বিপৎসীমার ২৩ সেমি ওপরে দুধুকুমারের পানি, ‘২-৩ দিনের মধ্যে ধরলা তীরবর্তী এলাকায় বন্যার আশঙ্কা’

এস দিলীপ রায়
এস দিলীপ রায়

উজানের পাহাড়ি ঢল ও টানা বৃষ্টিপাতের প্রভাবে লালমনিরহাট ও কুড়িগ্রামের নদ-নদীর পানি দ্রুত বৃদ্ধি পাচ্ছে। কুড়িগ্রামে দুধকুমার নদের পানি ইতোমধ্যে বিপৎসীমা অতিক্রম করেছে। লালমনিরহাটে তিস্তা নদীর পানি গতকাল রোববার রাত পর্যন্ত বিপৎসীমার ৭ সেন্টিমিটার ওপরে থাকলেও আজ সকালে কমে বিপৎসীমার ২ সেন্টিমিটার নিচ দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে।

পানি বৃদ্ধি অব্যাহত থাকায় তিস্তা ও দুধকুমার তীরবর্তী চরাঞ্চল ও নিম্নাঞ্চলে বন্যার শঙ্কা কাটেনি। নদ-নদীর পানি বৃদ্ধি পাওয়ায় দুই জেলার বিস্তীর্ণ চরাঞ্চল ও নদীতীরবর্তী নিম্নভূমি প্লাবিত হয়েছে। অনেক এলাকায় বাড়িঘরে পানি ঢুকেছে। ভাঙনের ঝুঁকিও বেড়েছে। তিস্তার তীব্র স্রোতে লালমনিরহাটের কালীগঞ্জ উপজেলার একটি গ্রামীণ সড়ক ধসে পড়েছে। এতে অন্তত তিন হাজারের বেশি মানুষের যোগাযোগ ব্যবস্থা ব্যাহত হয়েছে।

পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) সূত্রে জানা গেছে, আজ সকাল ৯টায় লালমনিরহাটের হাতীবান্ধা উপজেলার ডালিয়া তিস্তা ব্যারেজ পয়েন্টে তিস্তার পানি বিপৎসীমার (৫২ দশমিক ১৫ মিটার) ২ সেন্টিমিটার নিচ দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছিল। এর আগে গতকাল সন্ধ্যা ৬টা থেকে রাত ১২টা পর্যন্ত নদীর পানি বিপৎসীমার ৭ সেন্টিমিটার ওপরে ছিল। মাত্র ৯ ঘণ্টার ব্যবধানে পানি ৯ সেন্টিমিটার কমলেও পরিস্থিতি এখনো উদ্বেগজনক।

একই সময়ে কুড়িগ্রামের নাগেশ্বরী উপজেলার পাটেশ্বরী পয়েন্টে দুধকুমার নদের পানি বিপৎসীমার ২৩ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছিল। ব্রহ্মপুত্র, ধরলা, জিনজিরাম ও গঙ্গাধরসহ অন্যান্য নদ-নদীর পানি এখনো বিপৎসীমার নিচে থাকলেও সবগুলো নদীতেই পানি বাড়ছে।

লালমনিরহাট পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী শুনীল কুমার বলেন, গতকাল দুপুর থেকে তিস্তার পানি দ্রুত বাড়তে শুরু করে এবং সন্ধ্যায় বিপৎসীমা অতিক্রম করে। উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলের চাপ সামাল দিতে তিস্তা ব্যারেজের ৪৪টি জলকপাট খুলে দেওয়া হয়েছে। এতে ব্যারেজের ভাটির অংশে পানির প্রবাহ আরও বেড়েছে।

তিনি বলেন, ‘উজানের ঢল ও বৃষ্টিপাত অব্যাহত রয়েছে। এতে তিস্তা তীরবর্তী এলাকায় বন্যা পরিস্থিতি সৃষ্টি হতে পারে। পাশাপাশি ধরলা নদীর পানিও দ্রুত বাড়ছে। আগামী দুই থেকে তিন দিনের মধ্যে ধরলা তীরবর্তী এলাকাতেও বন্যার আশঙ্কা রয়েছে।’

কুড়িগ্রাম পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী রাকিবুল হাসান বলেন, ‘দুধকুমার নদের পানি ইতোমধ্যে বিপৎসীমা অতিক্রম করেছে। যদিও জেলার অন্যান্য নদ-নদীর পানি এখনো বিপৎসীমার নিচে রয়েছে। তবে উজানের ঢল ও ভারী বর্ষণের কারণে সেগুলোর পানিও দ্রুত বাড়ছে। পরিস্থিতি অব্যাহত থাকলে দুধকুমার তীরবর্তী এলাকায় বন্যা আরও বিস্তৃত হতে পারে।’

