ঈদ আনন্দ নেই রংপুর অঞ্চলের লক্ষাধিক আলুচাষি পরিবারে
রাত পোহালেই ঈদ। কিন্তু উৎসবের চিরচেনা আমেজ নেই রংপুর অঞ্চলের লক্ষাধিক আলুচাষি পরিবারে। মাঠভরা আলু, কিন্তু নেই ক্রেতা। লোকসানের বোঝা কাঁধে নিয়ে তাদের ঈদের আনন্দ হারিয়ে গেছে।
টানা দ্বিতীয় বছরের মতো আলুচাষে লোকসান গুনছেন কৃষক। উৎপাদিত আলু খেতেই পড়ে আছে, আর তা ঘিরেই হতাশায় ডুবছেন তারা। ফলে ঈদের কোনো প্রস্তুতিই নেই এসব পরিবারে।
রংপুর অঞ্চলের লালমনিরহাট, কুড়িগ্রাম, গাইবান্ধা, রংপুর ও নীলফামারী জেলার বিভিন্ন গ্রাম ঘুরে দেখা গেছে, চারদিকে ঈদকে ঘিরে ব্যস্ততা থাকলেও আলুচাষিদের ঘরে নীরবতা। উৎপাদন খরচের অর্ধেক দামে আলু বিক্রি করে ঋণের বোঝাও কমাতে পারছেন না তারা। অনেকেই পুঁজি হারিয়ে দিশেহারা।
রংপুরের নবদীগঞ্জ এলাকার কৃষক মোকছেদুর রহমান (৫০) চলতি মৌসুমে ১১ বিঘা জমিতে আলুচাষ করেছেন। এতে তার খরচ হয়েছে প্রায় ৬ লাখ ২০ হাজার টাকা। উৎপাদন হয়েছে প্রায় ৪০ হাজার কেজি আলু। এর মধ্যে ২০ হাজার কেজি বিক্রি করে পেয়েছেন মাত্র ১ লাখ ৬০ হাজার টাকা।
প্রতি কেজি আলু উৎপাদনে যেখানে তার খরচ হয়েছে ১৫-১৬ টাকা, সেখানে বিক্রি করতে হচ্ছে ৮-৯ টাকায়। আলুচাষের জন্য স্থানীয় এনজিও থেকে ৪ লাখ টাকা ঋণ নেওয়ায় এখন সেই ঋণ পরিশোধের চাপ আরও বেড়েছে।
বৃদ্ধা মা, স্ত্রী ও তিন সন্তান নিয়ে মোকছেদুরের পরিবার। তাদের সবার চোখেই হতাশা। সন্তানদের নতুন পোশাকের আশা থাকলেও বাবার মলিন মুখ দেখে তারাও চুপ করে গেছে।
মোকছেদুর দ্য ডেইলি স্টারকে বলেন, ‘পরিবারের জন্য সেমাই, চিনি ও দুধ কিনেছি। কিন্তু কাউকেই নতুন পোশাক দিতে পারিনি। খুব কষ্ট লাগছে। ঈদের দিনটাও বিষাদের মধ্যেই কাটবে। গত বছরও আলুচাষে লোকসান করে ভালোভাবে ঈদ করতে পারিনি।’
একই অবস্থা ১৫ বিঘা জমিতে আলুচাষ করা লালমনিরহাট সদর উপজেলার মোস্তফি এলাকার কৃষক নুর ইসলামের (৫৫)। তিনি বলেন, ‘আশা ছিল গত বছরের ক্ষতি এবার পুষিয়ে নিতে পারবেন। কিন্তু এবার উৎপাদন খরচের অর্ধেক দামেও ক্রেতা মিলছে না।’
‘সন্তানদের ঈদে নতুন পোশাক কিনে দিতে পারিনি। আলুচাষ আমাকে পথে বসিয়েছ ‘, যোগ করেন তিনি।
কুড়িগ্রামের রাজারহাট উপজেলার মিয়া বাড়ী গ্রামের কৃষক রহিদুল ইসলাম (৫০) বলেন, ‘১২ বিঘা জমিতে আলু চাষ করে প্রায় সাড়ে ৩ লাখ টাকা লোকসান গুনতে হচ্ছে।’
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, এ বছর রংপুর অঞ্চলের পাঁচ জেলায় মোট ১ লাখ ১০ হাজার ৭০০ হেক্টর জমিতে আলুচাষ হয়েছে। উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা প্রায় ৩০ লাখ ৩৫ হাজার টন।
গত বছর এ অঞ্চলে ১ লাখ ১৯ হাজার ৭০৯ হেক্টর জমিতে আলু উৎপাদন হয়েছিল প্রায় ৩৪ লাখ ৫০০ টন। লোকসানের কারণে এবার অনেক কৃষক আলুচাষ করেননি।
এ অঞ্চলে মোট ৭১টি হিমাগার রয়েছে, যার ধারণক্ষমতা প্রায় ৭ লাখ ৬৪ হাজার ৫০০ টন। কিন্তু উৎপাদনের তুলনায় এই ধারণক্ষমতা কম হওয়ায় অনেক কৃষক বাধ্য হয়ে কম দামে আলু বিক্রি করছেন।
রংপুরের বদরগঞ্জ উপজেলার সরকারপাড়া গ্রামের কৃষক আব্দুল গনি (৬০) ২০ বিঘা জমিতে আলুচাষ করেছেন। তিনি বলেন, ‘১০ বিঘা জমির আলু বিক্রি করে কিছু ঋণ শোধ করেছি। আরও প্রায় ৩ লাখ টাকা দেনা।’
পীরগাছা উপজেলার চৌধুরানী এলাকার কৃষক আতাবর হোসেন (৬৫) বলেন, ‘গত বছর লোকসান হওয়ায় এ বছর চাষ কম করেছিলাম। তবুও লোকসান এড়াতে পারিনি। খেতে আলু আছে, কিন্তু ক্রেতা নেই। ঈদ সবার জন্য আনন্দ বয়ে আনলেও আমাদের জন্য এনেছে বিষাদ।’
রংপুর আঞ্চলিক কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের অতিরিক্ত পরিচালক সিরাজুল ইসলাম বলেন, ‘আবহাওয়া অনুকূলে থাকায় এ বছর ভালো ফলন হয়েছে। কিন্তু বাজারদর কম থাকায় কৃষক হতাশ।’
তিনি বলেন, ‘আলু রপ্তানির সুযোগ তৈরি না হলে কৃষক বড় ধরনের সংকটে পড়বেন। এতে ভবিষ্যতে আলুচাষে আগ্রহ কমে যেতে পারে।’