গোপালগঞ্জে নির্বাচনী বরাদ্দে অনিয়মের অভিযোগ, বঞ্চিত প্রিসাইডিং কর্মকর্তারা

নিজস্ব সংবাদদাতা, গোপালগঞ্জ

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে গোপালগঞ্জ সদর ও কোটালীপাড়া উপজেলায় নির্বাচন পরিচালনার জন্য বরাদ্দ দেওয়া টাকা সঠিকভাবে বণ্টন হয়নি বলে অভিযোগ প্রিসাইডিং কর্মকর্তাদের।

বুথ তৈরির খরচ, যাতায়াত ভাতা ও অন্যান্য ব্যয়ের ক্ষেত্রে অর্থ বরাদ্দে অসামঞ্জস্য ছিল বলে দাবি করেছেন প্রিসাইডিং কর্মকর্তাদের অনেকে।

তারা জানান, গোপালগঞ্জ সদর উপজেলার ১১৮টি কেন্দ্রের ৬০১ বুথের প্রতিটি বুথ নির্মাণ বরাদ্দ থেকে প্রায় ৮৫০ টাকা কেটে একটি করে কালো কাপড় দেওয়া হয়েছে।

অন্যদিকে, কোটালীপাড়া উপজেলার ৭৭টি কেন্দ্রের ৪১৭ বুথের অনেক জায়গায় বুথ নির্মাণ খরচের টাকা দেওয়া হয়নি।

এছাড়া সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের যাতায়াত ভাতা থেকেও ২০০ টাকা করে কেটে নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে।

এ বিষয়ে সহকারী রিটার্নিং কর্মকর্তা পরিচালিত হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপে প্রিসাইডিং কর্মকর্তারা একাধিকবার অভিযোগ জানালেও কোনো জবাব পাওয়া যায়নি।

এছাড়া নির্বাচনের দিন দায়িত্ব শেষে মালামাল বুঝিয়ে দেওয়ার সময় বুথ নির্মাণের পুরো টাকা না দিয়েও ভাউচারে সই নেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছেন গোপালগঞ্জ সদর উপজেলার প্রিসাইডিং কর্মকর্তারা।

দুই উপজেলার অন্তত ১১ জন প্রিসাইডিং কর্মকর্তা একই ধরনের অভিযোগের কথা জানিয়েছেন।

পাশের জেলাগুলোতে অর্থ বরাদ্দ সঠিক ছিল বলেও দাবি করেন তারা।

গোপালগঞ্জ সরকারি কলেজের সহকারী অধ্যাপক ও গোপালগঞ্জ সদর উপজেলার সানপুকুরিয়া কেন্দ্রের প্রিসাইডিং কর্মকর্তা হাসান ইমাম দ্য ডেইলি স্টারকে বলেন, 'আমার কেন্দ্রের ৪টি বুথের জন্য সরকারি বরাদ্দ ছিল ৪ হাজার ৮০০ টাকা। আমি বরাদ্দ পেয়েছি মাত্র ১ হাজার ৪৯০ টাকা ও ৪টি কালো কাপড়। ভাউচারে ৪ হাজার ৮০০ টাকা উল্লেখ করে সই দিতে বলা হয়েছিল। আমি ১ হাজার ৪৯০ টাকা লিখে সই করেছি।'

এছাড়া যাতায়াত ভাতা থেকেও ২০ শতাংশ ভ্যাট-ট্যাক্স কেটে রাখা হয়েছে বলে অভিযোগ করেন তিনি।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক গোপালগঞ্জ সদর উপজেলার এক প্রিসাইডিং অফিসার ডেইলি স্টারকে জানান, তার ৬টি বুথের ৭ হাজার ২০০ টাকা বরাদ্দের মাত্র ১ হাজার ৯১০ টাকা তিনি হাতে পেয়েছেন। এছাড়া পেয়েছেন ৬টি কালো কাপড়।

