হারানো ঐশ্বর্যের মায়ায় বয়ে চলা নগরের ১৪৪ বছর
ভৈরব আর রূপসার বুকে ভর করে একসময় যে শহরটি মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়েছিল, সেই খুলনা আজও আছে—তবে বদলে গেছে তার চেহারা, ভঙ্গি, পরিচয়।
একসময় দেশের তৃতীয় বৃহত্তম নগর, ‘শিল্পশহর’ নামে পরিচিত খুলনা অনেক আগেই হারিয়েছে তার সেই গৌরবময় উপাধি। শহরের বুকজুড়ে জালের মতো ছড়িয়ে থাকা ৫০টির বেশি খাল আজ মৃত কিংবা মুমূর্ষু।
যে সবুজ একসময় এই নগরকে ঘিরে রাখত নিবিড় আবরণে, তা এখন অনেকটাই ফিকে। নাগরিক সুবিধার ঘাটতি স্পষ্ট, উন্নয়নের চাপে কোথাও কোথাও যেন ক্লান্ত এই শহর।
তবু খুলনা নিঃশেষ হয়ে যায়নি। এই ‘আত্মঘাতী উন্নয়নের’ সময়ে দাঁড়িয়েও বাসযোগ্যতার প্রশ্নে খুলনার মতো শহর খুঁজে পাওয়া কঠিন। এখানে এখনো বুক ভরে শ্বাস নেওয়া যায়, নদী-খালে এখনো মাছের প্রাচুর্য, আর আছে এক অদ্ভুত মায়া—যা এই শহরকে আলাদা করে দেয় অন্য শরহগুলো থেকে।
২৫ এপ্রিল খুলনার ১৪৪তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী। ১৮৮২ সালের এই দিনে যশোর জেলার খুলনা ও বাগেরহাট এবং চব্বিশ পরগনা জেলার সাতক্ষীরা মহকুমা নিয়ে গঠিত হয় খুলনা জেলা। সেই সূচনালগ্ন থেকে আজকের বিস্তৃত নগর—খুলনার পথচলা এক দীর্ঘ ইতিহাসের সাক্ষ্য বহন করে।
ঢাকা ও চট্টগ্রামের পর দেশের তৃতীয় বৃহত্তম শহর হিসেবে গড়ে ওঠা এই জনপদের ইতিহাস যেমন সমৃদ্ধ, তেমনি বহুমাত্রিক ও বর্ণিল।
একসময় এই অঞ্চল ছিল সুন্দরবনেরই অংশ। ঘন অরণ্য কেটে ধীরে ধীরে গড়ে ওঠে বসতি। সেই বসতির বিস্তারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন সুফি সাধক হজরত খানজাহান আলী (রহ.)। তার তত্ত্বাবধানে বাগেরহাট ও আশপাশের এলাকায় গড়ে ওঠে জনবসতি, যার নাম ছিল খলিফাতাবাদ।
ইংরেজ শাসনামলে খুলনা পেতে শুরু করে প্রশাসনিক গুরুত্ব। ১৮৪২ সালে যশোর জেলার প্রথম মহকুমা হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে খুলনা—যা ছিল তৎকালীন বাংলার প্রথম মহকুমা। এর প্রথম ম্যাজিস্ট্রেট ছিলেন সাহিত্য সম্রাট বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়। ভৈরবের পূর্বপাড়ে তিনি গড়ে তোলেন তার কার্যালয় ও বাসভবন, যা আজও জেলা প্রশাসকের বাংলো হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে।
