আমরা কি অজান্তেই সন্তানদের দেশবিমুখ করে তুলছি?
আমাদের চারপাশে দুটো ঘটনা খুব হরহামেশাই ঘটে। পারিবারিক আড্ডা কিংবা রাতের খাবারের টেবিলে বাংলাদেশ প্রসঙ্গ উঠলেই আমরা কোনো ভূমিকা ছাড়াই বলতে শুরু করি—এই দেশ বসবাসের জন্য কতটা অযোগ্য। পাশাপাশি অন্য দেশগুলো কতটা এগিয়ে গেছে, সে তুলনা টানতেও আমাদের কখনো কার্পণ্য থাকে না।
অন্যদিকে, এসব কথা শুনতে শুনতে আমাদের শিশুরা বড় হয়। একসময় তারা ‘উন্নত জীবনযাপনের’ আশায় ভিনদেশে পাড়ি জমানোর সিদ্ধান্ত নিলে, এই আমরাই আবার হুট করে বলে বসি—ওরা নাকি নিজেদের শেকড় ভুলে যাচ্ছে।
একটু থামুন। চোখ বন্ধ করে একবার শ্বাস নিন। আরও একবার ভেবে দেখুন।
একটি শিশু কোনো এক সকালে ঘুম থেকে উঠে হঠাৎ করেই দেশাত্মবোধ অনুভব করতে শেখে না। এই অনুভূতি সে ধীরে ধীরে শেখে আমাদের কাছ থেকেই। নিজেদের মতামত গড়ে তোলার অনেক আগেই শিশুরা চারপাশের প্রাপ্তবয়স্কদের কথা বলার ধরন, দৃষ্টিভঙ্গি ও বিশ্বাস আত্মস্থ করে নেয়। ফলে তারা যখন ছোটবেলা থেকেই বাংলাদেশ সম্পর্কে শুনতে থাকে—এই দেশ বিশৃঙ্খল, এখানে নিয়মকানুনের অভাব, কিংবা এদেশ নিয়ে আর কোনো ইতিবাচক আশা নেই—তখন এসব ধারণা তাদের বেড়ে ওঠার সঙ্গে সঙ্গে মনে গভীরভাবে বদ্ধমূল হয়ে যায়।
শুধু তাই নয়, তারা ক্রমেই বিশ্বাস করতে শেখে যে ‘সফলতা’ মানেই এদেশ ছেড়ে, নিজের শেকড় থেকে দূরে কোথাও পাড়ি জমানো।
তাহলে প্রশ্ন উঠে আসে—আমরা কীভাবে আমাদের সন্তানদের ছোটবেলা থেকেই নিজেদের দেশকে ভালোবাসতে শেখাতে পারি? সত্যি বলতে, এই প্রশ্নের উত্তর একমাত্রিক নয়; একে নানাভাবে ব্যাখ্যা করা যায়।
পাঠ্যবইয়ের পাতায় নয়, গল্পের ভেতর দিয়ে ইতিহাস হয়ে উঠুক প্রাণবন্ত
নিজ দেশের ইতিহাস জানার মধ্য দিয়েই দেশপ্রেমের সূচনা হয়। আর সেই ইতিহাস যখন বইয়ের নিরেট লাইন ছাড়িয়ে মানুষের গল্প হয়ে ওঠে, তখন শিশুরা তা আগ্রহ ও মনোযোগ নিয়ে শুনতে শেখে।
১৯৭১ সালের যুদ্ধের দীর্ঘ ব্যাখ্যা দেওয়ার বদলে বলুন সেই কিশোরীর কথা, যে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে গোপনে মুক্তিযোদ্ধাদের কাছে গ্রেনেড পৌঁছে দিত। বলুন সেই কিশোরের গল্প, যে সীমান্তের কাঁটাতার পেরিয়ে গোপন বার্তা বহন করত। শিশুদের সঙ্গে বসে মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক প্রামাণ্যচিত্র দেখুন। ইতিহাসকে সহজ ও সুন্দরভাবে তুলে ধরা বই তাদের হাতে তুলে দিন।
এই ছোট ছোট উদ্যোগই শিশুদের কাছে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসকে জীবন্ত করে তুলবে এবং তাদের মনে দেশের প্রতি শ্রদ্ধা ও ভালোবাসার বীজ বুনে দেবে।
