মানসিক দাসত্ব থেকে মুক্তির গান শুনিয়েছিলেন যিনি

মাহমুদ নেওয়াজ জয়
মাহমুদ নেওয়াজ জয়

রাত অনেক। ঢাকার কোনো ছাদের ওপর বসে এক তরুণ হেডফোনে গান শুনছে। তার সামনে অন্ধকার শহর। দূরে সাইরেন। কোথাও জেনারেটরের শব্দ। কোথাও রাজনৈতিক পোস্টার ছিঁড়ে যাচ্ছে বাতাসে।

তার প্লেলিস্টে হঠাৎ বাজতে শুরু করে—‘নো উইমেন, নো ক্রাই’। অদ্ভুত ব্যাপার হলো, গানটা জ্যামাইকার। গায়ক একজন কৃষ্ণাঙ্গ রেগে শিল্পী। গানটি লেখা হয়েছিল বহু বছর আগে। তবু সেই তরুণের মনে হয়, এই গান যেন তার নিজের জীবনের কথাই বলছে। এটাই বব মার্লের সবচেয়ে বড় জাদু।

তিনি শুধু একজন গায়ক ছিলেন না। তিনি হয়ে উঠেছিলেন তৃতীয় বিশ্বের তরুণদের এক অদৃশ্য ভাষা। বাংলাদেশের কোনো বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্র, নাইজেরিয়ার কোনো বেকার তরুণ, প্যালেস্টাইনের কোনো উদ্বাস্তু কিশোর বা লাতিন আমেরিকার কোনো বিদ্রোহী কবি—সবাই কোনো না কোনোভাবে তার গানের ভেতরে নিজেদের খুঁজে পেয়েছে।

কারণ বব মার্লে গান গাইতেন ক্ষুধা নিয়ে। অসমতা নিয়ে। রাষ্ট্রের অবহেলা নিয়ে। মানুষের মর্যাদা নিয়ে। আর এই বিষয়গুলো তৃতীয় বিশ্বের মানুষের কাছে কখনো পুরোনো হয় না।

জ্যামাইকা পৃথিবীর খুব ছোট একটি দেশ। ক্যারিবিয়ান সাগরের দ্বীপ। কিন্তু সেই দ্বীপের বস্তি, দারিদ্র্য, রাজনৈতিক সহিংসতা আর ঔপনিবেশিক ইতিহাসের সঙ্গে ঢাকা, লাগোস বা বুয়েনোস এইরেসের দূরত্ব খুব বেশি ছিল না।

বব মার্লে বড় হয়েছেন দারিদ্র্যের মধ্যে। তার শৈশব কেটেছে ট্রেঞ্চ টাউন নামের এক বস্তিতে। সেখানে ছিল ভাঙা ঘর, বেকারত্ব, গ্যাং সহিংসতা, অনিশ্চয়তা। কিন্তু সেই অন্ধকারের মাঝেও ছিল গান। রাতে মানুষ গিটার বাজাত। গান গাইত। বেঁচে থাকার চেষ্টা করত।

তৃতীয় বিশ্বের শহরগুলোও অনেকটা এমন—এখানে মানুষ খুব কম জিনিস নিয়ে বাঁচে। কিন্তু স্বপ্ন দেখে খুব বড়। ঢাকার কোনো ছাত্র হয়তো টিউশনি করে বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ে। দিনশেষে ক্লান্ত, মনে ভয়—চাকরি হবে তো? পরিবার টিকবে তো? দেশটা কোথায় যাচ্ছে? তারপরও সে বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডা দেয়। প্রেমে পড়ে। কবিতা লেখে। বিপ্লবের কথা ভাবে।

বব মার্লের গান ঠিক এই জায়গাতেই এসে আপন লাগে। তার গান ছিল তৃতীয় বিশ্বের মানুষের বেঁচে থাকার সংগ্রাম নিয়ে।

তাই তার কণ্ঠে মানুষ নিজের ক্লান্তির কথা শুনতে পেত। বিশেষ করে তৃতীয় বিশ্বের তরুণরা। কারণ তারা খুব ছোটবেলা থেকেই বুঝে যায়, পৃথিবী সবার জন্য সমান না।

