যেভাবে অপরাধবোধকে সিনেমার ব্যাকরণ বানিয়েছিলেন হিচকক

মাহমুদ নেওয়াজ জয়
মাহমুদ নেওয়াজ জয়

লন্ডনের লেস্টার স্ট্রিটে একটি থানা ছিল। আলফ্রেড হিচককের বয়স তখন পাঁচ বছর। বাবা উইলিয়াম হিচকক তাকে একটি চিরকুট দিয়ে সেই থানায় পাঠিয়েছিলেন।

কনস্টেবল চিরকুটটি পড়ে কয়েক মিনিটের জন্য তাকে সেলে ঢুকিয়ে রেখেছিলেন। তারপর বলেছিলেন, দুষ্টুমি করলে এমনই হয়।

আলফ্রেড কী দুষ্টুমি করেছিলেন, তা তিনি নিজেও কখনো স্পষ্ট করে বলেননি। তবে কয়েক মিনিটের সেই সেল, লোহার শিক আর ভেজা গন্ধ যেন সারাজীবন তার সিনেমার প্রতিটি ফ্রেমে ফিরে এসেছে।

গল্পটি নিছক গল্প নয়। হিচকক নিজেই বিভিন্ন সাক্ষাৎকারে ঘটনাটি বারবার বলেছেন। এত বেশি বলেছেন, যেন এটাই তার সিনেমার জন্মকথা।

এখান থেকেই একটি প্রশ্ন ওঠে, যা সমালোচকেরা বহুবার তুলেছেন, কিন্তু পুরোপুরি মীমাংসা করতে পারেননি। হিচকক কি আসলে অপরাধের চেয়ে অপরাধবোধ নিয়েই বেশি আগ্রহী ছিলেন?

কিশোর বয়সে হিচকক সেন্ট ইগনেশিয়াস কলেজে পড়াশোনা করেন। প্রতিষ্ঠানটি ছিল জেসুইটদের পরিচালনায়। তিনি বেড়ে উঠেছিলেন একটি ব্রিটিশ ক্যাথলিক পরিবারে, যেখানে পাপ ও শাস্তি একে অপরের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত। জেসুইট শিক্ষায় একটি বিষয় খুব স্পষ্ট ছিল, পাপ করলে শাস্তি পেতে হবে, এই হিসাব সবসময় এত সরল নয়। পাপ না করেও মানুষ অপরাধবোধে ভুগতে পারে। কেবল চিন্তা আর ইচ্ছাই যথেষ্ট।

হিচকক পরে বলেছিলেন, ক্যাথলিক শিক্ষা তার ভেতরে এক ধরনের ভয়ের সংস্কৃতি গড়ে দিয়েছিল, যা থেকে তিনি কখনো পুরোপুরি মুক্ত হতে পারেননি।

এই ভয়ের সংস্কৃতি থেকেই তার সিনেমার সবচেয়ে পরিচিত একটি প্যাটার্ন তৈরি হয়। সেটি হলো ভুল মানুষের থিম। হিচকক নিজে একে বলতেন 'রং ম্যান'। রবার্ট ডোনাট 'দ্য থার্টি নাইন স্টেপসে' এমন একটি খুনের অভিযোগ থেকে পালিয়ে বেড়ান, যা তিনি করেননি। হেনরি ফন্ডা 'দ্য রং ম্যানে' একজন সাধারণ সংগীতশিল্পী, যাকে ভুল করে ডাকাতির অভিযোগে গ্রেপ্তার করা হয়। 'নর্থ বাই নর্থওয়েস্টে' কেরি গ্র্যান্ট একজন বিজ্ঞাপন কর্মকর্তা, যাকে গুপ্তচর মনে করে সারা দেশে ধাওয়া করা হয়। আর 'ভার্টিগোতে' জেমস স্টুয়ার্ট এমন একটি মৃত্যুর জন্য নিজেকেই অপরাধী মনে করেন, যা আসলে একটি ষড়যন্ত্রের ফল।

লক্ষণীয় বিষয় হলো, এই প্রতিটি চরিত্রই অন্তত আইনের চোখে নির্দোষ। কিন্তু হিচকক কখনো তাদেরকে দর্শকের কাছে পুরোপুরি নির্দোষ হিসেবে তুলে ধরেন না। প্রতিটি চরিত্রের ভেতরে থাকে একটি গোপন ফাটল। কোনো পুরনো ব্যর্থতা, দমিয়ে রাখা ইচ্ছা কিংবা নৈতিক দুর্বলতা তাদের নির্দোষ পরিচয়কে প্রশ্নের মুখে ফেলে।

