২১ দিনে ছেড়ে চলে যান মা, পিটুনিতে নিহত বাবা, শিশু মুসলিমার অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ
জন্মের ২১ দিনের মাথায় মুসলিমা ইসলামকে ছেড়ে চলে যান মা। তার একমাত্র ভরসা ছিল বাবা হান্নান শেখ। গত শুক্রবার তিনিও নিহত হন। ২ বছর বয়সে এসে মুসলিমার আর কেউ রইল না। শোকের পাশাপাশি মুসলিমার ভবিষ্যৎ নিয়ে চিন্তায় পরিবার।
পেশায় ট্রাকচালক হান্নান শেখ (৪৫) ফরিদপুরের বোয়ালমারী উপজেলার সাতৈর গ্রামের শহিদ শেখের ছেলে ছিলেন।
গতকাল শনিবার দুপুরে হান্নানের বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, উঠানে মানুষের ভিড়। ঘরের একপাশে নির্বাক হয়ে বসে আছেন বৃদ্ধ বাবা শহিদ শেখ। আর বারবার কান্নায় ভেঙে পড়ছেন মা নার্গিস বেগম। তাদের একটাই প্রশ্ন—মুসলিমার কী হবে?
পরিবারের সদস্যরা জানান, মুসলিমার জন্মের মাত্র ২১ দিন পর তার মা আরিফা বেগম স্বামীকে ডিভোর্স দিয়ে অন্যত্র চলে যান। এরপর থেকে দাদা-দাদিই তাকে বড় করে তুলছিলেন। ট্রাক চালিয়ে হান্নান যা আয় করতেন, তা দিয়েই কোনো রকমে চলত সংসার।
নগরকান্দা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) গোলাম রসুল সামদানী আজাদ দ্য ডেইলি স্টারকে বলেন, শুক্রবার রাত ১০টার দিকে নগরকান্দা উপজেলার তালমা ইউনিয়নের বিলনালিয়া নতুন হাটখোলা এলাকায় গণপিটুনিতে নিহত হন হান্নান। এর আগে সালথা উপজেলার বালিয়াগট্টি এলাকায় হান্নানের ট্রাকের ধাক্কায় ৩ পথচারী সামান্য আহত হন।
তিনি বলেন, এরপর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ‘২০ জনকে চাপা দিয়ে ট্রাক পালিয়ে যাচ্ছে’ এমন গুজব ছড়িয়ে পড়ে। ফেসবুকে লাইভ করে ট্রাকটির পিছু নেওয়া হয়। একপর্যায়ে স্থানীয় লোকজন সড়কে ট্রাকটি থামায়। পরে হান্নান ও তার ২ সহকারীকে ট্রাক থেকে নামিয়ে মারধর করা হয়।
ওসি আজাদ বলেন, গুরুতর আহত অবস্থায় তাদের ফরিদপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হলে চিকিৎসক হান্নানকে মৃত ঘোষণা করেন। আহত দুই হেলপার নাঈম (২২) ও আল-আমিন (২৫) হাসপাতালে চিকিৎসাধীন।
হান্নানের মা নার্গিস বেগম ডেইলি স্টারকে বলেন, ‘মা জন্মের পরই চলে গেছে, এখন বাপও নাই। এই বাচ্চাটারে কে দেখবে? আমরা তো বুড়া মানুষ।’
বাবা শহিদ শেখ বলেন, ‘আমার ছেলে যদি ভুল করেও থাকে, তাকে পুলিশের হাতে দেওয়া যেতো। কিন্তু গুজব ছড়িয়ে এভাবে মেরে ফেলল? এখন আমার নাতনিটার ভবিষ্যৎ কী হবে?’
স্থানীয়রা জানান, সালথা উপজেলার রসুলপুর এলাকার নাজমুল মাতুব্বর তার ফেসবুকে ‘ট্রাকটি ২০ জন পথচারীকে চাপা দিয়ে পালিয়ে যাচ্ছে’ ক্যাপশন লিখে লাইভ করেন।
ভিডিওতে দেখা যায়, একটি মোটরসাইকেলে নাজমুল ট্রাকটিকে ধাওয়া করচ্ছেন।
সেসময় তার ভিডিও দেখে আশপাশের লোকজন রাস্তায় বালুর বস্তা ফেলে ট্রাকটি আটকায়।
নগরকান্দা উপজেলার তালমা ইউনিয়নের চেয়ারম্যান কামাল হোসেন মিয়া ডেইলি স্টারকে বলেন, গ্রাম পুলিশ নুরুল ইসলামের কাছ থেকে খবর পেয়ে আমি দ্রুত ঘটনাস্থলে যাই। সেখানে দেখি তিনজনকে গণপিটুনি দেওয়া হচ্ছে। আমি ২ সহযোগীকে উদ্ধার করে স্থানীয় একটি মসজিদে নিয়ে রাখি। পরে পুলিশ এসে তিনজনকে হাসপাতালে নিয়ে যায়।
ওসি আজাদ বলেন, এ ঘটনায় নিহতের পরিবার মামলা করবে বলে জানিয়েছে। ফেসবুকে ছড়িয়ে পড়া ভিডিও সংগ্রহ করা হয়েছে। মামলা দায়েরের পর এ বিষয়ে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে।