গাজীপুরে গলা কেটে হত্যা: ২ দিনেও ধরা পড়েনি মূল অভিযুক্ত, যা বলছেন স্থানীয়রা

নিজস্ব সংবাদদাতা, গাজীপুর

গাজীপুরের কাপাসিয়ায় তিন শিশু ও তাদের মাসহ ৫ জনকে গলা কেটে হত্যার ৪০ ঘণ্টার বেশি পার হলেও আজ রোববার রাত পর্যন্ত মূল অভিযুক্তকে গ্রেপ্তার করতে পারেনি পুলিশ।

শুক্রবার দিবাগত রাতে উপজেলার রাউৎকোনা গ্রামে প্রবাসী মনির হোসেনের বাড়িতে হত্যার ঘটনা ঘটে। ঘটনার পর থেকে অভিযুক্ত গৃহকর্তা ফোরকান মিয়া পলাতক।

নিহতরা হলেন—ফোরকানের স্ত্রী শারমিন (৩৫), তাদের সন্তান মিম (১৬), মারিয়া (৮), ফারিয়া (২) ও শ্যালক রসুল (২২)।

হত্যার ঘটনায় ফোরকান মিয়াকে প্রধান আসামি করে নিহত শারমিনের বাবা শাহাদাত মোল্লা বাদী হয়ে গতকাল শনিবার সন্ধ্যায় কাপাসিয়া থানায় মামলা করেন। মামলায় অজ্ঞাতনামা আরও ৩-৪ জনকে আসামি করা হয়েছে।

প্রধান আসামি পলাতক ফোরকানকে গ্রেপ্তার করতে না পারায় স্থানীয়দের মধ্যে ক্ষোভ তৈরি হয়েছে।

আজ সরেজমিনে ওই এলাকায় দেখা যায়, ওই বাসার জানালা ধরে কেউ দাঁড়িয়ে আছে, কেউ বাসার সামনে বসে কাঁদছে। বেশ কয়েকজন জন শিক্ষার্থী নীরবে দাঁড়িয়ে আছে।

স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, অভিযুক্ত ফোরকান পেশায় প্রাইভেটকার চালক। প্রায় ২০ বছর আগে শারমিন ও ফোরকানের বিয়ে হয়। তাদের সন্তান নিহত মিম স্থানীয় রাউৎকোনা মাদ্রাসার নবম শ্রেণির শিক্ষার্থী ও মারিয়া দ্বিতীয় শ্রেণির শিক্ষার্থী ছিল।

মিমের সহপাঠী আরিফুল ইসলাম দ্য ডেইলি স্টারকে জানায়, খবর পেয়ে তারা প্রায় ১০ জন সেখানে গেছে।

স্থানীয় পাবুর গ্রামের বাসিন্দা মোশাররফ হোসেন (৪৫) বলেন, 'প্রশাসন চাইলে ২৪ ঘণ্টার মধ্যেই আসামিকে ধরতে পারত। কিন্তু এত সময় পার হলেও এখনো তাকে গ্রেপ্তার করা হয়নি।'

আমরাইদ গ্রামের সিএনজিচালক সাখাওয়াত হোসেন (৫৫) বলেন, 'আমি নিজেও একজন চালক। শুনেছি অভিযুক্তও গাড়ি চালাতেন। এমন ঘটনা আমাদের পুরো পেশাকেই প্রশ্নবিদ্ধ করেছে।'

স্থানীয় রিকশাচালক সুলতান মিয়াও (৫০) দেখতে এসেছেন ঘটনাস্থল। তিনি বলেন, 'এমন নির্মম ঘটনা জীবনে দেখিনি।'

স্থানীয় রাউৎকোনা গ্রামের ছাত্তার মিয়া (৬০) বলেন, 'ছোঁটবেলা থেকে তাদের ৩ শিশুকে বাচ্চাকে কত আদর করেছি। অথচ আজ তারা নেই। গতকাল সারারাত ঘুমাতে পারিনি। প্রতিদিন দেখতাম বাবা তার সন্তানদের কোলে নিয়ে দোকানে যেত, অনেক কিছু কিনে দিত। আমি এখনো বিশ্বাস করতে পারছি না, বাবা নিজেই সন্তানদের খুন করেছে।'

একই এলাকার সাহারা খাতুন বলেন, 'এখানে এসে মনটা আরও খারাপ হয়ে গেছে। ছোট দুই শিশু খুব ফুটফুটে ছিল। বড় মেয়েটার সামনে পরীক্ষা ছিল, খুব মিশুক ছিল।'

ঘটনাস্থলের পাশেই মুদি দোকান চালান সুরমা আক্তার (৩৫) বলেন। তিনি ডেইলি স্টারকে বলেন, 'ঘটনার আগের রাতেও ফোরকান তার বাচ্চাদের কোলে নিয়ে এসে খাবার কিনেছিল। সন্তানদের খুব আদর করতেন তিনি।'