আইন তাদের ছেড়ে দিলেও কোনো এক গভীরতর আদালত যেন তাদের বিচার করে চলেছে।

এখানেই অস্তিত্ববাদী দর্শনের সঙ্গে হিচককের যোগসূত্র খুঁজে পাওয়া যায়। কিয়ের্কেগার্ড যাকে বলেছিলেন 'আংস্ট', সেটি ঠিক ভয় নয়। ভয়ের একটি নির্দিষ্ট কারণ থাকে। যেমন বাঘ দেখে ভয় পাওয়া। কিন্তু আংস্টের কোনো নির্দিষ্ট উৎস নেই। এটি স্বাধীনতার মুখোমুখি দাঁড়ানোর অনুভূতি, সম্ভাবনার ভার।

হিচককের নায়কেরা ঠিক এই অবস্থার মধ্যেই থাকে। তারা জানে না কেন অপরাধী বোধ করছে। শুধু জানে, তারা অপরাধী বোধ করছে। আইনি অপরাধ আর অস্তিত্বগত অপরাধবোধের এই পার্থক্যই হিচককের আসল বিষয়। খুনের রহস্য নয়।

বিখ্যাত দার্শনিক জঁ পল সার্ত্র বলতেন, মানুষ নিজের স্বাধীনতা নিয়েই যন্ত্রণাগ্রস্ত। কারণ প্রতিটি ব্যক্তিগত পছন্দ তাকে দায়ী করে তোলে। এমনকি সেই পরিণতির জন্যও, যা সে চায়নি।

'স্ট্রেঞ্জার্স অন আ ট্রেনের' গাই হেইনস এমনই একটি চরিত্র। সে কখনো খুন করে না। কিন্তু ব্রুনো যখন প্রস্তাব দেয়, তারা দুজন দুজনের শত্রুকে খুন করবে, গাই হাসিমুখে কথাটি এড়িয়ে যায়। সে সরাসরি প্রত্যাখ্যানও করে না। এই না-বলার ব্যর্থতা, নীরব সম্মতির মতো সেই মুহূর্তটিই তাকে পুরো সিনেমা জুড়ে তাড়া করে বেড়ায়।

সে জানে, খুনি সে নয়। তবু এটাও জানে, সেই অপরাধের সম্মতিতে তারও একটি অংশ ছিল।

ক্যাথলিক ধর্মতত্ত্বে একে বলা যায় 'অকেশন অব সিন'। পাপের উপলক্ষ তৈরি করাও এক ধরনের পাপ, যদিও পাপটি নিজে করা হয়নি। হিচকক এই ধারণাকে প্রায় প্রতিটি চিত্রনাট্যে বুনে দিয়েছেন। হয়তো সবসময় সচেতনভাবে নয়। তার শৈশবের সেই সেলের স্মৃতিও এখানে বড় ভূমিকা রেখেছে বলে মনে করা হয়।

'সাইকো' এই থিমের চরম প্রকাশ। মেরিয়ন ক্রেন টাকা চুরি করে পালিয়ে যায়। পরে নরম্যান বেটসের মোটেলে গিয়ে ওঠে। দর্শকও তার সঙ্গে অপরাধবোধের মধ্যে ঢুকে পড়ে। চুরির অপরাধবোধ, যা পরে ঘটে যাওয়া ভয়াবহ ঘটনার তুলনায় খুবই সামান্য।

তারপর আসে সেই বিখ্যাত শাওয়ার দৃশ্য। মেরিয়ন মারা যায়। তার সঙ্গে যেন দর্শকের বহন করে চলা সেই ছোট নৈতিক দ্বন্দ্বটিও শেষ হয়ে যায়।

হিচকক এখানে এক ধরনের নিষ্ঠুর রসিকতা করেন। তিনি দেখান, শাস্তি সবসময় অপরাধের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হয় না। মেরিয়ন যা করেছিল, তার জন্য তার মৃত্যু প্রাপ্য ছিল না। তবু সে মারা যায়।

এটিকে ক্যামুর 'অ্যাবসার্ডিটির' সিনম্যাটিক রূপও বলা যায়। মহাবিশ্ব সবসময় ন্যায়বিচার করে না। শাস্তি আসে, কিন্তু তার সঙ্গে অপরাধের হিসাব মেলে না। 'সাইকো' দেখার পর দর্শকের মধ্যে যে শূন্যতা তৈরি হয়, সেটি এই উপলব্ধিরই প্রতিক্রিয়া। নৈতিক জগৎ যতটা সুশৃঙ্খল বলে মনে হয়, আসলে ততটা নয়।

হিচকক নিজে অবশ্য সচেতন অর্থে দার্শনিক ছিলেন না। অন্তত তিনি নিজেকে সেভাবে দেখতেন না। নিজেকে তিনি গল্প বলিয়ে ও বিনোদনদাতা হিসেবেই পরিচয় দিতেন। সাক্ষাৎকারে 'অস্তিত্ববাদ' শব্দটিও খুব কমই ব্যবহার করেছেন।

এখানেই তার প্রতিভার বড় জায়গা। তিনি দর্শনকে কখনো বক্তৃতায় পরিণত করেননি, সেটিকে উত্তেজনা বানিয়েছেন। প্রতিটি ধাওয়ার দৃশ্য, প্রতিটি সাসপেন্স আসলে একটি প্রশ্নের নাটকীয় রূপ।

আমি কি সত্যিই নির্দোষ, নাকি এখনো শুধু ধরা পড়িনি?

