স্তন ক্যানসার: যে পরিবর্তনগুলো অবহেলা করা উচিত নয়
প্রতি অক্টোবরেই গোলাপি হয়ে ওঠে পৃথিবী। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেখা যায় গোলাপি ফিতা; আর হাসপাতাল ও বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে হয় সচেতনতামূলক কর্মসূচি। স্তন ক্যানসার নিয়ে আলোচনা বাড়ে। অক্টোবর হয়ে ওঠে ‘পিঙ্ক অক্টোবর’—স্তন ক্যানসার সচেতনতার মাস।
কিন্তু সচেতনতার এই আয়োজন কি সত্যিই একজন নারীকে সময়মতো চিকিৎসকের কাছে নিয়ে যাচ্ছে?
একজন সার্জনের অভিজ্ঞতায় থেকে বলব, স্তন ক্যানসার নিয়ে সচেতনতার জায়গায় সবচেয়ে বড় প্রশ্নটি কখনো কখনো রোগ নয়, বরং চিকিৎসা নিতে দেরি করা।
চেম্বারে এমন দুই ধরনের গল্প প্রায়ই দেখা যায়। একজন নারী স্তনে ছোট্ট কোনো পরিবর্তন বুঝতে পেরে তারপর চিকিৎসকের কাছে আসেন। প্রয়োজনীয় পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর দ্রুত রোগ শনাক্ত হয় এবং শুরু হয় চিকিৎসা।
অন্যদিকে কেউ হয়তো মাসের পর মাস একটি চাকা নিয়ে অপেক্ষা করেন। ভাবেন, ‘ব্যথা তো নেই, নিশ্চয়ই কিছু নয়।’ কেউ পরিবারের কাছে বলতে সংকোচ বোধ করেন, কেউ আবার ক্যানসার ধরা পড়ার ভয়েই পরীক্ষা করাতে চান না।
অনেকে চিকিৎসকের কাছে না গিয়ে বিভিন্ন ওষুধ বা অপ্রয়োজনীয় চিকিৎসার ওপর নির্ভর করে মূল্যবান সময় হারান। ফলে চিকিৎসকের কাছে যখন পৌঁছান, তখন রোগটি আগের অবস্থায় থাকে না।
স্তনে চাকা মানেই ক্যানসার নয়
স্তনে চাকা নিয়ে সমাজে দুটি বিপরীত ধারণা আছে। কারও কাছে চাকা মানেই ক্যানসার, আবার কেউ মনে করেন ব্যথা না থাকলে চিন্তার কিছু নেই। দুটিই ভুল।
স্তনের অধিকাংশ সমস্যাই ক্যানসার নয়। বিভিন্ন কারণে স্তনে চাকা হতে পারে। তাই চাকা পাওয়া মানেই আতঙ্কিত হওয়ার কারণ নেই। তবে সেটি কী ধরনের চাকা, তা পরীক্ষা না করে নিশ্চিন্ত হওয়ারও সুযোগ নেই।
স্তন বা বগলে নতুন চাকা, স্তনের আকারে অস্বাভাবিক পরিবর্তন, চামড়ায় টান বা গর্তের মতো হয়ে যাওয়া, নতুন করে নিপল ভেতরের দিকে ঢুকে যাওয়া, নিপল দিয়ে রক্ত বা অস্বাভাবিক তরল বের হওয়া কিংবা স্তনের চামড়ায় অস্বাভাবিক পরিবর্তন—এসব লক্ষণ গুরুত্ব দিয়ে দেখা প্রয়োজন।
আর একটি বিষয় মনে রাখা জরুরি, স্তন ক্যানসারের প্রাথমিক পর্যায়ে ব্যথা নাও থাকতে পারে। তাই ‘ব্যথা নেই, সমস্যা নেই’ এমন ধারণা কখনো কখনো বিপজ্জনক হতে পারে।
নিজের শরীরকে জানা জরুরি
নিজের স্তনের স্বাভাবিক গঠন সম্পর্কে ধারণা থাকা প্রত্যেক নারীর জন্য গুরুত্বপূর্ণ। এর অর্থ প্রতিদিন আতঙ্কে থাকা নয়। বরং নিজের শরীরে কোনটি স্বাভাবিক, সেটি জানা। এতে নতুন কোনো পরিবর্তন হলে তা দ্রুত বোঝা সম্ভব।
তবে নিজের স্তন সম্পর্কে সচেতন থাকা চিকিৎসকের মূল্যায়ন বা প্রয়োজনীয় স্ক্রিনিংয়ের বিকল্প নয়। বয়স, পারিবারিক ইতিহাস ও ব্যক্তিগত ঝুঁকির ওপর নির্ভর করে কখন চিকিৎসকের পরীক্ষা, ম্যামোগ্রাফি বা অন্য কোনো পরীক্ষা প্রয়োজন, তা চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী নির্ধারণ করা উচিত।
ক্যানসারের ভয়েও দেরিতে চিকিৎসা
