ডিজেল সংকট: সেচের অভাবে বোরো ও পাট উৎপাদন নিয়ে শঙ্কা

নিজস্ব সংবাদদাতা, গোপালগঞ্জ, কুষ্টিয়া, পাবনা ও বরিশাল

ডিজেল সংকটে কৃষিকাজ নিয়ে বিপাকে পড়েছেন কৃষকরা। সময়মতো সেচের পানি না পাওয়ায় বোরো ধান ও পাট উৎপাদনে ক্ষতির আশঙ্কা তৈরি হয়েছে গোপালগঞ্জ, কুষ্টিয়া ও বরিশালে। জ্বালানি সংকটে ট্রাক্টর ব্যবহার করতে পারছেন না পাবনার কৃষকরা।

কৃষকদের অভিযোগ, চাহিদার তুলনায় কম ডিজেল পাওয়া ও খুচরা বাজার থেকে অতিরিক্ত দামে কিনতে বাধ্য হওয়ায় কৃষকদের উৎপাদন ব্যয় বেড়ে যাচ্ছে। এতে করে তারা আর্থিক চাপের মুখে পড়েছেন।

গোপালগঞ্জ সদর উপজেলার রোড়াশী ইউনিয়নের ঘোষগাতি ও দীঘারকুলসহ বিভিন্ন এলাকায় বোরো ধান আবাদ হয়েছে। বর্তমানে ধানের শীষ আসার গুরুত্বপূর্ণ এ সময়ে ডিজেল সংকটের কারণে সেচ কার্যক্রম বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। 

এতে কৃষকদের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। একই সঙ্গে পাট চাষের জমি প্রস্তুতে প্রয়োজনীয় সেচের অভাবে আবাদ ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।

গোপালগঞ্জ সদর উপজেলার রোড়াশী ইউনিয়নের ঘোষগাতি গ্রামের কৃষক এনামুল মোল্লা দ্য ডেইলি স্টারকে বলেন, ‘ডিজেলের অভাবে আমরা খুব সমস্যায় পড়েছি। ধানখেতে পানি দিতে পারছি না, পাটও বুনতে পারছি না। পাম্প কিংবা দোকান কোথাও ডিজেল পাচ্ছি না।’

‘সরকারের কাছে আমাদের একটাই দাবি, সেটা হলো ডিজেল। আমাদের ফসল উৎপাদনের জন্য তেলই দরকার, অন্য কিছু না। বর্তমানে এক লিটার ডিজেল ১৫০ টাকা দামে কিনতে হচ্ছে, যা আমাদের জন্য খুব কষ্টের হয়ে যাচ্ছে।’

গোপালগঞ্জে শরীফ নুরজাহান ফিলিং স্টেশনের ক্যাশিয়ার বাচ্চু শেখ ডেইলি স্টারকে বলেন, ‘কৃষকরা এখন ধান চাষ করছে, তাই তাদের তেল দেওয়ার ক্ষেত্রে গুরুত্ব দিচ্ছি। তাদের চাহিদা বেশি থাকলেও ৫ লিটারের বেশি ডিজেল দিতে পারছি না। তবে তাদের বলেছি ৫ লিটার শেষ হলে আসলে আবার দিতে পারব, যদি আমাদের কাছে তেল থাকে।’ 

এ বিষয়ে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর গোপালগঞ্জের উপ-পরিচালক ড. মামুনুর রহমান দ্য ডেইলি স্টারকে বলেন, ‘গোপালগঞ্জের মাটিতে জৈব পদার্থ বেশি থাকায় পানি ধারণ ক্ষমতাও বেশি। সামনে বৃষ্টিপাতের সম্ভাবনা রয়েছে, যা সেচের চাপ কমিয়ে বর্তমান সমস্যার সমাধানে সহায়তা করবে, বিশেষ করে পাট মৌসুমে।’

তিনি আরও বলেন, ‘কৃষকদের আতঙ্কিত হওয়ার প্রয়োজন নেই। এখানে পর্যাপ্ত ডিজেল মজুত আছে। কেউ তেল না পেলে বা অতিরিক্ত দামে কিনতে বাধ্য হলে দ্রুত যোগাযোগ করতে বলা হয়েছে।’

