নিজের ইমেজ তৈরি করতে গিয়ে নিজেকেই হারিয়ে ফেলছেন না তো?

মাহমুদ নেওয়াজ জয়
মাহমুদ নেওয়াজ জয়

একটা সময় মানুষ নিজেকে দেখত শুধু আয়নায়। এখন দেখে স্ক্রিনেও—প্রোফাইল ছবিতে, স্ট্যাটাসে, অন্যের চোখে। কে কীভাবে দেখছে—এই প্রশ্নটা নীরবে জীবনের একটা বড় অংশ দখল করে নিচ্ছে। আমরা কেমন মানুষ, এর চেয়ে কেমন দেখায়—এটাই যেন এখন বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে।

ইমেজ তৈরি করা নতুন কিছু নয়। মানুষ সবসময়ই একটা সামাজিক পরিচয় গড়তে চেয়েছে—কেউ নিজেকে বিনয়ী দেখাতে, কেউ বুদ্ধিদীপ্ত বা সফল হিসেবে।

কিন্তু আজকের দিনে এসে পার্থক্য হলো, এই কাজটা এখন অবিরাম। বিরতি নেই, ছুটি নেই। জীবনটাই যেন একটা প্রদর্শনী হয়ে উঠছে।

সমস্যা শুরু হয় তখন, যখন ইমেজটা ধীরে ধীরে মানুষটার চেয়ে বড় হয়ে যায়।

আমরা কি মানুষ, নাকি নিজের বানানো চরিত্র? অনেকেই খেয়াল করেন না, একসময় তারা নিজের স্বাভাবিক সত্তার বদলে একটা নির্মিত চরিত্র হয়ে উঠছেন। বাইরে যা দেখান, ভেতরে আর সেটা থাকেন না—হাসিমুখের ছবির আড়ালে মন খারাপ থেকে যায়, আত্মবিশ্বাসী কথার নিচে চাপা পড়ে থাকে অনিশ্চয়তা। ‘আমি ভালো আছি’র ইমেজটা টিকে থাকে, ক্লান্তিটা টিকে থাকে না।

এই ফাঁকটা ছোট থাকলে সমস্যা নেই। কিন্তু যখন ব্যবধান বড় হয়, তখন মানুষ নিজের সঙ্গেই অচেনা হয়ে যেতে শুরু করে।

ধরুন আপনি এমন একটা ইমেজ তৈরি করলেন যেখানে আপনি সব জানেন, দুর্বল হন না। তখন কী হয়? ভুল স্বীকার করা কঠিন হয়ে পড়ে, সাহায্য চাওয়াটাও। কষ্টের কথা বলাও প্রায় অসম্ভব হয়ে যায়—কারণ সেটা বানানো ইমেজের সঙ্গে যায় না। তখন ইমেজ আপনাকে চালায়। আপনি ইমেজকে না।

‘দেখানোর’ ক্লান্তি

সবসময় একটা নির্দিষ্টভাবে নিজেকে উপস্থাপন করার মধ্যে একটা মানসিক শ্রম আছে। সেটি চোখে পড়ে না, কিন্তু খুব বাস্তব।

সবসময় চিন্তা—আমি কি যথেষ্ট স্মার্ট দেখাচ্ছি? মানুষ আমাকে কী ভাবছে? আমি কি পিছিয়ে পড়ছি?

