রাত জাগানো বিশ্বকাপ শেষ, এখন ঘুমের রুটিন ঠিক করবেন যেভাবে

স্মৃতি মন্ডল
স্মৃতি মন্ডল

আর্জেন্টিনাকে হারিয়ে এবারের বিশ্বকাপ ফুটবল ২০২৬-এর শিরোপা জিতেছে স্পেন। বিশ্বকাপ ফুটবলের পর্দা নামার সঙ্গে সঙ্গেই যেন ছন্দপতন ঘটলো ফুটবলপ্রেমীদের এই কয়দিন ধরে চলে আসা অভ্যাসেও।

রাতে ফুটবল ম্যাচ হওয়ার কারণে ঘুমের নিয়মিত রুটিন থেকে বেরিয়ে আসা এবং পুনরায় ফেরত যাওয়ার বিষয়ে কথা বলেছেন সরকারি কর্মচারী হাসপাতালের সহকারী অধ্যাপক (মেডিসিন) ডা. হাসান মোস্তফা রাশেদ

বিশ্বকাপ ফুটবল ও তার প্রভাব

বিশ্বকাপ ফুটবল শুধু একটি খেলার উৎসবই নয়, বরং মানুষের আবেগ ও উন্মাদনার নাম হয়ে দাঁড়িয়েছে। প্রিয় দলকে কেন্দ্র করে পতাকা টানানো, জার্সি কেনা, অফিকে থেকে চায়ের আড্ডায় তর্ক-বিতর্কের ঝড়, শহড় থেকে গ্রাম সবখানেই ছড়িয়ে পড়ে ফুটবলপ্রেমীদের ভালোবাসার উন্মাদনা। আমাদের দেশের তরুণ-যুবকদের সঙ্গে সঙ্গে শিশু, বয়স্কদের মধ্যেও তৈরি হয়েছে উচ্ছ্বাস ও উদ্দীপনা। ঘর ও ঘরের বাইরে, বিশেষত বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে বড় স্ক্রিনে রাত জেগে খেলা দেখার প্রচলন শুরু হয়েছে। বিশ্বকাপ কেড়ে নিয়েছে রাতের ঘুম। বিশ্বকাপকে স্বাগত জানিয়ে ব্রাজিল, আর্জেন্টিনা, পর্তুগাল, স্পেন, ফ্রান্সসহ বিভিন্ন দলের সমর্থকদের একজোট হয়ে রাত জাগতে দেখা গেছে।

ডা. হাসান মোস্তফা রাশেদ বলেন, বিশ্বকাপ ফুটবল অনেক মানুষের ঘুমের ওপর উল্লেখযোগ্য প্রভাব ফেলেছে। কারণ আমাদের দেশে বিশ্বকাপের অনেক ম্যাচ স্থানীয় সময় অনুযায়ী গভীর রাত বা ভোরে অনুষ্ঠিত হয়েছে।

  • রাত জেগে ম্যাচ দেখার কারণে গড়ে প্রায় ২ থেকে ৩ ঘণ্টা পর্যন্ত কম ঘুম হয়েছে।

  • রাত জাগার এই প্রবণতার প্রভাব পড়ছে স্বাভাবিক জীবনে। গত দেড় মাসে দিনের বেলায় কর্মক্ষেত্রে বা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ক্লান্তি, অবসন্নতা আর মনোযোগের ঘাটতি অনেকটাই বেড়ে গিয়েছে। এমনকি ইনসমনিয়া বা নিদ্রাহীনতার শিকার হচ্ছেন বহু মানুষ।

  • রাত জাগার কারণে বিপুল সংখ্যাক মানুষ ক্লান্ত শরীরে অফিসে ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে হাজির হয়েছেন, যার প্রভাব পড়ছে দৈনন্দিন কাজ ও জীবনে। ফলে মানুষের মধ্যে অতিরিক্ত চা বা ক্যাফেইন গ্রহণের প্রবণতা বেড়েছে এবং গ্যাস্টিকের সমস্যা, মাথাব্যথা, বমির ভাবসহ উচ্চরক্তচাপের প্রবণতা দেখা যাচ্ছে।