Bob Marley
ছবি: সংগৃহীত

কেউ জন্ম নেয় সুযোগ নিয়ে। কেউ জন্ম নেয় লোডশেডিং, দুর্নীতি, ভাঙা রাস্তা আর অনিশ্চয়তার মধ্যে। এই অভিজ্ঞতা আফ্রিকার, দক্ষিণ এশিয়ার, লাতিন আমেরিকারও। তাই যখন বব মার্লে গাইতেন ‘গেট আপ, স্ট্যান্ড আপ’ তখন সেটা শুধু গান থাকত না, হয়ে উঠত এক ধরনের মানসিক প্রতিরোধের ভাষা।

তার গানের ভেতরে একটা অদ্ভুত জিনিস ছিল। রাগ ছিল, কিন্তু ঘৃণা ছিল না। বিদ্রোহ ছিল, আবার মানবতাও ছিল। এ কারণেই তিনি শুধু রাজনৈতিক শিল্পী নন। তিনি ছিলেন কষ্ট সয়ে বেঁচে থাকা মানুষদের শিল্পী।

তৃতীয় বিশ্বের অনেক তরুণের জীবনেই এক ধরনের চাপা হতাশা থাকে। তারা দেখে, তাদের প্রতিভা আছে, স্বপ্ন আছে, কিন্তু সিস্টেম তাদের জন্য তৈরি নয়। কেউ চাকরি পায় না। কেউ সেন্সরশিপের মুখে পড়ে। কেউ রাজনৈতিক সহিংসতায় বন্ধু হারায়। কেউ দেশ ছাড়ার স্বপ্ন দেখে।

এসব মানুষের কাছে বব মার্লে ছিলেন এমন একজন, যিনি বলতেন—তুমি একা নও। তার গান শুনলে মনে হয়, পৃথিবী যত নিষ্ঠুরই হোক, মানুষের আত্মা পুরোপুরি হারিয়ে যায় না। এই কারণেই হয়তো তার গান এত দেশে এত গভীরভাবে বেঁচে আছে।

বাংলাদেশে নব্বইয়ের দশকে বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে, ব্যান্ড সংগীতের আড্ডায়, দেয়ালে দেয়ালে বব মার্লের পোস্টার দেখা যেত। অনেকেই ইংরেজি পুরো বুঝত না। তবু ববের কণ্ঠে এক ধরনের সত্যতা ছিল, যা তরুণদের টেনে নিয়েছিল। তাদের মনে হতো, এই মানুষটা অভিনয় করছেন না, তিনি সত্যিই কষ্ট দেখেছেন।

তৃতীয় বিশ্বের তরুণদের কাছে শিল্পীর সৎ হওয়াটা গুরুত্বপূর্ণ ছিল। কারণ তারা প্রতিদিন মিথ্যার প্রবাহ দেখে। রাজনৈতিক ভাষণ দেখে। নেতিবাচক খবর ও কপট হাসি দেখে। তারা এমন কাউকে খোঁজে, যে সত্যি কথা বলে। বব মার্লের গানে সেই সত্যি ছিল।

তার গানগুলোতে প্রায়ই স্বাধীনতার কথা আসে। কিন্তু সেই স্বাধীনতা শুধু রাষ্ট্রীয় স্বাধীনতা না, মানসিক স্বাধীনতাও। তিনি বলেছিলেন—‘ইমানসিপেট ইওরসেলভস ফ্রম মেন্টাল স্ল্যাভেরি’ (মানসিক দাসত্ব থেকে নিজেদের মুক্ত করো)।

তৃতীয় বিশ্বের বহু মানুষ রাজনৈতিকভাবে স্বাধীন হলেও মানসিকভাবে এখনো ভয়, হীনমন্যতা আর ঔপনিবেশিক মানসিকতার ভেতরে আটকে আছে। বব মার্লে সেই শিকল ভাঙতে বলেছিলেন। এই একটি লাইন হয়তো এত জনপ্রিয় হওয়ার কারণও এটাই।