এই অদৃশ্য চাপ মানুষকে ক্লান্ত করে। মজার ব্যাপার হলো, এই ক্লান্তি অনেক সময় মানুষ ধরতেই পারে না। বরং সে ভাবে, ‘কেন যেন সবকিছু ভারী ভারী লাগছে।’ অথচ তার এই চাপের একটা অংশ আসে নিজেকে ধরে রাখার এই অভিনয় থেকে। যে মানুষ সবসময় প্রভাবিত করতে ব্যস্ত, সে অনেক সময় গভীরভাবে বাঁচতে ভুলে যায়।

তুলনা আর প্রতিযোগিতার অদৃশ্য মঞ্চ

ইমেজ তৈরির সঙ্গে তুলনা প্রায় অবিচ্ছেদ্য। কারণ ইমেজ কখনো একা তৈরি হয় না, অন্যের সঙ্গে তুলনা করেই তা দাঁড়ায়।

ওর জীবন এত গোছানো, ওর কাজ এত ভালো। ও এত পড়ুয়া, এত সচেতন—সম্পর্কটাও নিখুঁত মনে হয় দূর থেকে।

এসব দেখে অনেকেই নিজের জীবনকে অসম্পূর্ণ ভাবতে শুরু করেন। তারপর শুরু হয় নিজের ইমেজ মেরামত। বাস্তব জীবন নয়, বাহ্যিক ছবি পলিশ করা।

কিন্তু পলিশ করা ছবির একটা সমস্যা আছে—ওটা ছুঁয়ে দেখা যায় না। যে মানুষ প্রতিদিন নিজের ইমেজ নিয়ে ব্যস্ত, সে অনেক সময় নিজের সত্যিকারের চাহিদা শুনতে পায় না। সে কি সত্যিই এই জীবন, এই পেশা চায়—নাকি এগুলো শুধু ভালো দেখায় বলে ধরে রেখেছে? এই প্রশ্নগুলো জরুরি।

পারফেক্ট হওয়ার চাপে ভঙ্গুর

নিজেকে নিখুঁত দেখানোর প্রবণতা খুব সূক্ষ্মভাবে মানুষকে কঠোর করে দেয়। ভুল করা যাবে না, দুর্বলতা দেখানো যাবে না—সবসময় থাকতে হবে নিয়ন্ত্রণে।

কিন্তু মানুষ তো অসম্পূর্ণ, দ্বিধায় পড়ে, ভাঙে। যেখানে অসম্পূর্ণ হওয়ার জায়গা নেই, সেখানে স্বস্তি থাকে না।

অনেকেই এমন একটা ইমেজ ধরে রাখেন, যা ভাঙার ভয়েই তারা সারাক্ষণ তটস্থ। কেউ যদি সমালোচনা করে? কেউ যদি ‘আসল’ আমাকে দেখে ফেলে? এই ভয় মানুষকে আত্মরক্ষামূলক করে তোলে। সহজ সম্পর্কও তখন কঠিন হয়ে যায়, কারণ আন্তরিকতা শুরুই হয় মুখোশ কিছুটা নামালে।

ইমেজের জন্য কি আমরা নিজেদের রুচিও হারাচ্ছি?

আরেকটা সূক্ষ্ম ক্ষতি হয়—নিজস্বতা ক্ষয়ে যায়। যা জনপ্রিয়, সেটাই ভালো মনে হয়; যা সবাই প্রশংসা করছে, সেটাকেই নিজের পছন্দ বলে চালিয়ে দিই।

ধীরে ধীরে প্রশ্নটা বদলে যায়—‘আমি কী পছন্দ করি?’ থেকে ‘লোকজন কী পছন্দ করে?’ এখানেই নিজের সঙ্গে বিচ্ছেদ শুরু।

আপনার হয়তো নির্জন দুপুর ভালো লাগে, কিন্তু নিজেকে দেখাতে চান ব্যস্ত-উজ্জ্বল মানুষ হিসেবে। গভীর ভাবের কোনো বই ভালো লাগলেও, শুধু আলোচিত বইয়ের কথাই বলেন—কারণ সাদামাটা জীবনের শান্তির চেয়ে নাটকীয় জীবনের গল্পটাই বেশি বিক্রি হয় লোকের কাছে।

এভাবে একসময় মানুষ নিজের রুচি, তাল, স্বর—সব হারিয়ে ফেলতে পারে। অথচ মানুষ আপনাকে ইমেজের জন্য নয়, আপনার সত্য স্বভাবের জন্য মনে রাখে।