  • এছাড়া প্রিয় দলের জয়-পরাজয়ও মানসিক স্বাস্থ্যকে মারাত্মকভাবে প্রভাবিত করছে। শুধু তাই নয়, কারো কারো হৃৎস্পন্দনও স্বাভাবিকের চেয়ে অনেক বেশি বৃদ্ধি পাচ্ছে।

  • ম্যাচের সময় স্ট্রেস হরমোন কর্টিসল নিঃসরণের হার সবচেয়ে বেড়ে যায়। ফলে ম্যাচ চলাকালীন শারীরিক প্রতিক্রিয়া সবচেয়ে তীব্র হয়।

  • এছাড়া দীর্ঘ সময় টিভির পর্দা বা মোবাইলের আলোর দিকে তাকিয়ে থাকায় চোখের শুষ্কতা ও জ্বালাপোড়ার মতো সমস্যা দেখা যাচ্ছে।

বিশ্বকাপের পর ঘুমের রুটিন ঠিক করতে যা করবেন

বিশ্বকাপের সময় রাত জেগে খেলা দেখার কারণে ঘুমের নিয়মিত রুটিন এলোমেলো হয়ে গিয়েছে। কিছু সহজ অভ্যাসে আবারও স্বাভাবিক জীবন ও ঘুমের রুটিন ঠিক করা সম্ভব। যেমন:

১. স্বাভাবিক নিয়মেই মূলত ঘুমের এই সমস্যা চলে যাবে। তবে প্রথম দিকে কিছু ইনসমনিয়া জাতীয় সমস্যা হতে পারে। এজন্য খুব বেশি ক্লান্ত লাগলে দুপুরের দিকে ২০ থেকে ৩০ মিনিটের ছোট ঘুম বা ন্যাপ শরীরকে পুনরায় সতেজ করতে সাহায্য করে।

২. চা-কফি বা ক্যাফেইন গ্রহণ কিংবা এনার্জি ড্রিংক সাময়িকভাবে বন্ধ করে দিতে হবে, যতদিন না ঘুমের শিডিউল আগের নিয়মে চলে আসে।

৩. প্রতিদিন একই সময়ে ঘুমাতে যাওয়া এবং ঘুম থেকে ওঠার অভ্যাস করতে হবে, এমনকি ছুটির দিনেও।

৪. ঘুমানোর আগে স্ক্রিনের ব্যবহার কমাতে হবে। বিছানায় যাওয়ার আগে মোবাইল, টেলিভিশন, ল্যাপটপসহ যেকোনো স্ক্রিন থেকে দূরে থাকুন। প্রয়োজনে বই পড়া, হালকা গান শোনা যেতে পারে।

৫. নিয়মিত ব্যায়াম ও হাঁটার অভ্যাস করতে হবে, যা ভালো ঘুমে সাহায্য করে।

৬. ঘুমের জন্য উপযোগী পরিবেশ তৈরি করতে হবে।

ডা. হাসান মোস্তফা রাশেদ বলেন, ঘুমের পাল্টে যাওয়া শিডিউল ঠিক করতে না পারলে বিভিন্ন সমস্যা হতে পারে। নিয়মিত কম ঘুমের ফলে উচ্চ রক্তচাপ, দুর্বলতা, অবসাদগ্রস্ততা, মনোযোগে ঘাটতি এবং দীর্ঘমেয়াদে হৃদরোগের মতো শারীরিক জটিলতা দেখা দিতে পারে। খুব বেশি অনিদ্রার সমস্যা হলে চিকিৎসকের শরণাপন্ন হয়ে অল্পমাত্রায় ঘুমের ওষুধ সেবন করা যেতে পারে।