আমাদের সমাজে ‘ক্যানসার’ শব্দটি এখনো অনেকের কাছে মৃত্যুদণ্ডের মতো মনে হয়। এই ভয় থেকেই কেউ পরীক্ষা করাতে চান না। কেউ ভাবেন, ‘না জানাই ভালো।’ কেউ আবার স্তন হারানোর আশঙ্কায় চিকিৎসায় পিছিয়ে পড়েন।
কিন্তু রোগ সম্পর্কে না জানলে রোগটি থেমে থাকে না। সময়মতো রোগ শনাক্ত হলে চিকিৎসার সুযোগও বেশি থাকে। স্তন ক্যানসারের চিকিৎসায় এখন রোগের ধরন, পর্যায় ও অন্যান্য বৈশিষ্ট্য অনুযায়ী বিভিন্ন পদ্ধতি ব্যবহার করা হয়। এর মধ্যে রয়েছে সার্জারি, কেমোথেরাপি, রেডিওথেরাপি, হরমোনাল থেরাপি ও টার্গেটেড থেরাপি।
মনে রাখা জরুরি, স্তন ক্যানসারের অপারেশন মানেই সব ক্ষেত্রে পুরো স্তন অপসারণ নয়। উপযুক্ত রোগীর ক্ষেত্রে স্তন সংরক্ষণ করেও চিকিৎসা করা সম্ভব। আবার কারও ক্ষেত্রে পুরো স্তন অপসারণই নিরাপদ ও যথাযথ সিদ্ধান্ত হতে পারে। অর্থাৎ একই রোগ হলেও প্রত্যেক নারীর চিকিৎসা পদ্ধতি এক নয়।
নিজের চিকিৎসাকে গুরুত্ব দেওয়া
নারীরা অনেক সময় নিজের অসুস্থতাকে অন্য সবকিছুর পরে রাখেন। সন্তানের পড়ালেখা, সংসারের দায়িত্ব, স্বামীর কাজ, অফিস—সবকিছু শেষ করে তারপর নিজের চিকিৎসা। কখনো নিজের জন্য চিকিৎসকের কাছে যাওয়াকেও তারা প্রয়োজনীয় মনে করেন না।
কিন্তু একজন নারীর স্বাস্থ্য কেবল তার নিজের বিষয় নয়। তিনি একটি পরিবারের মা, স্ত্রী, কন্যা কিংবা কর্মজীবী মানুষ—সর্বোপরি একজন স্বতন্ত্র মানুষ।
তাই শরীরে কোনো অস্বাভাবিক পরিবর্তন দেখা দিলে পরিবারেরও উচিত তাকে চিকিৎসকের কাছে যেতে উৎসাহিত করা। এটা করতে হবে পাশে দাঁড়িয়ে, কোনোভাবে ভয় দেখিয়ে নয়, লজ্জা বা দোষারোপ করে নয়।
পিঙ্ক রিবনের বাইরে যেতে হবে
প্রতি অক্টোবর আমরা গোলাপি ফিতা পরব, ছবি তুলব, সেমিনার করব—এসব সচেতনতা তৈরিতে ভূমিকা রাখে। কিন্তু পিঙ্ক অক্টোবরের সার্থকতা তখনই, যখন একজন নারী স্তনে কোনো পরিবর্তন অনুভব করার পর মাসের পর মাস অপেক্ষা করবেন না।
যখন একজন মা বলবেন, ‘আমার স্তনে কিছু একটা পরিবর্তন হয়েছে, আমি চিকিৎসকের কাছে যাব’, আর পরিবার বলবে, ‘চলো, আজই যাই।’
যখন ক্যানসারের ভয়ে পরীক্ষা এড়িয়ে না গিয়ে মানুষ বুঝবে, আগে জানা মানে চিকিৎসার সুযোগও আগে পাওয়া।
আরও মনে রাখতে হবে স্তনে চাকা মানেই ক্যানসার নয়। আবার এটিকে অবহেলা করার মতো বিষয়ও নয়।
অক্টোবর শেষ হবে। শহরের গোলাপি আলোকসজ্জা নিভে যাবে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অন্য বিষয় জায়গা করে নেবে। কিন্তু স্তন ক্যানসার সম্পর্কে সচেতন থাকার প্রয়োজন শেষ হবে না।
পিঙ্ক অক্টোবরের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বার্তাটি তাই খুব সহজ, নিজেকে জানুন। কোনো পরিবর্তনকে অবহেলা করবেন না। ভয়ের কারণে সময় নষ্ট করবেন না। কারণ স্তন ক্যানসার মোকাবিলার শক্তিশালী উপায়গুলোর একটি হলো সময়মতো রোগ শনাক্ত করা এবং সঠিক চিকিৎসা।
আর অনেক সময় একটি নারীর গল্প বদলে দেওয়ার শুরুটা হয় খুব ছোট একটি সিদ্ধান্ত দিয়ে, ‘আর অপেক্ষা নয়, আমি আজই চিকিৎসকের পরামর্শ নেব।’
লেখক: জেনারেল, ল্যাপারোস্কোপিক ও ব্রেস্ট সার্জারি, ল্যাব এইড হাসপাতাল