একটু ভেবে দেখুন, যাদের আপনি সত্যি শ্রদ্ধা করেন, তাদের কি নিখুঁত ইমেজের জন্য করেন? না। বরং তাদের সত্যতার জন্য।

ভান না করা মানুষ এক ধরনের স্বস্তির মধ্যে থাকতে পারে। যে জানে সে সব জানে না, তার মধ্যেই গভীরতা বেশি। শেষ পর্যন্ত মানুষ কৃত্রিম মসৃণতার চেয়ে আন্তরিকতার দিকেই ঝোঁকে।

তাহলে কি ইমেজ দরকার নেই?

অবশ্যই ইমেজ তৈরির দরকার আছে। সামাজিক পরিচয় থাকবে, পেশাগত উপস্থাপনও থাকবে—নিজেকে গুছিয়ে তুলে ধরাটা জরুরি। কিন্তু ইমেজ যেন আপনার প্রকাশ হয়, বিকল্প সত্তা নয়।

চিকিৎসকের একটা পেশাগত ইমেজ থাকবেই, বিশ্লেষকের থাকবে বৌদ্ধিক পরিচয়। সমস্যা সেখানে না, সমস্যা তখন যখন সেই নির্মিত পরিচয় রক্ষা করাটাই জীবনের কেন্দ্রে চলে আসে।

নিজেকে হারাচ্ছেন কি না, কিছু লক্ষণ

কিছু প্রশ্ন নিজের কাছে রাখা যায়।

* সবসময় কি মনে হয়, অন্যরা কী ভাবছে সেটাই বেশি গুরুত্বপূর্ণ?

* নিজের আসল অনুভূতি কি অনেক সময় লুকাতে হয়?

* ক্লান্ত থাকলেও কি সবসময় ‘ভালো’ দেখাতে হয়?

* যা ভালো লাগে না, তাও কি শুধু মানানসই দেখানোর জন্য ধরে রেখেছেন?

* সমালোচনা শুনলে কি মনে হয়, আপনার পুরো পরিচয় ভেঙে গেল?

যদি এসবের উত্তর বারবার ‘হ্যাঁ’ হয়, তাহলে হয়তো একটু থামার সময় এসেছে। কারণ হয়তো আপনি জীবনে বাঁচার চেয়ে জীবন ম্যানেজ করতেই বেশি শক্তি খরচ করছেন।

ফিরে আসা সম্ভব

নিজের কাছে ফেরত আসা অসম্ভব না। শুরু হতে পারে খুব ছোটভাবে:

* সবসময় ইমপ্রেস করার চেষ্টা না করে কানেক্ট করার চেষ্টা করা।

* সব জানি না—এটা বলতে শেখা।

* যা ভালো লাগে, সেটাকে নিঃশব্দে গুরুত্ব দেওয়া।

* কখনো কখনো এমন জায়গায় থাকা, যেখানে কোনো প্রদর্শনের দরকার নেই।

* নিজের সঙ্গে একা সময় কাটানো।

* আর সবচেয়ে জরুরি, নিজের জীবনকে অন্যের চোখে নয়, নিজের অনুভবে মাপা।

নিজের ইমেজ তৈরি করা দোষের নয়। কিন্তু বানাতে বানাতে যদি নিজের কণ্ঠস্বরটাই হারিয়ে যায়, রুচিটা হারিয়ে যায়—তাহলে দামটা বেশ বেশি হয়ে যায়।

অনেকেই বাইরে থেকে সুন্দর করে গড়া, ভেতরে ভেতরে নিজেদের সঙ্গেই আর যোগাযোগ নেই।

প্রশ্নটা তাই সহজ শোনালেও আসলে অতটা সহজ না—আপনি কি নিজেকে প্রকাশ করছেন, নাকি নিজের সঙ্গে অভিনয়? উত্তরটা হয়তো এখনই দিতে হবে না।