‘উপ-সহকারী কৃষি কর্মকর্তাদের মাধ্যমে সরাসরি সহায়তা দেওয়া হচ্ছে এবং প্রকৃত কৃষকদের ন্যায্যমূল্যে তেল সরবরাহ নিশ্চিত করতে প্রশাসনের সাথে সমন্বয় করা হচ্ছে। আমরা কৃষকদের পাশে আছি,’ যোগ করেন এ কর্মকর্তা। 

জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সূত্র জানায়, চলতি মৌসুমে জেলায় ৮২ হাজার ৫৯৩ হেক্টর জমিতে বোরো ধানের আবাদ হয়েছে। এর মধ্যে ২৫ হাজার ৬৫৪ হেক্টর জমিতে ডিজেলচালিত সেচ মেশিন ব্যবহার করা হচ্ছে। এছাড়া পাট চাষের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে ২৪ হাজার ৮৫৯ হেক্টর জমিতে।

অন্যদিকে, পাবনায় জ্বালানি সংকট তীব্র হয়েছে। কৃষক ও শ্রমজীবী মানুষ দৈনন্দিন কাজের জন্য প্রয়োজনীয় জ্বালানি পাচ্ছেন না।

পাবনা সদর উপজেলার ইসলামগাঁতি গ্রামের কৃষক মো. জাহিদ হাসান অন্তত ১০ লিটার ডিজেলের খোঁজে এক ফিলিং স্টেশন থেকে আরেকটিতে ঘুরছেন। তার ট্রাক্টরটি সকাল থেকেই মাঠে বন্ধ হয়ে পড়ে আছে। তিনটি ভিন্ন স্টেশন থেকে তাকে ফিরিয়ে দেওয়া হয়েছে।

জাহিদ বলেন, ‘আমার তিনটি ট্রাক্টর আছে, যেগুলো ফসল চাষের কাজে ব্যবহার করি। প্রতিটির জন্য প্রতিদিন ৫০ থেকে ৬০ লিটার ডিজেল লাগে। সরবরাহ না থাকায় ঈদের আগেই দুটি ট্রাক্টর বন্ধ করে দিয়েছি। এখন একটি চালানোর চেষ্টা করছি, কিন্তু এই সংকটের কারণে কাজ করতে পারছি না।’

গতকাল শনিবার মাত্র ৮ লিটার ডিজেল সংগ্রহ করতে পারেন জাহিদ। আজ সকালে মাঠে কাজ শুরুর পর জ্বালানি শেষ হয়ে যাওয়ায় ট্রাক্টরটি বন্ধ হয়ে যায়। 

দ্য ডেইলি স্টারকে জাহিদ বলেন, ‘ট্রাক্টরটি মাঠেই রেখে তিনটি পাম্পে ছুটেছি, কিন্তু কোথাও ডিজেল পাইনি। এভাবে চলতে থাকলে আমাকে পুরোপুরি কাজ বন্ধ করে দিতে হবে।’

পাবনা জেলা প্রশাসনের নেজারত শাখার নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট মো. মনিরুজ্জামান দ্য ডেইলি স্টারকে বলেন, ‘প্রায় ৩০টি ফিলিং স্টেশন চালু থাকলেও কোনোটিই পর্যাপ্ত সরবরাহ পাচ্ছে না। এই সংকটে কেউ যেন অবৈধভাবে জ্বালানি মজুত করতে না পারে, তা নিশ্চিত করতে জেলা প্রশাসন সব স্টেশন পর্যবেক্ষণে রেখেছে।’

একই অবস্থা দেশের দক্ষিণের জেলা বরিশালেও। বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন করপোরেশনের (বিএডিসি) কর্মকর্তারা জানান, এই সংকট জেলার ডিজেলচালিত সেচ পাম্পগুলোতে প্রভাব ফেলতে শুরু করেছে। ৭০টি পাম্পের প্রতিটিতে প্রায় ১২ লিটার ডিজেল প্রয়োজন হলেও বর্তমানে তারা মাত্র প্রায় ২ লিটার করে জ্বালানি পাচ্ছেন।

