রাজনৈতিক বিবেচনায় দেওয়া লাইসেন্সের অস্ত্র ফেরত নয়: স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে কর্তৃপক্ষ লাইসেন্সভুক্ত যেসব অস্ত্র জমা নিয়েছিল, সেগুলো সব এখনই ফেরত দেওয়া হবে না বলে জানিয়েছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ।
অন্তর্বর্তী সরকারের সময় লাইসেন্সভুক্ত ১০ হাজার অস্ত্র জমা পড়েনি বলেও জানান তিনি।
আজ বুধবার দুপুরে গণমাধ্যমকর্মীদের প্রশ্নের জবাবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী এ কথা জানান। এর আগে তিনি ডিসি কনফারেন্সে অংশ নেন।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ২০০৯ সালের ৬ জানুয়ারির আগে এবং ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পরে ইস্যু করা অস্ত্রগুলো ফেরত শিগগির দিতে চিঠি দেওয়া হয়েছে।
তিনি আরও জানান, ২০০৯ সালের ৬ জানুয়ারি থেকে ২০২৪ সালের আগস্ট পর্যন্ত রাজনৈতিক বিবেচনায় এবং নীতিমালা বহির্ভূতভাবে দেওয়া লাইসেন্স যাচাই-বাছাইয়ের জন্য জেলা পর্যায়ে কমিটি করে দেওয়া হয়েছিল। ‘সেই কমিটির বিবেচনায় যেগুলো নীতিমালা বহির্ভূত এবং রাজনৈতিক বিবেচনায় দেওয়া হয়েছে বলে প্রতীয়মান হয়েছে, সেগুলো বাদে বাকি লাইসেন্সভুক্ত অস্ত্রগুলো ফেরত দেবে,’ বলেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী।
অন্তর্বর্তী সরকারের সময় চিঠি দেওয়ার পরও লাইসেন্সভুক্ত ১০ হাজার অস্ত্র জমা পড়েনি জানিয়ে সালাহউদ্দিন বলেন, ‘এই অস্ত্রগুলো উদ্ধার এবং বাজেয়াপ্ত করার জন্য মামলা করতে আমরা আবার তাদেরকে (জেলা প্রশাসক) অনুরোধ করেছি।’
রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত ও হয়রানিমূলক মামলা প্রত্যাহারে নতুন উদ্যোগ
‘আওয়ামী ফ্যাসিবাদের সময় রাজনৈতিক বিবেচনায় বা হয়রানিমূলক, উদ্দেশ্যপ্রণোদিত, ভুয়া, গায়েবি মামলা দায়ের করা হয়েছিল, সেগুলোর বিষয়ে আমরা আবার একটা পত্র দিয়েছিলাম। অন্তর্বর্তী সরকারের সময় কিছু মামলা প্রত্যাহার করা হয়েছে, কিন্তু সেখানে কিছু শ্রেণির মামলা অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি। যেমন হত্যা মামলা, অস্ত্র মামলা, নারী নির্যাতন, মাদক পাচার, মানব পাচার—এ সমস্ত কিছু মামলা এর আওতাভুক্ত ছিল না।
‘আমরা রাজনৈতিক সরকারের দায়িত্ব নেওয়ার পরে বিবেচনা করেছি যে, আমাদের বিরুদ্ধেও অনেক অস্ত্র মামলা, হত্যা মামলা দেওয়া হয়েছে। এমনকি দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধেও হত্যা মামলা ছিল। অন্তত আমার জানা মতে, দুই-তিনটা...যাত্রাবাড়ী, কুমিল্লাসহ বিভিন্ন জায়গায়। আমার বিরুদ্ধেও একটি মামলা ছিল, অস্ত্র মামলাও ছিল। আমাদের অনেক নেতাদের বিরুদ্ধে মাদক মামলা দেওয়া হয়েছিল। নারী নির্যাতন...যেকোনোভাবে যাতে আটক রাখা যায়।
জেলা পর্যায়ে গঠন করা কমিটি প্রজ্ঞাপন দিয়ে জনসাধারণকে জানিয়েছে, রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত মিথ্যা মামলা থাকলে অভিযোগপত্র বা এফআইআরসহ (প্রাথমিক তথ্য বিবরণী) যথাযথ ফরম পূরণ করে আবেদন করতে হবে। কমিটি যাচাই-বাছাই করে যদি দেখে সেই শ্রেণিভুক্ত মামলা, তারা সেগুলো প্রত্যাহারের সুপারিশ করবে।
‘এগুলো প্রথমে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় আসবে। আমরা তাৎক্ষণিকভাবে এর ওপর কোনো আইনি ব্যবস্থা নেব না। আমরা এটা আইন মন্ত্রণালয়ে পাঠাবো, ওখানে আইনমন্ত্রীর সভাপতিত্বে একটা কমিটি আছে, তারা ভেটিং করে যদি প্রত্যাহারের জন্য উপযুক্ত মনে করে, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে পাঠালে আমরা সিআরপিসির (ফৌজদারি কার্যবিধি) ৪৯৪ অনুসারে প্রত্যাহারের ব্যবস্থা নেব,’ বলেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী।