ময়নাতদন্ত ও দাফন

এদিকে, গতকালই নিহত শারমিন, তার ৩ মেয়েসহ ৫ জনের ময়নাতদন্ত গাজীপুরের শহীদ তাজউদ্দীন আহমদ মেডিকেল কলেজে সম্পন্ন হয়।

গাজীপুরের জেলা প্রশাসক মো. নূরুল করিম ভূঁইয়ার তত্ত্বাবধানে সংশ্লিষ্ট চিকিৎসকদের সঙ্গে যোগাযোগ করে জরুরি ভিত্তিতে শনিবারই ময়নাতদন্ত সম্পন্ন করার ব্যবস্থা করেন।

জেলা প্রশাসক বলেন, 'তাজউদ্দীন মেডিকেলে দুপুর ২টার পর ময়নাতদন্ত বন্ধ থাকে। কিন্তু ঘটনার ভয়াবহতা ও মরদেহগুলো জখমের কারণে দ্রুত পচনের আশঙ্কা থাকায় বিশেষ ব্যবস্থায় ময়নাতদন্ত সম্পন্ন করা হয়।'

জেলা প্রশাসক ছাড়াও অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট সালমা খাতুন, কাপাসিয়ার উপজেলা নির্বাহী অফিসার তামান্না তাসনীম, সহকারী কমিশনার (ভূমি) মো. নাহিদুল হক ও জেলা প্রশাসনের দুজন এক্সিকিউটিভ ম্যাজিস্ট্রেট সরেজমিনে উপস্থিত হয়ে খোঁজখবর নেন।

এরপর রাতেই নিহতদের মরদেহ পাঠানো হয় গোপালগঞ্জ সদরে গ্রামের বাড়িতে। মরদেহ পৌঁছানোর পর আজ দুপুরে জানাজা সম্পন্ন হয়। পরে উপজেলার পাইককান্দি উত্তর চরপাড়া নতুন কবরস্থানে দাফন করা হয়।

ধরাছোঁয়ার বাইরে মূল অভিযুক্ত

হত্যার ঘটনার পর থেকে অভিযুক্ত ফোরকান মিয়া পলাতক। তিনি গোপালগঞ্জ সদর উপজেলার মেরি গোপীনাথপুর গ্রামের মো. আতিয়ার হাসান মোল্লার ছেলে।

কাপাসিয়ার ওই গ্রামের বাসিন্দা শ্রাবণী ডেইলি স্টারকে বলেন, 'ফোরকান তার স্ত্রীকে মুখে স্কচটেপ লাগিয়ে হত্যা করে ঝুলিয়ে রেখেছিল। কী ভয়াবহ ঘটনা।'

নিহত শারমিনের বাবা শাহাদাত হোসেন সাংবাদিকদের বলেন, ‘ঘটনার আগের রাতে শারমিন ফোন করে জানায়, ২৪ মে চলে আসবে। পরদিন সকালে শারমিনের বাসার খোঁজ নিতে বলেন ফোরকানের ভাই জব্বার মোল্লা। খোঁজ নিয়ে জানতে পারি পুরো পরিবার শেষ হয়ে গেছে। আমি এই হত্যাকাণ্ডে জড়িত সবাইকে গ্রেপ্তার ও সর্বোচ্চ শাস্তি চাই।’  

পুলিশের প্রাথমিক তদন্ত অনুযায়ী, গৃহকর্তা ফোরকান মিয়া ৫ জনকে গলা কেটে হত্যা করেছেন। পারিবারিক কলহের জেরে এ হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হতে পারে।

যোগাযোগ করা হলে কাপাসিয়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোহাম্মদ শাহীনুর আলম রোববার রাতে ডেইলি স্টারকে বলেন, 'এখন পর্যন্ত অভিযুক্ত ফোরকানকে গ্রেপ্তার করা সম্ভব হয়নি। পুলিশ সর্বোচ্চ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে।'

অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (কাপাসিয়া-কালীগঞ্জ সার্কেল) আসাদুজ্জামান বলেন, 'ফোরকান কীভাবে একসঙ্গে ৫ জনকে হত্যা করল খতিয়ে দেখা হচ্ছে। নিহতদের ঘুমের ওষুধ বা নেশাজাতীয় কিছু খাওয়ানো হয়েছিল কি না, সেটিও তদন্ত করে দেখা হচ্ছে।'

জেলা পুলিশ সুপার মো. শরীফ উদ্দীন জানান, মূল অভিযুক্তকে গ্রেপ্তার করা না হলেও হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় ২ জনকে আটক করে জিজ্ঞাসাবাদ চলছে।