ঢাকায় পোষা প্রাণী যত্নের সেকাল-একাল

আরবিআর

দিন দিন মানুষ প্রাণীদের অধিকার নিয়ে আরও সচেতন হয়ে উঠছে। এর ফলেই এখন পোষা প্রাণীর সংখ্যা বাড়ছে। পাশাপাশি রাস্তায় থাকা অবহেলিত প্রাণীদের একটু  ভালোভাবে বাঁচতে সাহায্য করতে অনেক মানুষ নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছেন।

আজ থেকে চৌদ্দ বছর আগে, যখন আমরা প্রথম বু'কে (স্পিৎজ জাতের একটি কুকুর) পোষার জন্য বাড়িতে এনেছিলাম, তখন ঢাকায় প্রকৃত পশুচিকিৎসকের সংখ্যা ছিল খুবই কম। কিছু সহকারী ছিলেন, যারা বাস্তব অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে পশুচিকিৎসকের মতো কাজ করতেন। এমনকি অস্ত্রোপচার করার সাহসও দেখাতেন।

বু'র বার্ধক্যজনিত নানা সমস্যার সময় তার সার্বিক যত্ন নিতে গিয়ে আমি বুঝেছি, আগের তুলনায় এখন পোষা প্রাণীর চিকিৎসা ও সেবাকেন্দ্রগুলো অনেক বেশি উন্নত, আধুনিক এবং বিস্তৃত হয়েছে।

প্রানিকুল অ্যানিমাল ওয়েলনেস ক্লিনিকের পরিচালক ফারজানা আলম বলেন, 'ভালো মানের পশুচিকিৎসা ও জরুরি সেবার চাহিদা আগের চেয়ে অনেক বেড়েছে। এতে বোঝা যায়, আমাদের শহরে লোমশ প্রাণীগুলোর জন্য এখন আগের তুলনায় অনেক বেশি যত্ন, সহায়তা ও ভালোবাসার পরিবেশ তৈরি হয়েছে।'

রেজিস্টার্ড পশুচিকিৎসক (মেডিসিন ও সার্জারি) ডা. মীর নিশাত তাসনিম তানিয়া বলেন, 'এখন ঢাকার ভেতরে প্রায় ৫০টি শেল্টার এবং শতাধিক পশুচিকিৎসা কেন্দ্র রয়েছে। পোষা প্রাণীর সংখ্যা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে এসব সেবার চাহিদাও বাড়ছে। বর্তমানে এক্স-রে, আলট্রাসনোগ্রাফি, রক্ত পরীক্ষা, সিবিসি, বায়োকেমিক্যাল ও হরমোনাল টেস্টসহ নানা ধরনের আধুনিক ডায়াগনস্টিক সুবিধাও পাওয়া যাচ্ছে।'

তবে ডা. তানিয়ার মতে, এই খাতে উন্নয়নের জন্য এখনও অনেক কাজ বাকি রয়েছে।

তিনি বলেন, 'পশুচিকিৎসার অবকাঠামো এবং তথ্যভিত্তিক সেবাগুলো এখনো মূলত গবাদিপশু কেন্দ্রিক। পোষা প্রাণী বা রাস্তায় থাকা অবহেলিত প্রাণীদের জন্য নতুন সংযোজন খুব বেশি হয়নি। এ ছাড়া সঠিক প্রশিক্ষণের অভাব, সমাজে সচেতনতার ঘাটতি, গবেষণার অপর্যাপ্ত সুযোগ এবং অযোগ্য হাতুড়ে চিকিৎসকদের উপস্থিতি এই পেশাকে পিছিয়ে দিয়ে পশুসেবার ক্ষেত্রে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে।'

সিনিয়র ভেটেরিনারিয়ান ও প্রাণী চিকিৎসক (মেডিসিন ও সার্জারি) ডা. নুসরাত জাহান বলেন, পশুচিকিৎসা নিঃসন্দেহে একটি অসাধারণ পেশা। তবে জটিল রোগের চিকিৎসায় অনেক সময় সমস্যায় পড়তে হয়–কারণ এসব রোগের জন্য প্রয়োজনীয় বিশেষ কিছু ওষুধ এখনো কোনো ফার্মাসিউটিক্যাল কোম্পানি উৎপাদন করছে না।

dhaka1.jpg
ছবি: সংগৃহীত

আশা করা যায়, অদূর ভবিষ্যতে এই সমস্যারও সমাধান হবে।

আমার ঘরে একটি বয়স্ক কুকুর থাকার কারণে পোষা প্রাণীর সেবাকেন্দ্রগুলোর উন্নয়ন এবং দক্ষ ও রেজিস্টার্ড পশুচিকিৎসকের সংখ্যা বাড়ায় আমি গভীরভাবে কৃতজ্ঞ। 

অসুস্থ প্রাণীদের সুস্থ করে তুলতে তারা যে ধৈর্য ও যত্ন নিয়ে কাজ করেন, তা ভাষায় প্রকাশ করা কঠিন। তারা নিরলসভাবে এমন প্রাণীদের সেবা দেন, যারা নিজের কষ্টের কথা মুখে বলতে পারে না।

শুরুর দিকে কুকুর–বিড়ালের প্রতি আমার এক ধরনের ভয় ছিল। কিন্তু গত চৌদ্দ বছর ধরে এই লোমশ প্রাণীটার সঙ্গে থাকতে থাকতে আমি একটি বিষয় স্পষ্টভাবে বুঝেছি—পোষা প্রাণীর দায়িত্ব মানে আজীবনের অঙ্গীকার। 

আপনি যদি সত্যিকারের অভিভাবকের ভূমিকা নিতে না পারেন, তাহলে আপাতত প্রাণী পোষার সিদ্ধান্ত থেকে বিরত থাকাই ভালো।

অসুস্থ হলে চিকিৎসা না করানো, অপুষ্টিতে রাখা, বাথরুম বা নোংরা জায়গায় আটকে রাখা কিংবা অমানবিক আচরণ—এ ধরনের মানসিকতা নিয়ে কখনোই কোনো প্রাণী পোষা উচিত নয়।

আপনি যদি সত্যিই একটি বিড়াল বা কুকুরকে পোষ্য হিসেবে নিতে চান, তবে তাকে পরিবারের একজন সদস্যের মতো যত্ন ও ভালোবাসা দিন।

সবশেষে বলা যায়, বর্তমানে পোষা প্রাণীর যত্ন ও লালন-পালনে সহায়তা করার জন্য পেশাগতভাবে দক্ষ অনেক মানুষই আমাদের চারপাশে রয়েছেন।

অনুবাদ করেছেন শবনম জাবীন চৌধুরী