয়েকটিতে বিএনপি ভিন্নমত পোষণ করে এবং ‘নোট অব ডিসেন্ট’ দিয়ে নিজেদের অবস্থান অনুযায়ী সাংবিধানিক সংশোধনের পক্ষে সমর্থন জানায়।
অন্যদিকে, জামায়াতে ইসলামী, এনসিপি ও অন্যান্য বিরোধীদলগুলো সাংবিধানিক সংস্কার পরিষদের মাধ্যমে জুলাই সনদের সব প্রস্তাব বাস্তবায়নের পক্ষে। তারা সাংবিধানিক সংস্কারের দাবি জানায়।
জুলাই জাতীয় সনদের ৪৮টি সংবিধান-সম্পর্কিত প্রস্তাব বাস্তবায়নের জন্য একটি গণভোট অনুষ্ঠিত হয়। সেই গণভোটে মৌলিক সংস্কার বিষয়ে বিএনপির ভিন্নমত কোনো গুরুত্ব পায়নি।
গণভোটে যেহেতু ‘হ্যাঁ’ ভোট জিতেছে, তাই সংসদ শুধু তার নিয়মিত কার্যাবলীই নয়, বরং একটি সাংবিধানিক সংস্কার পরিষদ হিসেবেও কাজ করবে বলে মনে করছে বিরোধীদল।