গরমে মেজাজ খিটখিটে হয় কেন?
প্রতিদিনের জীবনযাত্রায় যানজট, ভিড়, অতিরিক্ত কাজের চাপ, শ্রম এবং অনুপযুক্ত কাজের পরিবেশ বাড়ায় মানসিক অস্থিরতা। এর সঙ্গে যদি যুক্ত হয় গ্রীষ্মের প্রচণ্ড তাপমাত্রা, তাহলে মানুষের জীবন হয়ে ওঠে অসহনীয়। তাপমাত্রা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে কমে ধৈর্য ও সহনশীলতার মাত্রা, বাড়ে রাগ; মানুষের মেজাজ হয়ে ওঠে খিটখিটে।
কেন এমন হয়, এ সম্পর্কে জানিয়েছেন সরকারি কর্মচারী হাসপাতালের সহকারী অধ্যাপক (মেডিসিন) ডা. হাসান মোস্তফা রাশেদ।
গরমে কি মেজাজ খিটখিটে হয়ে যায়
ডা. হাসান মোস্তফা রাশেদ বলেন, তীব্র গরমে মানুষ যখন অতিষ্ঠ, তখন চারপাশের মানুষের আচরণগত কিছু পরিবর্তন লক্ষ্য করা যায়। অতি তুচ্ছ ঘটনা নিয়ে বাসার মানুষ বা বাইরে অফিস কলিগ, বাসচালক-হেলপারের সঙ্গে যাত্রী কিংবা রিকশাচালকের সঙ্গে বাকবিতণ্ডা এমনকি হাতাহাতি পর্যন্ত হরহামেশাই চোখে পড়ে।
এই মেজাজ হারানোর পেছনে বৈজ্ঞানিক কারণ রয়েছে। আফ্রিকা বা আরবের দেশগুলোতেও অনেক গরম পরে। কিন্তু তাদের মধ্যেও কি আচরণগত পরিবর্তন লক্ষ্য করা যায়? না, যায় না। কারণ আমাদের দেশে গরমের সঙ্গে সঙ্গে আর্দ্রতাও অনেক বেশি। ফলে গরমের প্রভাব এখানে অনেক বেশি অনুভূত হয়। প্রচণ্ড গরমের সঙ্গে অতিরিক্ত ঘাম তৈরি হয়। এছাড়াও গরমের সঙ্গে আছে তীব্র যানজট, শব্দদূষণ আর বায়ুদূষণ, যা মানুষের মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর মারাত্মক প্রভাব ফেলে। এই প্রতিকূল পরিবেশ মানসিক চাপকে কয়েক গুণ বাড়িয়ে দেয়।
অতিরিক্ত গরমে মানুষের মনোযোগ কমে যায়, অবসাদগ্রস্ততা দেখা দেয়, কর্মস্পৃহা বহুলাংশে কমে যায়, মেজাজ নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়।
কেন হয়
আমাদের শরীরে ‘থার্মোরেগুলেশন’ নামক একটা প্রক্রিয়া কাজ করে, যা আমাদের শরীরের তাপমাত্রাকে নিয়ন্ত্রণ করে। অতিরিক্ত গরমে শরীরের স্ট্রেস হরমোন ‘কর্টিসল’ বৃদ্ধি পায়। এছাড়াও মস্তিষ্কে ‘সেরোটোনিন’ হরমোনের ভারসাম্য বিঘ্নিত হয়। এই জটিল প্রক্রিয়ার ভারসাম্যহীনতার কারণে মানুষের শরীরের ওপর প্রচণ্ড চাপ তৈরি হয়। অতিরিক্ত ঘামের কারণে পানিশূন্যতা ও লবণের মাত্রার পরিবর্তন হয়, মূলত সোডিয়াম ও পটাসিয়ামের ভারসাম্য নষ্ট হয়। এতে হৃৎস্পন্দন বেড়ে যায় এবং শরীর দ্রুত ক্লান্ত হয়ে পড়ে। ফলে আমরা অল্পতেই খিটখিটে হয়ে পড়ি এবং ধৈর্য হারিয়ে ফেলি।
গরমে সবচেয়ে ঝুঁকিতে আছেন বয়স্ক, শিশু (বিশেষ করে যাদের বয়স ৫ বছরের কম) ও শারীরিকভাবে অসুস্থ মানুষেরা। যেমন: কিডনি, উচ্চ রক্তচাপ, হৃদরোগী যাদের নিয়ন্ত্রিত মাত্রায় পানি ও লবণ গ্রহণ করতে হয়, তাদের মধ্যে গরমের প্রভাব বেশি হওয়ার সম্ভাবনা থাকে।
এছাড়া যারা অতিরিক্ত গরম পরিবেশে বা প্রচণ্ড রোদে কাজ করেন, বিশেষত কৃষক, দিনমজুর শ্রমজীবী মানুষ, যেমন: রিকশাচালক, কুলি তাদের মধ্যে দাবদাহের প্রভাব বেশি পড়ে।
গরমে কী ধরনের লক্ষণ প্রকাশ পায়
অতিরিক্ত গরমের কারণে যখন মানুষের শরীরের তাপমাত্রা-নিয়ন্ত্রকগুলোর কার্যক্ষমতা কমে যায় বা ‘থার্মোরেগুলেশন’ প্রক্রিয়া অকার্যকর হয়ে পড়ে, তখন হিটস্ট্রোক হয়। সেই সময়ে শরীরে হঠাৎ ক্লান্তি, মাথাব্যথা, জ্বর দেখা দেয় এবং মানুষ জ্ঞান হারিয়ে ফেলতে পারে। এছাড়া মাংসপেশিতে খিঁচুনি, বমি বমি ভাব ও ঘুমের ব্যাঘাত ঘটে এবং শরীরে অবসাদ অনুভব হয়।
গরমের জন্য অল্পতেই বা কোনো কারণ ছাড়াই রেগে যাওয়া, বিরক্তি বোধ করা, কাজে মন না বসা, কথা বলতে ইচ্ছে না হওয়া, অস্থিরতা প্রকাশ পায়।
করণীয়
ডা. হাসান মোস্তফা রাশেদ বলেন, শরীরে যেন পানি ও লবণের ঘাটতি না হয়, সেজন্য গরমের সময় প্রচুর পরিমাণে পানি পান করা উচিত। সম্ভব হলে স্যালাইন, শরবত, ডাবের পানি বা ফলের রস খাওয়া উচিত। তবে এক্ষেত্রে খেয়াল রাখতে হবে রাস্তার পাশে অপরিচ্ছন্ন পরিবেশে নোংরা পানি বা শরবত পরিহার করতে হবে।
এ সময় যতটা সম্ভব শরীরকে ঠান্ডা রাখার চেষ্টা করতে হবে। ছায়াযুক্ত স্থানে অবস্থান করতে হবে, দিনের যে সময়ে সবচেয়ে বেশি গরম পড়ে, সে সময়ে বাইরে না যাওয়া ভালো। শরীর অতিরিক্ত গরম হয়ে গেলে ফ্যান বা শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত কক্ষে অবস্থান করতে হবে।