দেশীয় সংস্কৃতিকে দৈনন্দিন জীবনের সঙ্গে মিশিয়ে নিন
দৈনন্দিন জীবনে চলার পথে যখন দেশীয় সংস্কৃতি জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে ওঠে, তখন শিশুরাও স্বাভাবিকভাবেই নিজেদের রীতিনীতি ও ঐতিহ্যের সঙ্গে পরিচিত হতে শেখে। এর জন্য আলাদা করে বড় কোনো আয়োজনের প্রয়োজন নেই। শুধু ধারাবাহিক ও আন্তরিক চেষ্টাই যথেষ্ট।
যাত্রাপথে গাড়িতে লোকসঙ্গীত চালান। শীতকালে পরিবারের সবাই মিলে পিঠা বানান। বৈশাখী মেলায় ঘুরে আসুন। ‘আমার বন্ধু রাশেদের’ মতো চলচ্চিত্র বা মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক শিশুদের জন্য নির্মিত প্রামাণ্যচিত্র একসঙ্গে দেখুন—এগুলো ইউটিউবে সহজেই পাওয়া যায়।
যখন দেশীয় সংস্কৃতি শিশুর কাছে আবেগপূর্ণ ও আনন্দময় হয়ে ওঠে, তখন তারা তা কেবল জানে না—অনুভব করতে শেখে। আর সেই অনুভব থেকেই জন্ম নেয় দেশের প্রতি গভীর ভালোবাসা।
দেশের শক্তি ও দুর্বলতা—দুটো সম্পর্কেই সন্তানদের সচেতন করুন
সবকিছু নিখুঁত, কোথাও কোনো ত্রুটি নেই—এমন ভান করার কোনো প্রয়োজন নেই। আজকের শিশুরা যথেষ্ট সচেতন এবং চারপাশের বাস্তবতা সম্পর্কে ভালোভাবেই অবগত। যানজট, দূষণ, বৈষম্য ও অসাম্য—এসব বিষয় তারা চোখে এড়াতে পারে না। এসব নিয়ে তাদের মনে যে প্রশ্নগুলো জাগে, সেগুলো এড়িয়ে গেলে বিষয়গুলো তাদের মনে আরও নেতিবাচকভাবে প্রভাব ফেলতে পারে।
তাই তাদের প্রশ্নের উত্তর দিন সততার সঙ্গে। বলুন—হ্যাঁ, এই দেশে অনেক সমস্যা আছে। তবে শুধু এই দেশেই নয়, বিশ্বের প্রতিটি দেশেই কোনো না কোনো সমস্যা রয়েছে। একই সঙ্গে এটাও বুঝিয়ে দিন যে মানুষ যখন হাল ছেড়ে না দিয়ে দায়িত্ব ও প্রতিশ্রুতি নিয়ে সামনে এগিয়ে যায়, তখনই পরিবর্তন সম্ভব হয়।
তাদেরকে বলুন যে দেশপ্রেম অন্ধভাবে গর্ব করার কোনো বিষয় নয় বরং দায়িত্ববোধের জায়গা থেকে আশা নিয়ে এগিয়ে যাওয়ার নামই দেশপ্রেম।
ছোট ছোট সমাজসেবামূলক কাজে শিশুদের উৎসাহিত করুন
দেশের একজন মানুষের পাশে দাঁড়ানো বা তাকে সাহায্য করার অনুভূতি অতি মূল্যবান। শীতকালে শিশুদের সঙ্গে নিয়ে অসহায় মানুষদের মাঝে শীতবস্ত্র বিতরণ করুন। তাদের কাছে মানুষ জীবিকার লড়াই এবং কষ্টের পরিস্থিতি দেখার সুযোগ দিন। হ্যাঁ, এটি সহজ হবে না। কিন্তু ঠিক সেই মুহূর্তে যখন একটি শিশু মানুষের কষ্ট উপলব্ধি করে এবং চোখে এক ফোঁটা জল ঝরে, তখনই অজান্তেই তাদের মনে দৃঢ় এক মানসিক শক্তি গড়ে ওঠে।