বিএডিসি বরিশালের নির্বাহী পরিচালক সৈয়দ ওয়াহিদ মুরাদ দ্য ডেইলি স্টারকে বলেন, ‘বৈদ্যুতিক সেচ ব্যবস্থা স্বাভাবিকভাবে চললেও ডিজেলচালিত পাম্পগুলো সমস্যায় পড়েছে। এখন মাঠে বোরো ধান রয়েছে। এই পরিস্থিতি চলতে থাকলে উৎপাদনে প্রভাব পড়বে।’

তবে বরিশালের জেলা প্রশাসক মো. খায়রুল আলম সুমন বলেন, ‘প্রশাসন পেট্রোল পাম্পগুলোকে সরাসরি ডিপো থেকে জ্বালানি সংগ্রহের অনুমতি দিয়েছে। ২৯টি স্টেশনে ট্যাগ কর্মকর্তা নিয়োগ করা হয়েছে। চাহিদা পূরণের জন্য আমাদের কাছে পর্যাপ্ত জ্বালানি রয়েছে। সংকটের কোনো কারণ নেই। এখন কেবল যাদের যথাযথ চাহিদা ও যৌক্তিকতা রয়েছে, তাদেরই ডিলারদের কাছ থেকে জ্বালানি সংগ্রহের অনুমতি দেওয়া হচ্ছে।’

কুষ্টিয়ায় প্রত্যন্ত গ্রামের এজেন্ট বা ডিলারদের ডিপো থেকে তেল না দেওয়ায় শহরে ছুটতে হচ্ছে কৃষকদের। এতে সংকট আরও তীব্র হচ্ছে।
কুষ্টিয়ার জ্বালানি তেল পরিবেশক সমিতির সাধারণ সম্পাদক আব্দুল হাই তপো বলেন, ‘এটা তো বৈশ্বিক সমস্যা। সরকারের কাছে যে তেল আছে, সব দিয়ে দিলে সবাই বোতলে ভরে বাসায় খাটের তলায় রাখছে। মানুষের অনৈতিক চাহিদা বেশি।’

প্রান্তিক পর্যায়ের কৃষকদের বিষয়ে তিনি বলেন, ‘আমরা এই প্রান্তিক কৃষকদের ফেরাচ্ছি না। কিন্তু এই সময়ে কিছু মধ্যস্বত্বভোগী মানুষের উৎপত্তি ঘটবে। তারা কিছু সমস্যা তৈরি করবে।’ 

কুষ্টিয়া শহর থেকে ২০ কিলোমিটার দূরের গ্রাম সোনাডাঙ্গার কৃষক মোহাম্মদ আলী বলেন, ‘তেল এখনো কিছুটা পাচ্ছি, কিন্তু সেটা চাহিদার অর্ধেক। আমার লাগবে ৫ লিটার, দিচ্ছে ২ লিটার। আবার এই তেলও স্থানীয় বাজারে আগের মতো মিলছে না। যেতে হচ্ছে শহরে। এতে সময় ও অতিরিক্ত টাকার অপচয় হচ্ছে। এবার অনেকেই ধান ঘরে তুলতে পারবে বলে মনে হয় না।’

অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট জাকির হোসেন দ্য ডেইলি স্টারকে বলেন, ‘আমার জানা মতে তেল কম আসছে না। চাহিদা বৃদ্ধির কারণেই মূলত এই সমস্যা। মানুষের মধ্যে একটা প্যানিক সৃষ্টি হয়েছে, এ কারণে ব্যবস্থাপনায় কিছুটা সমস্যা হচ্ছে।’

এজেন্ট বা ডিলারদের তেল না দেওয়ার বিষয়ে তিনি বলেন, ‘এই ব্যাপারে আমি বক্তব্য দেওয়ার কেউ না। ডিপো থেকে যেভাবে সিদ্ধান্ত আসছে, সেভাবেই তারা তেল পাচ্ছে।