শক্ত থাকার চাপে কি মানুষ একা হয়ে যাচ্ছে?
রাত তিনটা। খুব খারাপ লাগছে। কিন্তু কাউকে ফোন করার কথা মাথাতেও আসছে না। কারণ অনেক দিন ধরেই নিজেকে শেখানো হয়েছে—নিজের সমস্যা নিজেকেই সামলাতে হয়। কাউকে বিরক্ত করা ঠিক না। দুর্বল দেখানোও না।
এমন মানুষ আমাদের চারপাশে অনেক আছে। বাইরে থেকে তাদের খুব শক্ত মনে হয়। তারা একাই সব সামলান, খুব কম সাহায্য চান, নিজের কষ্ট নিয়ে খুব একটা কথা বলেন না। সবাই ভাবে, ‘ও তো সব সামলে ফেলতে পারে।’ কিন্তু অনেক সময় এই সবকিছু একা সামলানোর অভ্যাসের ভেতরে লুকিয়ে থাকে ক্লান্তি, ভয়, বা দীর্ঘদিনের মানসিক চাপ।
এই প্রবণতাকে ‘হাইপার-ইন্ডিপেনডেন্স’ বলা হয়।
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ‘স্বাধীন’ হওয়ার ধারণাটা খুব জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে। নিজের টাকা নিজে আয় করা, একা সব সামলানো, মানসিকভাবে কারও ওপর নির্ভর না করা—এসবকে অনেক সময় শক্তি হিসেবে দেখানো হয়। বিশেষ করে তরুণদের মধ্যে ‘আমার কাউকে দরকার নেই’ ধরনের মানসিকতা একধরনের ব্যক্তিত্ব হয়ে উঠছে।
সমস্যা হলো, স্বাধীন হওয়া আর সবকিছু একা সামলানোর অভ্যাস এক জিনিস না।
স্বাভাবিক স্বাধীনতা মানুষকে আত্মবিশ্বাসী করে। কিন্তু যখন কেউ অন্যদের ওপর ভরসা করাই বন্ধ করে দেন, তখন বিষয়টা অন্য জায়গায় চলে যায়। তারা মনে করতে শুরু করেন, সাহায্য চাওয়া মানেই দুর্বলতা। ফলে সম্পর্কের মধ্যেও দূরত্ব তৈরি হতে থাকে।
অনেক সময় এই অভ্যাস হঠাৎ তৈরি হয় না। ছোটবেলার অভিজ্ঞতা, বারবার হতাশ হওয়া, মানসিক সমর্থন না পাওয়া, বা সবসময় ‘নিজেকেই সামলাতে হবে’ শুনে বড় হওয়া এসব থেকেও এটি তৈরি হতে পারে। কেউ কেউ ছোটবেলা থেকেই শিখে যান, নিজের দুর্বলতা দেখানো নিরাপদ না।
বাংলাদেশের সমাজেও ‘শক্ত’ থাকার ওপর অনেক চাপ আছে। ছেলেদের ক্ষেত্রে ‘কাঁদা যাবে না’, ‘দুর্বল হওয়া যাবে না’—এসব কথা এখনো খুব সাধারণ। আবার অনেক মেয়েকেও ছোটবেলা থেকেই শেখানো হয়, নিজের কষ্ট চুপচাপ সহ্য করতে হয়, বেশি আবেগ দেখানো ঠিক না, আর শেষ পর্যন্ত নিজের সমস্যাগুলো নিজেকেই সামলাতে হয়। ফলে অনেকেই নিজের অনুভূতিগুলো ভেতরে ভেতরে চেপে রাখতে শিখে যান।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এই বিষয়টাকে আরও জটিল করে তুলেছে। এখন এমন জীবনধারাকে খুব আকর্ষণীয়ভাবে দেখানো হয়, যেখানে মানুষ সবকিছু একাই করছে। একাই ভ্রমণ করছে, একাই সমস্যার মোকাবিলা করছে, একাই সফল হচ্ছে। অবশ্যই স্বাধীনতা গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু যখন মানুষ নিজের কষ্ট, ভয় বা মানসিক প্রয়োজনগুলো পুরোপুরি লুকাতে শুরু করে, তখন সেটি অস্বাস্থ্যকর হয়ে যেতে পারে।
সবকিছু একা সামলানোর সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো, এটি মানুষকে একা করে দেয়। বাইরে থেকে সবকিছু সামলে নেওয়া মানুষদেরও খুব একা লাগতে পারে। তারা সাহায্য চাইতে চাইলেও বলতে পারেন না, ক্লান্ত হলেও কাউকে জানান না।
সম্পর্কের ক্ষেত্রেও এর প্রভাব পড়ে। যারা সবসময় নিজেকে শক্ত রাখার চেষ্টা করেন, তারা অনেক সময় বন্ধু, পরিবার বা কাছের মানুষদের খুব বেশি কাছে আসতে দিতে চান না। কেউ খোঁজ নিলে বলেন, ‘আমি ঠিক আছি।’ সাহায্য করতে চাইলে অস্বস্তি লাগে। সম্পর্কের ভেতরেও একধরনের অদৃশ্য দূরত্ব তৈরি হয়।
তবে এই জায়গা থেকে বের হওয়া অসম্ভব না। পরিবর্তনটা সাধারণত খুব ছোট জায়গা থেকেই শুরু হয়। সবকিছু একদিনে বদলে যায় না। হয়তো প্রথমে খুব ছোট কিছু দিয়ে শুরু করা যায়। যেমন: কোনো দিন খুব খারাপ লাগলে সেটি অন্তত একজন কাছের মানুষকে বলা। সবসময় ‘আমি ঠিক আছি’ বলার বদলে কখনো কখনো সত্যিটা বলাও গুরুত্বপূর্ণ।
অনেকেই সাহায্য চাইতে অস্বস্তি বোধ করেন। কারণ তাদের মনে হয় এতে অন্যরা বিরক্ত হবে। কিন্তু আমরা যাদের ভালোবাসি, তাদের কষ্টের কথা শুনতে কি সত্যিই বিরক্ত হই? বেশিরভাগ সময় না। বরং মানুষ সাধারণত তখনই আরও দূরে সরে যায়, যখন তারা অনুভব করে কেউ তাদের ভেতরের কষ্টটুকু দেখতে দিচ্ছে না।
নিজের সব অনুভূতি একা বহন করাকে শক্তি ভাবতে ভাবতে অনেক মানুষ ধীরে ধীরে ক্লান্ত হয়ে পড়েন। অথচ কাছের মানুষের ওপর ভরসা করা, সাহায্য চাওয়া বা দুর্বল মুহূর্তগুলো ভাগ করে নেওয়াও স্বাভাবিক মানবিক প্রয়োজন।
সবচেয়ে অদ্ভুত ব্যাপার হলো, যারা সবসময় অন্যদের বলেন ‘প্রয়োজনে বলো’, তারাই অনেক সময় নিজের প্রয়োজনের কথাটা কাউকে বলতে পারেন না।
দীর্ঘদিন সবকিছু একা সামলাতে সামলাতে অনেক মানুষ আসলে ভুলেই যান, কারও ওপর ভরসা করাও একধরনের স্বাভাবিক মানবিক প্রয়োজন। হয়তো সমস্যাটা একা থাকতে চাওয়ার না। সমস্যাটা হলো, এমন এক জায়গায় পৌঁছে যাওয়া, যেখানে মানুষ আর কাউকে প্রয়োজন মনে করতেও স্বস্তি পায় না। আর সেখান থেকেই একাকীত্বটা শুরু হয়।



