আবহমান বাংলার চৈত্র সংক্রান্তি: উৎসব, সংস্কৃতি, আহার

আহমাদ ইশতিয়াক
আহমাদ ইশতিয়াক

আজ চৈত্র সংক্রান্তি। চৈত্র মাসের শেষ দিন। বাঙালির জীবনে চৈত্রসংক্রান্তি এক বিশেষ স্থান দখল করে আছে। আবহমান বাংলায় শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে চৈত্রসংক্রান্তি এক উৎসবের দিন হিসেবে পালিত হয়ে আসছে।

আজও বাংলা সনের কোনো নির্দিষ্ট দিনের হিসেবে চৈত্র সংক্রান্তির দিনেই সবচেয়ে বেশি উৎসব পালিত হয়।

কখনো বাঙালির নিজস্ব আচার-সংস্কৃতিতে, কখনো বিশেষ ধর্মাবলম্বীদের বিশ্বাসে, আবার কখনো রীতি-নীতির অভ্যস্ততায় দিনটি পালন করেন গ্রাম-বাংলার সাধারণ মানুষ।

জমিদারি প্রথা চলাকালীন বাংলায় চৈত্রসংক্রান্তির দিনটি খাজনা আদায়সহ ঐতিহ্যবাহী ‘হালখাতা’ উৎসব হিসেবে পালিত হয়ে আসছে। পরবর্তীতে এটি ক্রমশ গ্রামীণ দোকান, হাটবাজারে ‘হালখাতা’ উৎসবে রূপ নেয়। দিনে দিনে যা শহরেও পৌঁছে যায়।

চৈত্র সংক্রান্তিতে গ্রামীণ জনপদে ধর্মীয় উৎসবও হয়। চৈত্র সংক্রান্তিকে ঘিরে সনাতন ধর্মাবলম্বীরা বেশ কয়েকটি পূজার আয়োজন করেন। এদিন সনাতন ধর্মাবলম্বীরা শাস্ত্র মেনে স্নান করেন, কেউবা ব্রত পালন করেন, আবার কেউবা উপবাস থাকেন।

চৈত্র সংক্রান্তির দিনে সনাতন ধর্মাবলম্বীরা চড়ক পূজার আয়োজন করেন। চড়ক পূজা আদিকাল থেকে ছিল বাংলার সনাতন ধর্মাবলম্বীদের প্রধান লোক পূজা। জনশ্রুতি আছে, ৮৯২ বঙ্গাব্দে সুন্দরানন্দ ঠাকুর এক রাজ চড়ক পূজার প্রচলন করেন। চৈত্র সংক্রান্তির দিনেই মূলত চড়ক পূজার আয়োজন করা হয়। টানা চৈত্র সংক্রান্তির পূর্ণ লগ্নে শিব ও কালীর মিলন হয় বলে বৃহত্তর আঙ্গিকে পূজার আয়োজনে ব্যস্ত থাকেন ভক্তরা। এ দিন দম্পতির সন্তান প্রাপ্তি, দুরারোগ্য ব্যাধি থেকে মুক্তি ও মনের বাসনা পূরণের আশায় চড়ক পূজার আয়োজন করেন সনাতন ধর্মাবলম্বীরা।

তাদের বিশ্বাস, শিবের আরেক নাম ‘মঙ্গলেশ্বর’। তাই বলা হয়, ‘যত্র জীব তত্র শিব’। অর্থাৎ যেখানে জীব সেখানে শিব। এ পৃথিবী ক্ষেত্র বা প্রকৃতি রূপে কালী, আর ক্ষেত্রের অধিপতি শিব। তারা বিশ্বাস করেন, চড়ক পূজা হচ্ছে শিব ও কালীর প্রতীক। এক সময় বাংলার প্রায় সব অঞ্চলে এ উৎসবের আয়োজন করা হতো।