পরবর্তীতে ১৮৬১ সালে সাতক্ষীরা ও ১৮৬৩ সালে বাগেরহাট মহকুমা প্রতিষ্ঠিত হয়। ১৮৮২ সালের ২৫ এপ্রিল খুলনা জেলা ঘোষণার পর ১ জুন থেকে এর কার্যক্রম শুরু হয় এবং খুলনাকেই করা হয় জেলা সদর। সেসময় খুলনার জনসংখ্যা ছিল মাত্র ৪৩ হাজার ৫০০ জন, আয়তন ছিল ৪ হাজার ৬৩০ বর্গমাইল। প্রথম জেলা ম্যাজিস্ট্রেট ছিলেন ব্রিটিশ কর্মকর্তা ডব্লিউ এম ক্লে।
১৮৮৪ সালে গঠিত হয় খুলনা পৌরসভা, যা ১৯৮৪ সালে সিটি করপোরেশনে উন্নীত হয়। প্রথম চেয়ারম্যান ছিলেন রেভারেন্ড গাগন চন্দ্র দত্ত। ১৯১৩ সালে মধুমতী নদীকে সীমারেখা ধরে জেলার সীমানা পুনর্নির্ধারণ করা হয়।
খুলনা নামের উৎপত্তি নিয়েও রয়েছে নানা মত। কেউ বলেন খুলনেশ্বরী মন্দির থেকে, কেউ বলেন ‘কিসমত খুলনা’ মৌজা থেকে, আবার কেউ মনে করেন ১৭৬৬ সালের একটি ব্রিটিশ রেকর্ডে উল্লেখিত ‘Culnea’ শব্দ থেকেই এসেছে এই নাম।
একসময় ভৈরব-রূপসার তীরঘেঁষা সরু এক শহর ছিল খুলনা। আজ তা অনেক দূর বিস্তৃত। পুরোনো স্থাপত্যের পাশে দাঁড়িয়েছে আধুনিক বহুতল ভবন। মির্জাপুর মাঠসংলগ্ন এলাকা থেকে প্রশাসনিক কেন্দ্র গড়ে ওঠার পর টুটপাড়া, বেনেখামারসহ আশপাশের গ্রামগুলোকে ঘিরেই শুরু হয় নগর বিস্তার। তখনকার বসতি ছিল খোলামেলা—পুকুর, বাগান, খোলা জায়গা নিয়ে গড়ে উঠত একেকটি পরিবার। সেই থেকেই গড়ে ওঠে এলাকার নাম, পরিচয়—ফকির বাড়ি, কুণ্ডু বাড়ি, কর্মকার বাড়ির মতো নামগুলো শহরের স্মৃতিতে স্থায়ী হয়ে যায়।
খালিশপুর, দৌলতপুর, মহেশ্বরপাশা—এই এলাকাগুলোতে একসময় ছিল পাটকল, কাগজকল, হার্ডবোর্ড মিল। সুন্দরবনের কাঠনির্ভর খুলনা নিউজপ্রিন্ট মিল ছিল দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম বৃহৎ শিল্পপ্রতিষ্ঠান। হাজার হাজার মানুষের কর্মসংস্থান হয়েছিল এসব শিল্পকে ঘিরে।
শহরের নামেই লুকিয়ে আছে তার অতীত—বাগমারা, হরিণটানা, লবণচরা, বানরগাতী—সবই যেন বলে দেয়, একদিন এখানে ছিল বন, ছিল বন্যতা। পূর্বপুরুষেরা সুন্দরবনের একটি বড় অংশ দখল করে বন কেটে সেখানে বসতি স্থাপন করেন।
ময়লাপোতা মোড় এখনো শহরের এক গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র। একসময় ময়লাপোতা ছিল শহরের শেষ সীমানা। তবে খুলনার সীমানা এখন ছড়িয়ে পড়েছে রূপসা, গল্লামারী, শের-এ-বাংলা রোড ছাড়িয়ে আরও দূরে—কৈয়া বাজার, গুটদিয়া, জলমা, বটিয়াঘাটা, শিরোমণি এবং আরও বহুদূরে।