লালমনিরহাটের হাতীবান্ধা উপজেলার ডাউয়াবাড়ী ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মশিউর রহমান বলেন, ‘গতকাল রাতে তিস্তার পানি দ্রুত বাড়তে থাকায় চরাঞ্চলের মানুষের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। অনেক পরিবার রাতেই নিরাপদ আশ্রয়ে চলে যায়। আজ সকাল থেকে পানি কিছুটা কমলেও পরিস্থিতি পুরোপুরি স্বাভাবিক হয়নি।’

ডাউয়াবাড়ী চর এলাকার কৃষক মনছুর আলী (৬৫) বলেন, ‘রাতে পানি বাড়তে দেখে পরিবারের সবাইকে নিয়ে নিরাপদ জায়গায় চলে এসেছি। সকাল থেকে পানি কমেছে। তবে এখনো বাড়িতে ফিরিনি।’

কুড়িগ্রামের নাগেশ্বরী উপজেলার চর বামনডাঙ্গা এলাকার কৃষক মোহর আলী (৬৫) বলেন, ‘আজ সকালেও আমাদের বাড়ির উঠানে হাঁটু-সমান পানি। দুধকুমারের পানি ক্রমাগত বাড়ছে। পরিস্থিতির অবনতি হলে বিকেলের মধ্যেই পরিবার নিয়ে আশ্রয়কেন্দ্রে চলে যাব।’

একই উপজেলার চর কালীগঞ্জ এলাকার কৃষক বুদারু মাহমুদ (৬০) জানান, হঠাৎ করেই দুধকুমারের পানি বেড়ে যাওয়ায় তারা পানিবন্দি হয়ে পড়েছেন। ঘরের ভেতরেও পানি ঢুকে গেছে। টানা বৃষ্টির কারণে নিরাপদ আশ্রয়ে যেতেও দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে।

গতকাল রাতে তিস্তার পানির চাপে লালমনিরহাটের কালীগঞ্জ উপজেলার কাকিনা ইউনিয়নের কায়েম-রুদ্রেশ্বর-ইশোরকোল গ্রামীণ সড়কের একটি অংশ ধসে গেছে। এতে ওই এলাকার অন্তত তিন
হাজার মানুষের চলাচল মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে।

লালমনিরহাটের জেলা প্রশাসক মুহাম্মদ রাশেদুল হক প্রধান জানান, গতকাল রাতে তিস্তার পানি বিপৎসীমা অতিক্রম করার পরপরই চর ও নদীতীরবর্তী এলাকায় পানি প্রবেশ করতে শুরু করে। অনেক পরিবার নিরাপদ স্থানে আশ্রয় নিয়েছে।

তিনি বলেন, ‘রাতেই ক্ষতিগ্রস্ত সড়কটি পরিদর্শন করেছি এবং স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের দ্রুত সংস্কারের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। জেলা প্রশাসন সার্বক্ষণিকভাবে বন্যা পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছে।’

জেলা প্রশাসক জানান, বন্যাকবলিত পরিবারের জন্য আপাতত ২২০ মেট্রিক টন চাল এবং ৫ লাখ ৪৬ হাজার ৫০০ টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। উপজেলা প্রশাসন ও জনপ্রতিনিধিদের মাধ্যমে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের কাছে ত্রাণ সহায়তা পৌঁছে দেওয়া হচ্ছে। অতিরিক্ত বরাদ্দের জন্য দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ে আবেদন করা হয়েছে।

কুড়িগ্রাম জেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন কর্মকর্তা বেনজীর রহমান জানান, জেলায় বন্যাদুর্গত মানুষের জন্য ৪০০ মেট্রিক টন চাল মজুত রয়েছে। দ্রুত বন্যাকবলিতদের মাঝে ত্রাণ সহায়তা বিতরণ করা হবে।

পানি উন্নয়ন বোর্ড ও জেলা প্রশাসনের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, উজানে বৃষ্টিপাত অব্যাহত থাকায় আগামী কয়েকদিন নদ-নদীর পানির পরিস্থিতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে। পরিস্থিতির আরও অবনতি হলে তিস্তা ও দুধকুমার তীরবর্তী এলাকায় বন্যার বিস্তার ঘটতে পারে বলে সংশ্লিষ্টদের আশঙ্কা।