চৈত্র সংক্রান্তির দিনে চড়ক পূজার সঙ্গে খেজুর ভাঙা উৎসবের আয়োজন করা হয়। এ দিন সন্ন্যাসীরা মন্ত্রে দীক্ষিত হয়ে বাড়ি বাড়ি গিয়ে শিব-গৌরী নিত্যগীতি সহকারে মাগন করেন। চড়ক পূজা পর্যন্ত ভক্তরা পবিত্রতার সঙ্গে সন্ন্যাস ব্রত পালন করেন এবং নিরামিষ খাবার গ্রহণ করেন। পূজার লগ্নে সারাদিন উপবাস করেন। পরে সন্ন্যাসীরা কাঁটাযুক্ত খেজুর গাছ থেকে খেজুর ভেঙে ভক্তদের মধ্যে বিলিয়ে দেন। খেজুর খেয়ে ভক্তরা উপোস ভাঙেন।

চৈত্র সংক্রান্তির দিনে আরেকটি উৎসব হলো ‘নীল উৎসব’। নীল উৎসবের সাজ লাল কাপড় অথবা পাগড়ি মাথায় বাঁধা। গলায় রুদ্রাক্ষের মালা ও হাতে ত্রিশূল। সঙ্গে ঢাক-ঢোল, করতাল ও কাসার বাদ্য। বাহারি রঙে সাজা হয় শিব-পার্বতী ও হনু (পাগল সাধু)। নীলকে সঙ্গে নিয়ে বাড়ি বাড়ি ছোটেন দলপতি (বালা)। হিন্দু বাড়ির উঠানে আলপনা দিয়ে, কেউ বা উঠান লেপে সেখানে নীলকে বসান। এরপর শুরু হয় নীল নাচ ও শিবের গাজন।

চৈত্র সংক্রান্তির দিনে বাংলার বহু জায়গায় পালিত হয় ‘গম্ভীরাপূজা’। বিশেষ করে রাজশাহী ও বরেন্দ্র অঞ্চলে এখনো ‘গম্ভীরাপূজা’ বা শিবের গাজন উৎসব হয়।

চৈত্র সংক্রান্তির দিনে বিভিন্ন উৎসবকে উপলক্ষ করে গ্রামীণ মেলা বসে। সেখানে পাওয়া যায় মাটির খেলনা, পুতুলসহ নিত্য প্রয়োজনীয় নানান সামগ্রী।

কেবল সনাতন ধর্মাবলম্বীরাই নন, বাংলার মুসলমানদের মধ্যেও চৈত্র সংক্রান্তি ধর্মীয়ভাবে উদযাপন হতো। এ দিনে খোলা প্রান্তরে জামাতের সঙ্গে বিশেষ নামাজ আদায়ের প্রচলণ ছিল। কোথাও কোথাও আজও এই নামাজ প্রচলিত আছে। এর উদ্দেশ্য মহান আল্লাহর কাছে এই গরম থেকে নিষ্কৃতির জন্য দোয়া করা।

চৈত্র সংক্রান্তির দিনে একসময় গ্রামে বাড়ি বাড়ি ঘুরে চাল, গুড় ও দুধ সংগ্রহ করা হতো। এসব উপকরণ নিয়ে গ্রামবাসীরা ছুটতেন গাঁয়ের সবচেয়ে উঁচু গাছের তলে। এ ক্ষেত্রে তালগাছই বেশি প্রাধান্য পেত। সেই শিন্নি পাক দেখতে তালতলায় হাজির হতেন গ্রামবাসী। কালক্রমে এটি পরিচিতি পেয়ে যায় তালতলার শিন্নি নামে। এই শিন্নি পরিবেশন করা হতো কলাপাতায়।

আবহমান কালের রীতি অনুসারে একেক উৎসবের জন্য একেক রকমের খাবার নির্ধারিত আছে। এটি এ অঞ্চলের কৃষি-সংস্কৃতির সঙ্গে জড়িত। এ কারণেই যে ঋতুতে যে উৎসব হয়, সে ঋতুতে যেসব ফসল পাওয়া যায়, তাই হয় ওই উৎসবের খাবারের প্রধান উপকরণ।