যে শিশুরা আনন্দের সাথে হাত বাড়িয়ে দিতে শেখে তাদের মনে স্বাভাবিকভাবেই দেশের প্রতি একটা আবেগের জায়গা তৈরি হয়।
সন্তানদের দেশের সান্নিধ্যে থাকতে উৎসাহিত করুন
বাংলাদেশে এমন অনেক পরিবার রয়েছে যাদের পরিকল্পনা অনেকটা এমন থাকে —উচ্চ মাধ্যমিক বা গ্রাজুয়েশন শেষ হওয়ার পর সন্তানকে উচ্চ শিক্ষার জন্য বিদেশে পাঠানো। স্পষ্টতই, তারা এটি তার সন্তানের কল্যাণ এবং উন্নত সুযোগ, নিরাপত্তা ও আন্তর্জাতিক মানের শিক্ষা লাভের আশায় করে।
বিদেশে গিয়ে শিক্ষালাভের জন্য অনুপ্রাণিত করানো কোনো ভুল নয়। বরং, এতে করে একজনের আত্মবিশ্বাস বেড়ে যায় এবং যেকোনো বিষয় নিয়ে বিশদ পরিসরে চিন্তাভাবনা করার এক অবিশ্বাস্য দৃষ্টিভঙ্গি তৈরি হয়। তবে বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই এই সিদ্ধান্তের যে পরবর্তী আরও একটি বার্তা বা দিক থাকে সেটি আমরা ভুলে যাই। সন্তানদের অবশ্যই এটাও ভালোভাবে বুঝিয়ে বলতে হবে যে শিক্ষাগ্রহণ শেষে তোমাকে দেশে ফিরে আসতে হবে।
উন্নত দেশের ইতিহাস দেখলেই বোঝা যায়—মেধাবী মানুষরা বিদেশে শিক্ষা অর্জন করার পর দেশে ফিরে এসে শিল্প, গবেষণা, দেশের সিস্টেম উন্নয়ন এবং সার্বিক অগ্রগতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছে। তারা দেশের উন্নয়নের চাকা এগিয়ে নিয়েছে।
আমরা যদি বাংলাদেশকে সামনের দিকে এগিয়ে নিয়ে যেতে চাই তাহলে আমাদের সন্তানদের সেভাবে করে বড় করে তুলতে হবে যাতে করে তাদের মনে এই বিশ্বাসের জায়গাটা তৈরি হয় যে পড়াশোনা শেষে এই দেশে ফিরে আসাটা যুক্তিযুক্ত বা এদেশে ফিরে এসে তার মেধা বিনিয়োগ করলে তা বিফলে যাবে না।
সন্তানকে গড়ে তুলুন দেশের ভবিষ্যৎ গড়ার আত্মবিশ্বাসী হিসেবে
বছরের একদিন পতাকা উত্তোলনের নাম দেশপ্রেম নয়। এটি একটি পরিচয়, একটি সত্তা। সন্তানদের ছোটবেলা থেকেই শেখাতে হবে যে তারা কেবল দেশের সমস্যা পর্যবেক্ষণকারী নয়, বরং ভবিষ্যৎ দেশ গড়ার মূল কারিগর।
যখন তারা ইতিহাস সম্পর্কে জানে, দেশের রীতিনীতিকে উপভোগ করতে শেখে, দেশ সম্পর্কে ঘরের মধ্যে ইতিবাচক ও নেতিবাচক দুধরনের আলোচনায় অংশ নেয়, আশেপাশের মানুষের বিপদে পাশে দাঁড়ায় এবং নিজেদের ভবিষ্যতের কাণ্ডারি হিসেবে বিশ্বাস করতে শেখে, তখন স্বাভাবিকভাবেই তাদের মনে দেশপ্রেম জাগে।
আমরা যদি বুক ফুলিয়ে গর্ব করার মতো একটি বাংলাদেশ গড়তে চাই তাহলে আমাদের উচিত এমন একটি প্রজন্ম গড়ে তোলা যারা এই বিশ্বাস নিয়ে বেড়ে উঠবে যে-হ্যাঁ আমরাই ভবিষ্যৎ দেশ গড়ার মূল কারিগর।
অনুবাদ করেছেন শবনম জাবীন চৌধুরী