তার গান শুনলে মনে হয়, তিনি শুধু বিনোদন দিতে আসেননি, চেয়েছিলেন মানুষকে জাগাতে। তবে, তার সংগীতে শুধু প্রতিবাদই ছিল না, ছিল কোমলতাও।

Bob Marley
ছবি: সংগৃহীত

তার গান শুনলে মনে হয়, যুদ্ধবিধ্বস্ত পৃথিবীতেও মানুষ এখনো কাউকে ভালোবাসে। বন্ধুকে মনে রাখে। মায়ের রান্নার কথা মনে পড়ে। পুরোনো উঠোন মনে পড়ে। এই নস্টালজিয়াও তৃতীয় বিশ্বের মানুষদের কাছে খুব বাস্তব।

কারণ এখানে মানুষ হারিয়ে ফেলে তার শৈশব। কখনো অর্থনৈতিক চাপে। কখনো রাজনৈতিক অস্থিরতায়। কখনো অভিবাসনে। তাই বব মার্লের গান শুধু বিদ্রোহের না। এটা হারিয়ে যাওয়া ঘরেরও গান।

আজকের পৃথিবীতে এসে তার প্রাসঙ্গিকতা হয়তো আরও বেড়েছে। কারণ বর্তমান সময়ের তরুণদের মাঝেও এক ধরনের গভীর ক্লান্তি কাজ করছে। সোশ্যাল মিডিয়া আছে। প্রযুক্তি আছে। কিন্তু ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তাও আছে।

অনেকে এমন বোধ করে যে, পৃথিবী ধীরে ধীরে আরও বৈষম্যময় হয়ে উঠছে। ধনীরা আরও ধনী হচ্ছে। যুদ্ধ বাড়ছে। মানুষ মানসিকভাবে একা হয়ে যাচ্ছে। এই বাস্তবতায় বব মার্লের গান আবার ফিরে আসে।

বিশেষ করে রাতে। যখন কেউ নিজের ঘরে একা বসে থাকে। যখন মনে হয় জীবন খুব কঠিন। যখন মনে হয় পৃথিবী তাকে বুঝছে না। তখন দূর কোনো ক্যারিবিয়ান দ্বীপ থেকে ভেসে আসে এক জাদুকরী কণ্ঠ—‘এভরি লিটল থিং গনা বি অলরাইট’। হয়তো সত্যিই সব ঠিক হয়ে যায় না। তবু মানুষ একটু সাহস পায়। এটাই বড় কথা।

বব মার্লে মারা গেছেন ১৯৮১ সালের ১১ মে। বয়স হয়েছিল মাত্র ৩৬ বছর। স্বল্প আয়ুর জীবন। কিন্তু কিছু মানুষ খুব কম সময় বেঁচেও ইতিহাসের গভীরে ঢুকে যান। তিনি তাদের একজন।

আজও পৃথিবীর অসংখ্য তরুণ তার ছবি প্রিন্ট করা টি-শার্ট পরে। দেয়ালে তার পোস্টার টাঙায়। গিটার হাতে তার গান গায়।

অনেকে হয়তো তার জীবনের সব ইতিহাস জানে না। তবু তারা অনুভব করে, এই মানুষটার কণ্ঠে তাদের নিজের জীবনের প্রতিধ্বনি আছে। কারণ তৃতীয় বিশ্বের তরুণদের জীবন এখনো পুরো বদলায়নি।

এখনো বেকারত্ব আছে। আছে অসমতা, রাষ্ট্রীয় সহিংসতা। এখনো স্বপ্নভঙ্গের বেদনা আছে, একইসঙ্গে আছে গানও।

আর সেই গানগুলোর মাঝখানে এখনো দাঁড়িয়ে আছেন একজন মানুষ। ড্রেডলক চুল। ক্লান্ত অথচ উজ্জ্বল চোখ। হাতে গিটার। তিনি যেন পৃথিবীর সব প্রান্তিক তরুণকে বলছেন—তোমার কষ্টেরও ভাষা আছে। তোমার স্বপ্নও গুরুত্বপূর্ণ। আর তুমি এখনো পুরোপুরি পরাজিত হওনি।