‘ট্রানজিশন ট্র্যাপ’-এ পড়ার ঝুঁকিতে বাংলাদেশ
সংস্কার নিয়ে অন্তর্বর্তী সরকারের বাগাড়ম্বর থাকলেও বাস্তবে অগ্রগতি সামান্য। এখন দেশ একটি 'ট্রানজিশন ট্র্যাপ' বা 'রূপান্তরকালীন ফাঁদে' পড়ার ঝুঁকিতে রয়েছে। অন্যদিকে সাংবিধানিক ক্ষমতা থাকলেও তা যথাযথভাবে প্রয়োগে ব্যর্থ হয়েছে নির্বাচন কমিশন।
আজ বুধবার রাজধানীর সিরডাপ মিলনায়তনে সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) আয়োজিত 'নির্বাচনী ব্যবস্থার সংস্কার: অগ্রগতি পর্যালোচনা' শীর্ষক গোলটেবিল বৈঠকে বক্তারা এসব কথা বলেন।
অনুষ্ঠানে এসডিজি বাস্তবায়নে নাগরিক প্ল্যাটফর্মের আহ্বায়ক অর্থনীতিবিদ দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য নির্বাচনী সংস্কার কমিশনের সুপারিশ বাস্তবায়ন পর্যবেক্ষণে একটি ডিজিটাল 'রিফর্ম ট্র্যাকার' উদ্বোধন করেন।
দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বলেন, বর্তমানে ৩১টি সংস্কার প্রস্তাব পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে। এর মধ্যে মাত্র দুটি বাস্তবায়নের পর্যায়ে রয়েছে—নারী-পুরুষের ব্যবধান কমানোর উদ্যোগ এবং নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার আগমুহূর্তে যাদের বয়স ১৮ বছর পূর্ণ হবে, তাদের ভোটার তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করা।
তিনি বলেন, অন্য চারটি প্রস্তাবের ক্ষেত্রে সামান্য অগ্রগতি দেখা গেলেও অধিকাংশ প্রস্তাবই অবাস্তবায়িত রয়ে গেছে। অন্তর্বর্তী সরকারের প্রতিশ্রুতি ও বাস্তব ফলাফলের মধ্যে ব্যবধান বাড়ছে।
নির্বাচনী ব্যয়ের বিষয়ে সতর্ক করে দেবপ্রিয় বলেন, নির্বাচনী ব্যয় নিয়ন্ত্রণে আনা না গেলে নির্বাচন-পরবর্তী দুর্নীতি অনিবার্য হয়ে উঠবে। কারণ বিজয়ী প্রার্থীরা নির্বাচনের খরচ তুলতে চাইবেন।
চলমান 'ডেভিল হান্ট' অভিযান প্রসঙ্গে তিনি বলেন, অস্ত্র উদ্ধারের ক্ষেত্রে পুলিশ ও র্যাবের ওপর জনআস্থার ঘাটতি রয়েছে। নির্বাচনের পরেও নিরাপত্তার স্বার্থে দীর্ঘ সময় সেনাবাহিনী মোতায়েন রাখার পক্ষে মত দিচ্ছেন মানুষ।
'ট্রানজিশন ট্র্যাপ'
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ডেভেলপমেন্ট স্টাডিজ বিভাগের অধ্যাপক কাজী মারুফুল ইসলাম বলেন, বাংলাদেশে 'ট্রানজিশন ট্র্যাপ' বা রূপান্তরকালীন ফাঁদের লক্ষণ দেখা যাচ্ছে। যেখানে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর কাঠামোগত পরিবর্তন হলেও সারবত্তার কোনো পরিবর্তন হয় না। তিনি ঝুঁকির বিষয়ে সতর্ক করে বলেন, ন্যূনতম গণতান্ত্রিক পরিবেশ ফিরিয়ে আনতে একটি গ্রহণযোগ্য নির্বাচন আয়োজন এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজ। নির্বাচন প্রক্রিয়া বিলম্বিত বা ব্যাহত করার যেকোনো প্রচেষ্টার বিরুদ্ধে নাগরিক সমাজকে সজাগ থাকার আহ্বান জানান তিনি।
