বণিক বার্তা ও বিআইডিএসের উদ্যোগে ‘গুণীজন সংবর্ধনা ২০২৫’

By স্টার অনলাইন রিপোর্ট

বণিক বার্তা ও বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (বিআইডিএস) যৌথ উদ্যোগে 'গুণীজন সংবর্ধনা ২০২৫' অনুষ্ঠিত হয়েছে।

মঙ্গলবার সন্ধ্যায় রাজধানীর র‍্যাডিসন ব্লু ওয়াটার গার্ডেনে অষ্টমবারের মতো এ আয়োজন অনুষ্ঠিত হয়।

অনুষ্ঠানের সূচনা বক্তব্য রাখেন বিআইডিএস-এর মহাপরিচালক অধ্যাপক ড. এ কে এনামুল হক এবং সঞ্চালনা করেন বণিক বার্তা সম্পাদক ও প্রকাশক দেওয়ান হানিফ মাহমুদ।

অর্থনীতিসহ দেশের বিভিন্ন খাতে গুরুত্বপূর্ণ অবদানের জন্য এবার তিন কৃতী গুণীজনকে সংবর্ধনা দেওয়া হয়।

তাদের মধ্যে রয়েছেন বেসরকারি খাতের সফল উদ্যোক্তা ও সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারে দুইবার দায়িত্ব পালনকারী উপদেষ্টা সৈয়দ মঞ্জুর এলাহী (মরণোত্তর); শিক্ষক, গবেষক, অর্থনীতিবিদ, নীতি প্রণয়ন ও দেশের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালনকারী জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য অধ্যাপক ড. আমিরুল ইসলাম চৌধুরী এবং টিকা উদ্ভাবন, পরীক্ষণ, প্রয়োগ ও দেশে সংক্রামক রোগ গবেষণায় বিজ্ঞানী ড. ফিরদৌসী কাদরী।

তাদের সম্মান জানিয়ে স্মৃতিচারণ করেন অর্থ এবং বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ, প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী ড. আনিসুজ্জামান চৌধুরী, সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা ও পিপিআরসির নির্বাহী চেয়ারম্যান ড. হোসেন জিল্লুর রহমান, ইন্টারন্যাশনাল চেম্বার অব কমার্সের (আইসিসি) সভাপতি মাহবুবুর রহমান, সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) নির্বাহী পরিচালক ড. ফাহমিদা খাতুন, সিপিডি'র ফেলো ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্যসহ বিশিষ্টজনেরা।

ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ বলেন, 'তিন গুণীজনকে সংবর্ধনা দিতে পেরে আজ আমরা গর্বিত। তাদের প্রত্যেকে নিজ নিজ কর্মক্ষেত্রে গৌরবোজ্জ্বল ভূমিকা রেখেছেন। এই গুণীজনদের অনুসরণ করেই আমরা দ্রুত বাংলাদেশকে সামনের দিকে এগিয়ে নিয়ে যাব। এটাই হোক আমাদের আজকের বড় অঙ্গীকার।'

অধ্যাপক ড. আমিরুল ইসলাম চৌধুরী সম্পর্কে তিনি বলেন, 'ময়না ভাই (অধ্যাপক ড. আমিরুল ইসলাম চৌধুরী) অত্যন্ত বিনয়ী ও জ্ঞানী ব্যক্তি ছিলেন। তিনি শিক্ষক হিসেবে যেমন সফল ছিলেন, তেমনি গণবিশ্ববিদ্যালয়েও কাজ করেছেন। ড. সালেহীন কাদরী আমার বন্ধু ছিলেন। তার পত্নী শায়লা (ড. ফিরদৌসী কাদরী) ছিলেন অত্যন্ত গোছানো ও কাজপাগল একজন মানুষ। তিনি বিজ্ঞান গবেষণায় যে নিষ্ঠা দেখিয়েছেন, তা অতুলনীয়।'

সৈয়দ মঞ্জুর এলাহী সম্পর্কে ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ বলেন, 'মঞ্জুর এলাহী সাহেব খুব সুন্দর করে গুছিয়ে কথা বলতেন। একজন অত্যন্ত সফট স্পোকেন ব্যক্তি হয়েও তিনি নিজের হাতে এতগুলো সফল প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলেছেন। ব্যবসা-বাণিজ্যে তিনি প্রকৃত অর্থেই বিপ্লব এনেছেন।'

অর্থ উপদেষ্টা আরও বলেন, 'মঞ্জুর এলাহী সাহেব ব্যবসা-বাণিজ্যে, ময়না ভাই গবেষণায় এবং শায়লা বিজ্ঞানে অসামান্য অবদান রেখেছেন। এই ধরনের স্বপ্নবাজ কিছু মানুষই আজ বাংলাদেশকে এতদূর নিয়ে এসেছেন। বণিক বার্তা ধারাবাহিকভাবে এই গুণীজনদের সম্মান দিয়ে আসছে, যা সত্যিই প্রশংসনীয়।'

সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে অংশ নিয়ে অর্থ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে থাকা প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী ও ড. আমিরুল ইসলাম চৌধুরীর ছাত্র ড. আনিসুজ্জামান চৌধুরী বলেন, 'আমার কাছে মনে হয় কয়েকজন বিরল শিক্ষকের মধ্যে অধ্যাপক আমিরুল ইসলাম চৌধুরী একজন। অন্যদিকে সৈয়দ মঞ্জুর এলাহী একজন দুর্দান্ত ব্যক্তি ছিলেন। তার অসংখ্য গুণ ছিল। আমরা তার জন্য প্রার্থনা করি। আর মানুষের মঙ্গলের জন্যই যে বিজ্ঞান, সেটি দেখিয়েছেন ড. ফিরদৌসী কাদরী। উনার প্রতি অনেক অনেক কৃতজ্ঞতা।'