৫ আগস্টের পরে বৈষম্যবিরোধী আন্দোলন সংশ্লিষ্ট বেশ কিছু মামলা হয়েছে—গণহত্যা এবং আওয়ামী ফ্যাসিবাদী বিভিন্ন মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলা। প্রান্তিক জেলাগুলোতে হয়তো কম, কিন্তু মহানগরগুলোতে সংখ্যা একটু বেশি। অনেক মামলায় হাজার হাজার লোককে আসামি করা হয়েছে। সেগুলো আমরা যাচাই-বাছাই করে দেখব। সত্যিকার অর্থে প্রকৃত আসামি কারা সেটা আইও (তদন্ত কর্মকর্তা) তদন্ত করে দেখব, যাতে স্বল্প সময়ের ভেতরে নিষ্পত্তি করতে পারে।
উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে মামলায় অন্তর্ভুক্ত আসামিদের যাতে নিষ্কৃতি দেয়, সেই সুপারিশ করা হয়েছে বলেও জানান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। তিনি বলেন, ‘তবে এটা আইনানুগভাবেই হবে।’
এক প্রশ্নের জবাবে তিনি জানান, আমরা মৌখিকভাবে জানিয়েছি সর্বোচ্চ এক মাসের মধ্যে পাঠাতে। কোনো ক্ষেত্রে কেউ যদি বিলম্ব করে থাকে, ন্যায় বিচারের স্বার্থে হয়তো আমরা সেটা বিবেচনা করব। আশা করি, যারা মামলা প্রত্যাহার চান, তারা বিলম্ব করবেন না।
কোরবানির পশুর চামড়া সংরক্ষণে সরকার লবণ সরবরাহ করবে
আসন্ন ঈদুল আজহায় কোরবানির পশুর চামড়া এক সপ্তাহ সংরক্ষণে বিনা মূল্যে লবণ সরবরাহ করা হবে বলেও জানান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। তিনি আরও বলেন, ‘সাত দিন পরে পর্যায়ক্রমে ঢাকা ও মহানগরগুলো যেখানে ট্যানারি আছে, সেখানে যেন আনা যায়।’
পুশইনের শঙ্কা প্রসঙ্গে
ভারতের পশ্চিমবঙ্গে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর পুশইনের শঙ্কা বাড়বে কি না জানতে চাইলে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী গণমাধ্যমকর্মীদের বলেন, ‘আমরা গতকাল বিজিবিকে (বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ) নির্দেশ দিয়েছি, যাতে বর্ডারগুলোতে তারা একটু অ্যালার্ট থাকে। সেই রকমের সম্ভাবনা দেখি না। যদি হয়, যাতে অ্যাড্রেস করতে পারে, সে জন্য আমরা আগে থেকে সতর্কতা অবলম্বন করেছি। তবে আমার মনে হয় সে রকম কোনো ঘটনা ঘটবে না।’
অনলাইন জুয়া বন্ধে হবে আইন
অপরাধ দমনে পুলিশ নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করছে জানিয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ‘এ বিষয়ে আমরা শূন্য সহিষ্ণু নীতি এই জন্যই ঘোষণা করেছি যে, মাদক ও বিশেষ করে অনলাইন জুয়া বন্ধ না করতে পারলে সমাজের ভারসাম্য নষ্ট হয়ে যাবে।’
অনলাইন জুয়ার অ্যাপস প্রকাশ্যে দেখা যাচ্ছে—দৃষ্টি আকর্ষণ করলে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ‘ইন্টারনেটভিত্তিক প্রযুক্তির এই দুনিয়াতে আমরা যতই এগিয়ে যাচ্ছি, অপরাধের ধরনটাও বিভিন্নভাবে রূপ পাল্টাচ্ছে। সে জন্য আমরা এগুলোকে অ্যাড্রেস করার জন্য একটা আইন প্রণয়নের ব্যবস্থাও গ্রহণ করব।’
আইন প্রণয়নে ইতোমধ্যে কমিটি করা হয়েছে জানিয়ে সালাহউদ্দিন আরও বলেন, ‘এর আগ পর্যন্ত আমরা যেভাবে পারি, সেই সাইটগুলোকে ব্লক করার চেষ্টা করছি।’
‘এসব অপরাধগুলো তো আগে এত বিস্তৃত ছিল না। সে জন্য হয়তো আগের সরকারগুলো এভাবে অ্যাড্রেস করেনি। এখন জুয়া, অনলাইন জুয়া, মাদক—এগুলো আমাদের অগ্রাধিকার, এগুলো বন্ধ করতেই হবে,’ যোগ করেন তিনি।