শহীদের গ্রাম
মুজাফরাবাদ—চট্টগ্রামের পটিয়া উপজেলার ছোট্ট এক গ্রাম, যার এক প্রান্ত থেকে আরেক প্রান্তের দূরত্ব ৫০০ মিটারেরও কম। ব্রিটিশ আমল থেকেই শিক্ষা, শিল্প-সংস্কৃতিতে অগ্রগামী এই জনপদটি ১৯৭১ সালের ৩ মে এমন এক নারকীয় গণহত্যার সাক্ষী হয়, যা ইতিহাসবিদদের মতে ভিয়েতনামের ১৯৬৮ সালের ‘মাই লাই’ গণহত্যাকেও হার মানায়।
ইতিহাসবিদ মাহবুব-উল আলম তার ‘বাঙালির মুক্তিযুদ্ধের ইতিবৃত্ত’ গ্রন্থে লিখেছেন, ‘যদি গণহত্যা কাকে বলে দেখতে চান, তবে মুজাফরাবাদ গ্রামে এসে দেখে যান।’
একইভাবে সাংবাদিক ও মুক্তিযুদ্ধ গবেষক নাসিরুদ্দিন চৌধুরী লিখেছেন, ‘আমি ভিয়েতনামের মাই লাই দেখিনি, তবে মুজাফরাবাদ দেখেছি। স্বাধীনতার জন্য জীবনদান যদি সর্বোচ্চ মূল্য হয়, তবে মুজাফরাবাদ গ্রামের মতো এত বেশি মূল্য খুব কম গ্রামকেই দিতে হয়েছে।’
বিশ্বজুড়ে মানুষ ‘মাই লাই’ গণহত্যার কথা জানলেও, চট্টগ্রামের এই গ্রামে সংঘটিত সমান ভয়াবহ হত্যাযজ্ঞের কথা অনেকেই জানে না।
মাই লাইয়ে মার্কিন সেনারা ৫০৪ জনকে হত্যার পাশাপাশি ১২ বছরের শিশুকেও ধর্ষণ করেছিল, আর মুজাফরাবাদে পাকিস্তানি বাহিনী ও তাদের এ দেশীয় দোসরদের হাতে অন্তত ৩০০-এর বেশি সনাতন ধর্মাবলম্বী মানুষ শহীদ হন। যেখানে ১০০-এর বেশি পাকিস্তানি সেনা ও ৫০-এর বেশি রাজাকার অংশ নেয় এবং তারা ২০০-এর বেশি নারীকে ধর্ষণ করে।
অনেক ক্ষেত্রে স্বামীর সামনে স্ত্রীকে গণধর্ষণ, তারপর স্বামীকে হত্যা, পুনরায় স্ত্রীকে ধর্ষণ ও হত্যা করে স্বামীর লাশের ওপর ফেলে রাখার মতো পৈশাচিক ঘটনাও ঘটে।
মুক্তিযুদ্ধের শুরু থেকেই সনাতন ধর্মাবলম্বী সংখ্যাগরিষ্ঠ হওয়ায় গ্রামের অনেক বাসিন্দা নিরাপত্তার জন্য আত্মগোপনে ছিলেন এবং প্রবেশমুখে পাহারার ব্যবস্থাও ছিল। কিন্তু ২ মে রাতে স্থানীয় শান্তি কমিটি ও খরনা ইউনিয়নের চেয়ারম্যান রমিজ আহমেদ চৌধুরীর নেতৃত্বে গ্রামে এসে জানানো হয়, পরদিন একটি বৈঠক হবে—যেখানে আলোচনা হবে কীভাবে গ্রামটিকে পাকিস্তানি বাহিনীর হাত থেকে রক্ষা করা যায়।
এই আশ্বাসে অনেক গ্রামবাসী আত্মগোপন থেকে ফিরে আসেন, অথচ একই সময়ে রাজাকার ও শান্তি কমিটির সদস্যরা পাকিস্তানি বাহিনীর দোহাজারী ক্যাম্পে গিয়ে জানায় যে, মুজাফরাবাদে মুক্তিবাহিনীর ঘাঁটি গড়ে উঠেছে এবং ভারত থেকে অস্ত্র এনে গেরিলাদের প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে। এই তথ্যই হয়ে ওঠে পরিকল্পিত গণহত্যার অজুহাত।
৩ মে ১৯৭১, আনুমানিক সকাল ৬টা, রাতভর গুড়িগুড়ি বৃষ্টি চলছিল, পাহারায় থাকা তরুণরাও ঘুমে; ঠিক তখন তিনটি ট্রাকে করে শতাধিক পাকিস্তানি সেনা ও পঞ্চাশের বেশি রাজাকার গ্রামটিকে চারদিক থেকে ঘিরে ফেলে। পূর্বদিকে আরাকান সড়কে ছয়টি কামান বসানো হয় এবং পূর্ব-পশ্চিম ও উত্তর-দক্ষিণে ভারী মেশিনগান তাক করা হয় যাতে কেউ পালাতে না পারে। সকাল সাড়ে ৬টার দিকে শুরু হয় আক্রমণ।
প্রত্যক্ষদর্শী আশুতোষ দত্তের ভাষায়—হঠাৎ আর্তচিৎকার, তারপর খৈ ফোটার মতো গুলির শব্দ, ‘পাঞ্জাবি আইস্যে’—এই চিৎকারের সঙ্গে সঙ্গে শুরু হয় মুজাফরাবাদের নারকীয় গণহত্যা।