এই প্রশ্নটিকেই ফরাসি নবতরঙ্গের সমালোচকেরা প্রথম গুরুত্ব দিয়ে দেখেছিলেন। এরিক রোমার ও ক্লদ শাব্রল ১৯৫৭ সালে হিচককের ওপর একটি বই লেখেন। সেখানে তারা তার সিনেমাকে প্রায় ক্যাথলিক নৈতিক নাটক হিসেবে দেখেন।

'ট্রান্সফার অব গিল্ট' বা অপরাধবোধের হস্তান্তর ছিল তাদের মতে হিচককের অন্যতম কেন্দ্রীয় থিম। 'স্ট্রেঞ্জার্স অন আ ট্রেন' দুই চরিত্র যেন একে অপরের পাপ বহন করে। একজনের অপরাধ অন্যজনের কাঁধে চড়ে বসে। এর মধ্যে খ্রিস্টীয় প্রায়শ্চিত্তের একটি ধারণাও খুঁজে পাওয়া যায়। একজনের পাপ অন্যজন বহন করে নেয়।

হিচককের নায়িকারাও এই কাঠামোর বাইরে নন। 'রেবেকার' নামহীন নায়িকা একজন মৃত নারীর ছায়ায় বাস করেন। তিনি এমন এক অপরাধবোধে ভোগেন, যা তার নিজের নয়। সেটি আগের স্ত্রী রেবেকার এবং ম্যাক্সিমের অতীতের সঙ্গে জড়িত।

'মার্নি'তে টিপি হেড্রেনের চরিত্র শৈশবের একটি ট্রমাকে এত গভীরে চাপা দিয়ে রাখে যে সেটি তার প্রাপ্তবয়স্ক জীবনের প্রতিটি সম্পর্ককে বিষাক্ত করে তোলে। এখানে অপরাধবোধ আর শিকার হওয়ার মধ্যে সীমারেখা প্রায় মুছে যায়। একজন নারী নিজেই আক্রান্ত, অথচ নিজেকেই দোষী মনে করেন।

কেউ কেউ বলতে পারেন, এগুলো নিছক ফ্রয়েডীয় পাঠ। ক্যাথলিক ধর্মতত্ত্বের সঙ্গে এর সরাসরি সম্পর্ক নেই। কথাটি পুরোপুরি ভুল নয়। হিচকক নিজে সরাসরি ধর্মীয় সিনেমা বানাননি। 'আই কনফেস' অবশ্য এর ব্যতিক্রম। সেখানে মন্টগোমারি ক্লিফট একজন পাদ্রীর চরিত্রে অভিনয় করেন। কনফেশনের গোপনীয়তা রক্ষা করতে গিয়ে তিনিই খুনের সন্দেহভাজন হয়ে ওঠেন।

এই সিনেমাটি যেন হিচককের পুরো ফিল্মোগ্রাফি বোঝার একটি চাবিকাঠি। কনফেশনের নীরবতা, না বলা কথার ভার এবং নিরপরাধ হয়েও সন্দেহভাজন থাকার যন্ত্রণা, এই তিনটি উপাদান তার প্রায় প্রতিটি ছবিতেই কোনো না কোনোভাবে ফিরে আসে।

শেষ পর্যন্ত হিচককের সিনেমা দেখতে দেখতে যে অস্বস্তি তৈরি হয়, সেটি শুধু সাসপেন্সের কৌশল নয়। এর ভেতরে আছে আরও গভীর একটি স্বীকৃতি।

আমরা প্রত্যেকেই কোথাও না কোথাও সেই লেসেস্টার স্ট্রিটের কনস্টেবলের সামনে দাঁড়িয়ে আছি। এমন একটি অপরাধের জন্য জবাবদিহি করছি, যা আমরা করেছি কি না, সেটিই হয়তো নিশ্চিত নই।

হিচকক কখনো বলেননি সেই চিরকুটে কী লেখা ছিল। হয়তো তিনিও জানতেন না। পুরো ক্যারিয়ারজুড়ে তিনি সেই অজানা অপরাধের ছায়া তাড়া করে বেড়িয়েছেন ফ্রেমের পর ফ্রেমে।