নির্বাচনী সংস্কার প্রস্তাবের বর্তমান অবস্থা তুলে ধরে সুজন সম্পাদক ড. বদিউল আলম মজুমদার বলেন, নির্বাচন কমিশন তার সাংবিধানিক দায়িত্ব পালনে ব্যর্থ হয়েছে। রিটার্নিং কর্মকর্তারা ফলাফল ঘোষণা করে কমিশনে পাঠান এবং কমিশন কোনো যাচাই-বাছাই ছাড়াই তা গেজেট আকারে প্রকাশ করে।
তিনি বলেন, 'একটি সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান হিসেবে ফলাফল প্রকাশের আগে নির্বাচনের সততা, স্বচ্ছতা ও গ্রহণযোগ্যতা নিশ্চিত করা নির্বাচন কমিশনের দায়িত্ব।'
দলের মনোনয়নসংক্রান্ত আইনি কাঠামোর পরিবর্তনের সমালোচনা করে সুজন সম্পাদক বলেন, মূল প্রস্তাবে গোপন ব্যালটের মাধ্যমে তৃণমূলের প্যানেল থেকে প্রার্থী মনোনয়ন দেওয়ার কথা ছিল। কিন্তু সংশোধিত বিধানে বলা হয়েছে, কেন্দ্রীয় মনোনয়ন বোর্ড ওই প্যানেল কেবল 'বিবেচনা' করবে। এর মাধ্যমে তৃণমূলের অংশগ্রহণকে পাশ কাটিয়ে দলীয় নেতৃত্বের ইচ্ছা চাপিয়ে দেওয়ার সুযোগ রাখা হয়েছে।
রাজনৈতিক দলের ছাত্র ও সহযোগী সংগঠনগুলোর বিষয়ে তিনি বলেন, দলগুলো 'ভ্রাতৃপ্রতিম সংগঠন' আখ্যা দিয়ে আইনি বিধিনিষেধ এড়িয়ে যাচ্ছে, যা আইনের উদ্দেশ্যের পরিপন্থী।
নির্বাচনী ব্যবস্থা সংস্কার কমিশনের সদস্য মো. আবদুল আলীম নির্বাচনের আগে বৈধ অস্ত্র জমা না দেওয়ার বিষয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, 'বাংলাদেশে আমি যত নির্বাচন দেখেছি বা গবেষণা করেছি, ভীতি প্রদর্শন রোধে নির্বাচনের আগে সব সময় বৈধ অস্ত্র জমা নেওয়া হতো। এবার তা হচ্ছে না।' তিনি জানান, কমিশন প্রায় ২৫০টি সংস্কার সুপারিশ করেছিল, যার অনেকগুলোই চূড়ান্ত কাঠামো থেকে বাদ দেওয়া হয়েছে।
কমিশনের আরেক সদস্য জেসমিন তুলি বলেন, সুষ্ঠু নির্বাচন কোনো 'উপহার' নয়, এটি সাংবিধানিক দায়িত্ব। ভোটারদের ভোট দেওয়া সাংবিধানিক অধিকার। তিনি সতর্ক করে বলেন, নির্বাচন কমিশন এখনো পুরোনো কাঠামোর মধ্যে আটকে আছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নির্বাচনী প্রচারণার বিষয়ে স্পষ্ট নীতিমালা নেই, যা ভোটারদের বিভ্রান্ত করতে পারে।
অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন সুজনের ট্রাস্টি এম এ মতিন। এতে আরও বক্তব্য দেন নির্বাচনী ব্যবস্থা সংস্কার কমিশনের সদস্য মীর নাদিয়া নিভিন।