অপারেশন সার্চলাইট: ৫৫ বছর পরও দগদগে সেই ক্ষত
১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ রাত—বাংলাদেশের জনস্মৃতিতে এক রক্তাক্ত ক্ষত হয়ে আছে ‘কালরাত্রি’ হিসেবে। এই রাতেই পাকিস্তানি সামরিক জান্তা নিরস্ত্র বাঙালির ওপর ‘অপারেশন সার্চলাইট’ নামক যে বর্বরোচিত নিধনযজ্ঞ চালিয়েছিল, তা ছিল এ জাতির ইতিহাসের অন্যতম অন্ধকার অধ্যায়ের সূচনা।
অন্ধকার নামার সাথে সাথেই ঢাকার রাজপথে ট্যাঙ্কের গর্জন আর চারদিকে নির্বিচারে গুলিবর্ষণ শুরু হয়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, পিলখানা, রাজারবাগ পুলিশ লাইনস ও পুরান ঢাকার হিন্দু-অধ্যুষিত এলাকাগুলোতে পরিকল্পিতভাবে হামলা চালানো হয়। বিশেষ করে বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রাবাসগুলো পরিণত হয় একেকটি বধ্যভূমিতে, যেখানে শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের বড় একটি অংশকে প্রাণ দিতে হয়।
১৯৭০ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগের নিরঙ্কুশ জয়ের পর বাঙালির স্বাধিকার আন্দোলনকে চিরতরে স্তব্ধ করে দেওয়াই ছিল এই অভিযানের মূল লক্ষ্য। দ্রুতই এই নৃশংসতা ছড়িয়ে পড়ে দেশের অন্যান্য প্রান্তে। লক্ষ্যবস্তু করা হয় সাধারণ বেসামরিক মানুষ, ছাত্র, বুদ্ধিজীবী ও বাঙালি নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যদের।
প্রত্যক্ষদর্শীদের বর্ণনা ও ঐতিহাসিক গবেষণা অনুযায়ী, কেবল সেই রাতেই কয়েক হাজার নিরস্ত্র মানুষকে হত্যা করা হয়। জ্বালিয়ে দেওয়া হয় সাধারণ মানুষের ঘরবাড়ি, ধুলোয় মিশিয়ে দেওয়া হয় আস্ত জনপদ। এই পৈশাচিকতার তীব্রতা বিশ্ববিবেককে স্তম্ভিত করে দিয়েছিল।
দীর্ঘ সংগ্রামের সূতিকাগার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছিল পাকিস্তানি বাহিনীর বিশেষ আক্রোশের কেন্দ্রবিন্দু। ট্যাঙ্ক, অটোমেটিক রাইফেল, রকেট লঞ্চার ও ভারী মর্টারে সজ্জিত হয়ে সেনারা তিন দিক থেকে ক্যাম্পাস ঘিরে ফেলে। তারা তৎকালীন ইকবাল হলে (বর্তমান শহীদ সার্জেন্ট জহুরুল হক হল) হামলা চালায়, কারণ সেখান থেকেই ‘স্বাধীন বাংলাদেশ ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ’-এর ব্যানারে অসহযোগ আন্দোলন পরিচালিত হচ্ছিল।
মধ্যরাতের পর সেনারা সংখ্যালঘু ছাত্রদের আবাসস্থল জগন্নাথ হলে মর্টার ও অবিরাম গুলিবর্ষণ শুরু করে। উত্তর ও দক্ষিণ গেট দিয়ে ঢুকে প্রতিটি কক্ষে তল্লাশি চালিয়ে শিক্ষার্থীদের হত্যা করা হয়। সেখানে প্রায় ৩৪ জন ছাত্র প্রাণ হারান।
বাঙালি পুলিশ ও ইপিআর সদস্যরা যাতে পাল্টা আঘাত হানতে না পারেন, সেজন্য পিলখানা, রাজারবাগ পুলিশ লাইনস ও খিলগাঁও আনসার সদর দপ্তরেও একযোগে হামলা চালানো হয়। ওই রাতেই স্বাধীনতা আন্দোলনের নেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে গ্রেপ্তার করে নিয়ে যাওয়া হয় পশ্চিম পাকিস্তানে, যেখানে তিনি দীর্ঘ নয় মাস বন্দি থাকেন।
২৫ মার্চের এই নারকীয় হত্যাকাণ্ডকেই ১৯৭১ সালের গণহত্যার সূচনা হিসেবে গণ্য করা হয়, যা শেষ পর্যন্ত দীর্ঘ নয় মাসের রক্তক্ষয়ী মুক্তিযুদ্ধকে ত্বরান্বিত করে। ১৬ ডিসেম্বর রেসকোর্স ময়দানে (বর্তমান সোহরাওয়ার্দী উদ্যান) পাকিস্তানি বাহিনীর আত্মসমর্পণের মধ্য দিয়ে বিশ্বের মানচিত্রে স্বাধীন বাংলাদেশের অভ্যুদয় ঘটে।
২০১৭ সালে ২৫ মার্চকে রাষ্ট্রীয়ভাবে ‘গণহত্যা দিবস’ হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়। দিবসটি উপলক্ষে পৃথক বাণী দিয়েছেন রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।
রাষ্ট্রপতি তার বাণীতে দল-মত নির্বিশেষে সবাইকে দেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ হয়ে শহীদদের স্বপ্ন পূরণে কাজ করার আহ্বান জানান। তিনি বলেন, মুক্তিযুদ্ধের শহীদদের স্বপ্ন ছিল একটি মানবিক ও গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র গঠন করা, যেখানে বৈষম্য বা শোষণের ঠাঁই থাকবে না।
তিনি আরও উল্লেখ করেন যে, কালুরঘাট বেতার কেন্দ্র থেকে তৎকালীন মেজর জিয়াউর রহমানের স্বাধীনতার ঘোষণা দিশেহারা জাতিকে ঐক্যবদ্ধ ও সাহসী করে তুলেছিল।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ২৫ মার্চকে ইতিহাসের অন্যতম কলঙ্কিত দিন হিসেবে বর্ণনা করে বলেন, এই গণহত্যা ছিল এক সুপরিকল্পিত হত্যাযজ্ঞ।
তৎকালীন রাজনৈতিক নেতৃত্বের ভূমিকা নিয়ে ঐতিহাসিক গবেষণার প্রয়োজনীয়তা উল্লেখ করে তিনি জানান, চট্টগ্রামের অষ্টম ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্ট ‘উই রিভোল্ট’ বলে আনুষ্ঠানিকভাবে সশস্ত্র প্রতিরোধ শুরু করেছিল। তিনি সাম্য, মানবিক মর্যাদা ও সামাজিক ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে একটি সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়ার প্রত্যয় ব্যক্ত করেন।
দিবসটি পালনে সরকারিভাবে নেওয়া হয়েছে নানা কর্মসূচি। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে স্মৃতিচারণ ও আলোচনা সভার পাশাপাশি সিটি করপোরেশনগুলোতে প্রামাণ্যচিত্র ও আলোকচিত্র প্রদর্শনীর আয়োজন করা হয়েছে।
আজ বুধবার জোহরের নামাজের পর সব উপাসনালয়ে বিশেষ প্রার্থনা করা হবে। এছাড়া প্রতীকী কালরাত্রি পালনের অংশ হিসেবে রাতে কোনো আলোকসজ্জা করা হবে না।