চৈত্র সংক্রান্তির তেমনই একটি খাবার ছিল শাকান্ন। একসময় চৈত্র সংক্রান্তির দিনে গ্রাম-বাংলার ঘরে ঘরে শাকাহার হতো। বাড়ির গৃহিণীরা চৈত্র সংক্রান্তির সকালেই বাড়ির পার্শ্ববর্তী জলা, জংলা, ঝোপঝাড় থেকে নানা পদের শাক তুলে আনতেন। মজার ব্যাপার হলো এই শাক কিন্তু আবাদি বা চাষ করা হলে হবে না। হতে হতো অনাবাদী। এমন চৌদ্দ পদের শাক দিয়েই সেদিন দুপুরের আহারের রীতি ছিল। চৈত্র সংক্রান্তির দিনে বাড়িতে কোনো মাছ-মাংসের আয়োজন হতো না। সেদিনের খাবার হতো শুধুমাত্র শাক আর ভাত।

গ্রাম বাংলায় আদিকাল থেকেই চৈত্র সংক্রান্তিতে তিতা খাবার খাওয়ার চল ছিল। লোকজ বিশ্বাস অনুসারে, এর মধ্য দিয়ে বিগত বছরের দুঃখ-বেদনা বিসর্জন দেওয়া যায়। এ ধরনের খাবারের মধ্যে রয়েছে করলা ভাজা, শুক্ত, নিমপাতা ভাজা, উচ্ছে দিয়ে তিতা ডাল, সজনের চচ্চড়ি ইত্যাদি। শাকের মধ্যেও কয়েকটি ছিল তিতা স্বাদের। অনেকের বিশ্বাস, তিতা খাবার যেহেতু স্বাস্থ্যকর এবং রোগ প্রতিরোধ করতে সক্ষম, তাই এই খাবার গ্রহণের মাধ্যমে তারা সারা বছর সুস্থ থাকবেন।

আবহমান বাংলায় চৈত্র সংক্রান্তির দিনে গ্রামের বাড়িতে বাড়িতে খাওয়া হতো গমের ছাতু, দই ও পাকা বেল সহযোগে বিশেষ শরবত। এদিন অতিথিদের প্রথমে এই শরবত পরিবেশন করা হতো। আবার সংক্রান্তির দিন গ্রামের হাটে কোনো কোনো দোকানে বিক্রেতারা ক্রেতাদের এই শরবত দিয়ে আপ্যায়ন করতেন।

এ ছাড়া, চৈত্র সংক্রান্তির দিনে সনাতন ধর্মাবলম্বীদের মধ্যে অনেকে ব্রত পালন করেন। এ সময় আমিষ নিষিদ্ধ। সাত ধরনের তিতা রান্নায় বেশিরভাগ সময় পেঁয়াজ ও রসুনের ব্যবহার এড়িয়ে যাওয়া হয়।

চৈত্র সংক্রান্তির দুপুরে একসময় রান্না হতো কাঁচা কাঁঠাল বা এঁচোড়ের তরকারী। কোথাও শুধু কাঁচা কাঁঠাল দিয়ে তৈরি হয় এঁচোড়। আবার কোথাও কাঁচা কাঁঠালের সঙ্গে কুমড়ো, ঝিঙে, উচ্ছে, আলু,  কাঁচা কলা, বরবটি, নারিকেল বাটা দিয়ে তৈরি করা হতো পাঁচন।


তথ্যসূত্র:
হাজার বছরের বাঙালি সংস্কৃতি—গোলাম মুরশিদ
বাঙালীর খাদ্যকোষ—মিলন দত্ত
বাংলাদেশের উৎসব—মুনতাসির মামুন
বাঙলা ও বাঙালীর সমাজ ও সংস্কৃতি—অতুল সুর