পাকিস্তানি সেনারা ঘরে ঘরে ঢুকে মানুষ টেনে বের করে উঠোনে দাঁড় করিয়ে হত্যা করে, মন্দিরে উপাসনাকারীরাও এদিন রক্ষা পাননি, প্রাণ বাঁচাতে খাল-বিল-পুকুরে লুকানো মানুষদের রাজাকারদের সহায়তায় খুঁজে বের করে ব্রাশফায়ারে হত্যা করা হয়। কেউ খড়ের গাদা বা গোয়ালঘরে লুকিয়েও বাঁচতে পারেননি, শতবর্ষী বৃদ্ধকেও বেয়নেট দিয়ে মলদ্বারে আঘাত করে হত্যা করা হয়। গুলিবিদ্ধ আহতদের জবাই করে মৃত্যু নিশ্চিত করা হয়।
প্যারী মোহন দাশের ঘরের টিনের চাল আগুনে লাল হয়ে উঠলে সেই জ্বলন্ত টিনের ওপর ক্ষেত্রমোহন দাশকে নিক্ষেপ করা হয়; শিক্ষক রায়মোহন বিশ্বাসের কাপড় খুলে হাত বেঁধে স্ত্রী-কন্যার সামনে গুলি করে হত্যা করা হয়; বহু লাশ বিকৃত করা হয়; একই দিনে বহু নারী-পুরুষকে একটি ঘরে আটকে বাইরে থেকে আগুন দিয়ে পুড়িয়ে হত্যা করা হয় এবং পোড়া লাশের গন্ধে বাতাস ভারী হয়ে উঠলেও ঘাতকেরা পৈশাচিক উল্লাসে ফেটে পড়ে।
এই গণহত্যায় নারীদের ওপর চালানো হয় অকল্পনীয় নির্যাতন। ২০০-এর বেশি নারীকে ধর্ষণ করা হয়, ধর্ষণের পরও অনেককে হত্যা করা হয়, স্বামীর সামনে স্ত্রীকে ধর্ষণ, তারপর স্বামীকে গুলি করে হত্যা, পরে স্ত্রীকেও হত্যা করার ঘটনা ঘটে। অনেক ধর্ষিত নারী আত্মহত্যা করেন, অনেকেই লোকলজ্জার ভয়ে গ্রাম ছেড়ে চলে যান, বহু পরিবার ভারতে আশ্রয় নিয়ে আর ফিরে আসেনি।
একই দিনে ব্যক্তিগত ট্র্যাজেডির অসংখ্য দৃশ্য তৈরি হয়। সুরেন্দ্র সেন তার শিশুপুত্র দীপককে বুকে জড়িয়ে বাঁচতে চেয়েও গুলিতে নিহত হন, তিন সহোদর নিকুঞ্জ, অশ্বিনী ও বনমালী দাশকে যখন লাইনে দাঁড় করানো হচ্ছিল, বনমালী পালিয়ে বাঁচলেও বাকি দুই ভাই নিহত হন, নির্মল সেন ধর্ষণের দৃশ্য দেখে প্রতিবাদ করলে তাকে ও তার পিতাকে এক দড়িতে বেঁধে গুলি করে হত্যা করা হয়, নিরঞ্জন বিশ্বাস মেয়েকে বাঁচাতে গিয়ে সেনাদের পা জড়িয়ে ধরলেও তাকে গুলি করা হয়, বিধবা সুরবালা ও তার প্রতিবন্ধী সন্তানও রক্ষা পাননি, ব্রাশফায়ারে নিহত শতাধিক মানুষের মরদেহ ছিন্নভিন্ন অবস্থায় গণকবরে ফেলা হয় এবং পূজারীদের দিয়ে মন্দিরের মূর্তি ভেঙে ধর্মীয় অবমাননা করা হয়।
সকাল সাড়ে ৬টা থেকে দুপুর ২টা—মাত্র কয়েক ঘণ্টায় এই হত্যাযজ্ঞ চলে এবং এমন কোনো পরিবার ছিল না, যারা তাদের কোনো সদস্য হারায়নি।
গবেষক চৌধুরী শহীদ কাদের তার ‘মুজাফরাবাদ গণহত্যা’ গ্রন্থে উল্লেখ করেন, এটি ছিল পরিকল্পিত গণহত্যা, স্থানীয় মুসলিম লীগ নেতাদের নীলনকশায় সংঘটিত, যার মূল লক্ষ্য ছিল হিন্দু নিধন ও নারীদের ওপর নির্যাতন।
তিনি বলেন, ‘মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে এত নির্মম গণহত্যার উদাহরণ বিরল এবং এই ঘটনাটি পুরো গ্রামের সামাজিক কাঠামো বদলে দেয়, যুদ্ধের পর গ্রামটি একাত্তরের স্মৃতিকে কেন্দ্র করে নতুনভাবে গড়ে ওঠে।’
তার ভাষায়, ‘শোককে শক্তিতে রূপান্তরের উদাহরণ দিতে হলে মুজাফরাবাদের কথাই বলতে হবে।’