১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের সময় এই শহর ছিল পাকিস্তানি বাহিনীর দখলে। গল্লামারী, সার্কিট হাউস, রেডিও সেন্টার হয়ে উঠেছিল নির্যাতনের ভয়ংকর কেন্দ্র। ময়লাপোতা থেকে রেডিও সেন্টার পর্যন্ত পথ যেন ছিল মৃত্যুর মিছিল। আজ সেই স্থানগুলো ইতিহাসের সাক্ষ্য হয়ে দাঁড়িয়ে আছে—গল্লামারীর গণকবর, খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাসে ছড়িয়ে থাকা স্মৃতি।
ভৈরব তীরের জেটি ঘিরে গড়ে ওঠা চার, পাঁচ ও ছয় নম্বর ঘাট খুলনার বাণিজ্যিক বিকাশে বড় ভূমিকা রেখেছে। আজও এগুলো শহরবাসীর কাছে প্রিয় অবসরযাপনের স্থান।
তবে স্বাধীনতার পর রাজধানীকেন্দ্রিক উন্নয়নের দৌড়ে খুলনা অনেকটাই পিছিয়ে পড়ে। ষাটের দশকে ঘোষিত খুলনা-মোংলা রেলপথ প্রকল্প দীর্ঘদিন আলোর মুখ দেখেনি। অবশেষে গত বছর চালু হলেও এখন দিনে মাত্র একটি ট্রেন চলে।
দেশে পাটশিল্পের পতনের সঙ্গে সঙ্গে নিভে যায় খুলনার অর্থনীতির বড় একটি অংশ। খালিশপুর, দৌলতপুর, প্লাটিনাম জুট মিলসহ একের পর এক শিল্পপ্রতিষ্ঠান বন্ধ হয়ে যায়।
নিউজপ্রিন্ট মিল, হার্ডবোর্ড মিল, দাদা ম্যাচ ফ্যাক্টরিও হারিয়ে যায় সময়ের স্রোতে। শ্রমিকদের কণ্ঠ স্তব্ধ হয়ে আসে, রেখে যায় দীর্ঘশ্বাস।
দৌলতপুর-খালিশপুরের এই অংশ এখন যেন এক মৃত নগরী। চারিদিকে শুধু হাহাকার। ঐতিহ্যবাহী এসব পাটকলের কলোনিগুলো এখন জনশূন্য। শুধু কঙ্কালের মতো দাঁড়িয়ে আছে ইটের তৈরি রঙচটা কিছু ভবন।
তবু আশার আলো নিভে যায়নি। গত এক দশকে খুলনায় আবাসন খাতে বিনিয়োগ বেড়েছে। গড়ে উঠছে নতুন ভবন, উন্নত হচ্ছে অবকাঠামো। পদ্মা সেতু দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের সঙ্গে ঢাকার যোগাযোগকে আরও দৃঢ় করেছে। ঢাকা শহর থেকে খুলনায় যেতে এখন সময় লাগে সাড়ে তিন থেকে চার ঘণ্টা। শুরু হয়েছে উন্নত রেল যোগাযোগ।
রাষ্ট্র এখন এই অঞ্চলকে নিয়ে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা নিয়ে এগোচ্ছে। জ্বালানি, যোগাযোগ ও আন্তর্জাতিক বাণিজ্যপথে খুলনা আবার গুরুত্ব পাচ্ছে।
যদি এই ধারাবাহিকতা বজায় থাকে, যদি পরিকল্পনা বাস্তবায়নে আন্তরিকতা থাকে, তবে খুব দূরের ভবিষ্যৎ নয়—খুলনা আবার উঠে দাঁড়াতে পারে। শুধু দেশের নয়, দক্ষিণ এশিয়ারও গুরুত্বপূর্ণ নগরী হিসেবে।
১৪৪ বছরে দাঁড়িয়ে খুলনা যেন এক দ্বৈত গল্প—হারানোর, আবার ফিরে পাওয়ার। ক্লান্তির ভেতরেও যার আছে এক অদম্য প্রাণ, আর গভীরে জমে থাকা অমলিন মায়া।