তিনি জানান, এ বিষয়ে সহকারী রিটার্নিং কর্মকর্তার দৃষ্টি আকর্ষণ করার জন্য হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপে বার্তা দিলে তা মুছে ফেলা হয়।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে গোপালগঞ্জ সদর উপজেলার নির্বাহী কর্মকর্তা ও সহকারী রিটার্নিং অফিসার কৌশিক আহমেদ সরাসরি কোনো মন্তব্য করেননি। তিনি ডেইলি স্টারকে বলেন, 'প্রিসাইডিং অফিসারদের নিয়ে এলে তাদের সামনেই প্রশ্নের উত্তর দেওয়া হবে।'

কোটালিপাড়া আদর্শ সরকারি কলেজের সহকারী অধ্যাপক ও কোটালীপাড়া উপজেলার একটি কেন্দ্রের প্রিসাইডিং অফিসার বলেন, 'আমার ৪টি বুথ নির্মাণের জন্য কোনো টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়নি। বুথ নির্মাণের জন্য শুধু কাপড় সরবরাহ করা হয়েছে। কিন্তু দড়ি, সুতাসহ অন্যান্য প্রয়োজনীয় সামগ্রী দেওয়া হয়নি। নিজ উদ্যোগে এসব জোগাড় করতে হয়েছে।'

তিনি আরও বলেন, 'যাতায়াত ভাতা ১ হাজার টাকার পরিবর্তে ৮০০ টাকা দেওয়া হয়েছে। এছাড়া মালামাল গ্রহণের সময় ১ হাজার ৫০০ টাকা অতিরিক্ত কেটে রাখা হয়েছিল, যা পরে ফেরত দেওয়া হলেও কোনো ব্যাখ্যা দেওয়া হয়নি।'

বিষয়টি নিয়ে জানতে চাইলে কোটালীপাড়া উপজেলার সহকারী রিটার্নিং অফিসার ও উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সাগুপ্তা হক ডেইলি স্টারকে বলেন, 'বুথ খরচের পুরো বরাদ্দ প্রিসাইডিং অফিসারদের দেওয়া হয়েছে। কালো কাপড় সরকারি বরাদ্দ থেকে সমন্বয় করে সরবরাহ করা হয়েছে এবং বাকি টাকা সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের হাতে দেওয়া হয়েছে। যাতায়াত ভাতার ক্ষেত্রেও সরকারি বিধি অনুযায়ী ভ্যাট-ট্যাক্স কেটে বাকি টাকা দেওয়া হয়েছে।'

অন্যদিকে, গোপালগঞ্জের কাশিয়ানী উপজেলায় প্রতিটি বুথ নির্মাণের জন্য ১ হাজার টাকা দেওয়া হয়েছে বলে প্রিসাইডিং কর্মকর্তারা জানিয়েছেন।

কাশিয়ানী উপজেলার সহকারী রিটার্নিং অফিসার ও নির্বাহী কর্মকর্তা শাহিন মিয়া ডেইলি স্টারকে বলেন, 'আমাদের উপজেলায় প্রিসাইডিং অফিসারদের সরকার নির্ধারিত বরাদ্দ অনুযায়ী বিতরণ করা হয়েছে। অতিরিক্ত কোনো খরচ করা হয়নি। যাতায়াত ভাতার ১০০০ টাকা থেকে ভ্যাট-ট্যাক্স কেটে রেখেছে জেলা থেকে।'

এ বিষয়ে জানতে চাইলে গোপালগঞ্জ জেলা রিটার্নিং কর্মকর্তা ও জেলা প্রশাসক মো. আরিফ-উজ-জামান ডেইলি স্টারকে বলেন, 'নির্বাচন সংক্রান্ত ব্যয়ের জন্য বরাদ্দ সব টাকা আমরা সহকারী রিটার্নিং কর্মকর্তাদের কাছে হস্তান্তর করেছি। আমাদের পক্ষ থেকে কোনো টাকা কেটে রাখা হয়নি।'