পিপিআরসি'র নির্বাহী চেয়ারম্যান ও তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক উপদেষ্টা ড. হোসেন জিল্লুর রহমান বলেন, 'আজকের বাংলাদেশে সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন তিনটি গুণ—সজ্জনতা, পেশাদারিত্ব ও দায়িত্ববোধ।' বণিক বার্তা ও বিআইডিএস আয়োজিত 'গুণীজন সংবর্ধনা ২০২৫' অনুষ্ঠানে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য অধ্যাপক ড. আমিরুল ইসলাম চৌধুরী সম্পর্কে বলতে গিয়ে তিনি বলেন, 'এই তিনটি গুণ তিনি ব্যক্তিগতভাবে তার মধ্যে প্রত্যক্ষ করেছেন।'

ড. হোসেন জিল্লুর রহমান বলেন, দায়িত্বে থেকেও দায়িত্বশীলভাবে কাজ করার দৃষ্টান্ত ছিলেন অধ্যাপক আমিরুল ইসলাম চৌধুরী।

বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠায় তার অবদান স্মরণ করে তিনি বলেন, 'মঙ্গাপীড়িত রংপুর অঞ্চলে বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা একটি গুরুত্বপূর্ণ ও শুভ উদ্যোগ ছিল।'

তিনি আরও বলেন, 'আমিরুল ইসলাম চৌধুরী ছিলেন অত্যন্ত সজ্জন, পেশাদার এবং দায়িত্বশীল মানুষ।'

অন্যান্য গুণীজনদের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে তিনি বলেন, 'সমাজে গুণীজনদের সম্মাননা দেওয়া এবং তাদের প্রয়োজনীয়তা স্মরণ করিয়ে দেওয়া অত্যন্ত জরুরি।'

আইসিসি বাংলাদেশের সভাপতি মাহবুবুর রহমান বলেছেন, প্রয়াত সৈয়দ মঞ্জুর এলাহী নিভৃতে দেশের জন্য অসামান্য অবদান রেখেছেন।

বণিক বার্তা ও বিআইডিএস আয়োজিত 'গুণীজন সংবর্ধনা' অনুষ্ঠানে তিনি বলেন, দুইবার তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা হিসেবে স্বল্প সময়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজ করে কেয়ারটেকার সরকারকে বিতর্কের ঊর্ধ্বে রাখতে তার ভূমিকা ছিল অনন্য।

তিনি আরও বলেন, ব্যবসায়িক সাফল্যের পাশাপাশি এপেক্সকে শীর্ষ রপ্তানিকারক হিসেবে গড়ে তোলার মাধ্যমে এবং সুশাসনে অংশ নিয়ে মঞ্জুর এলাহী দেশের উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন। তার পরিবার ও পুত্র নাসিম মঞ্জুরের নেতৃত্বেরও প্রশংসা করেন মাহবুবুর রহমান।

গবেষক ও অর্থনীতিবিদ ড. আমিরুল ইসলাম চৌধুরীর বিষয়ে স্মৃতিচারণ করে তার শিক্ষার্থী ও বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) নির্বাহী পরিচালক ফাহমিদা খাতুন বলেন, 'অর্থনীতিকে তত্ত্বের বাইরে নিয়ে গিয়ে বাস্তব জীবনের সঙ্গে সংযোগ করাটাও স্যারের কাছ থেকেই শেখা। ক্লাসের সবচেয়ে পিছিয়ে পড়া শিক্ষার্থীটিও যেন সব বুঝতে পারে—সে জন্য তিনি বাস্তব জীবন থেকে উদাহরণ টেনে আমাদের বোঝাতেন। তিনি শ্রেণিকক্ষের শিক্ষক থেকে আমাদের বাস্তব জীবনের শিক্ষক হয়ে উঠেছিলেন।'

সিপিডির নির্বাহী পরিচালক তার শিক্ষকের নীতি-নৈতিকতার প্রসঙ্গ তুলে বলেন, 'তিনি ছিলেন একজন সজ্জন ও উচ্চ নীতিবান মানুষ। উপাচার্য থাকাকালে আমিরুল স্যার খুবই সাধারণ জীবনযাপন করতেন। তার সন্তানরাও সুসন্তান। তারা কখনো উপাচার্যের সন্তান হিসেবে আলাদা কোনো সুবিধা নেননি। ক্যাম্পাস থেকে ঢাকা শহরে যাতায়াতের সময় তিনি কখনোই উপাচার্যের গাড়ি ব্যবহার করতেন না। সবসময় লোকাল বাসে সাধারণ মানুষের সঙ্গে চলাচল করতেন। বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পাস করার পরও বিভিন্ন সময়ে স্যারের সঙ্গে তার আলাপ-আলোচনা হতো। পেশাগত সম্পর্কের বাইরেও তাদের মধ্যে একটি অনানুষ্ঠানিক সংযোগ ছিল, যা বিনি সুতোর মতো আজও তাদের সঙ্গে গেঁথে আছে।'

২০১৪ সাল থেকে দেশের প্রথিতযশা ব্যক্তিদের 'গুণীজন সংবর্ধনা' প্রদান করে আসছে বণিক বার্তা ও বিআইডিএস।

বিভিন্ন সময়ে দেশের উন্নয়ন, নীতিনির্ধারণ, গবেষণা, অর্থনৈতিক সংস্কারসহ সামাজিক ও অর্থনৈতিক অগ্রগতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছেন এবং রাখছেন এমন ব্যক্তিদের সম্মাননা জানানোই এ আয়োজনের অন্যতম উদ্দেশ্য। এ ধারাবাহিকতায় এবার অনুষ্ঠিত হয়েছে গুণীজন সংবর্ধনার অষ্টম আয়োজন।