চাঁদার দাবিতে ব্যবসায়ীর বাড়িতে গুলি: চাপ সামলাতে সিএমপির কৌশল
চট্টগ্রামের চকবাজার থানার চন্দনপুরা এলাকায় ১০ কোটি টাকা চাঁদার দাবিতে স্মার্ট গ্রুপের মালিক মুজিবুর রহমানের বাড়িতে দুই দফায় গুলির ঘটনায় সমালোচনার মুখে পড়ে চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশ (সিএমপি)।
সবশেষ ২৮ ফেব্রুয়ারি সকালে এসএমজি, রাইফেল ও পিস্তল থেকে গুলি করা হয় চাঁদার দাবিতে। পুলিশ ও ভুক্তভোগীরা বলছেন, চট্টগ্রামের শীর্ষ সন্ত্রাসী সাজ্জাদ আলী ওরফে ‘বড় সাজ্জাদের’ অনুসারীরা এই ঘটনায় জড়িত। তবে যারা গুলি চালিয়েছিল, তাদের কাউকেই গ্রেপ্তার করা সম্ভব হয়নি।
ভুক্তভোগী ব্যবসায়ী মুজিবুর রহমান আওয়ামী লীগের রাজনীতির সঙ্গে জড়িত এবং গণঅভ্যুত্থানে পতিত সরকারের সময় চট্টগ্রাম-১৬ আসনের সংসদ সদস্য ছিলেন।
এই গুলির ঘটনার ভিডিও ফুটেজ সংবাদমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে চাপের মুখে অস্ত্রধারীদের ধরতে ঘোষণা দিয়ে ‘এস ড্রাইভ’ নামে বিশেষ অভিযান শুরু করে সিএমপি।
অভিযানের মধ্যে গত ১০ মার্চ বড় সাজ্জাদের তিন সক্রিয় সহযোগীকে অস্ত্রসহ গ্রেপ্তারের দাবি করে সিএমপি। তাদের কাছ থেকে থানা থেকে লুট হওয়া দুটি পিস্তল ও একটি এসএমজি উদ্ধার করে পুলিশ।
সংবাদ সম্মেলনে পুলিশ দাবি করে, এসব অস্ত্র দিয়েই ওই ব্যবসায়ীর বাড়িতে বড় সাজ্জাদের নির্দেশে গুলি চালানো হয়।
সংবাদ সম্মেলনে পবিত্র কোরআন হাতে নিয়ে বড় সাজ্জাদের দলে যোগ দেওয়ার আগে এক কর্মীর শপথ নেওয়ার ভিডিও দেখানো হয়।
তবে মামলার তথ্য বিশ্লেষণে দেখা গেছে, সমালোচনা ও সরকারের উচ্চপর্যায় থেকে চাপ সামালাতে পুলিশ তথ্য গোপন করেছে। ফুটেজে থাকা কোনো অস্ত্রধারীকেই তারা এখনো গ্রেপ্তার করতে পারেনি।
সংবাদ সম্মেলনে গ্রেপ্তারকৃত তিনজনকে সক্রিয় সদস্য দাবি করা হলেও দুইজনের সঙ্গে বড় সাজ্জাদের সংশ্লিষ্টতার কথা উল্লেখ নেই পুলিশের নথিতে।
তথ্য বলছে, ১০ মার্চ পাঁচলাইশ ও চকবাজার থানার দুটি আলাদা অভিযানকে একসঙ্গে মিডিয়ায় উপস্থাপন করেছে সিএমপি।
‘সক্রিয় সদস্য’ দাবি করা গ্রেপ্তারকৃত তিনজন হলেন আব্দুল কাইয়ুম চৌধুরী ওরফে ইমন (৪৫), মো. মনিরুল হক (৩৯) ও আবু নোমান মো. সায়েম।
তাদের মধ্যে ইমন নগরীর বহদ্দারহাটে ২০০০ সালে আটজনকে গুলি করে হত্যার ঘটনায় করা মামলার সাজাপ্রাপ্ত আসামি ও বিদেশে পলাতক বড় সাজ্জাদের পুরানো সহযোগী।
পুলিশ ও স্থানীয় একাধিক সূত্র জানিয়েছে, সেই হত্যাকাণ্ডের পর পলাতক ইমন ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর দেশে ফিরেন।
পুলিশের দাবি, ইমন এখন সাজ্জাদের গ্রুপ এবং সব চাঁদাবাজি ও অস্ত্রভাণ্ডারের নিয়ন্ত্রণ করে।
পুলিশের দাবির সঙ্গে মামলার তথ্যে গড়মিল
তিনজনকে গ্রেপ্তারের বিষয়ে করা সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত ছিলেন সিএমপির অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার (অপরাধ ও অভিযান) মোহাম্মদ ফায়সাল আহমেদ, অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার (ট্রাফিক) ওয়াহিদুল হক চৌধুরী, উপ-পুলিশ কমিশনার (দক্ষিণ) হোসাইন কবির ভূঁইয়া এবং ডিসি (উত্তর) আমিরুল ইসলাম।
সেদিন ওয়াহিদুল হক চৌধুরী বলেন, ‘সব আসামি শীর্ষ সন্ত্রাসী বড় সাজ্জাদ গ্রুপের সক্রিয় সদস্য। তারা দেশে থেকে শীর্ষ সন্ত্রাসী সাজ্জাদের নির্দেশে চাঁদাবাজি ও বালুমহাল নিয়ন্ত্রণ করে। চকবাজার পুলিশ ইমনকে গ্রেপ্তার করে এবং তার কাছ থেকে পাহাড়তলী থানা থেকে লুট হওয়া একটি পিস্তল উদ্ধার করে। পরে তার দেওয়া তথ্য অনুযায়ী উত্তর বিভাগ সায়েম ও মনিরকে গ্রেপ্তার এবং তাদের কাছ থেকে ডবলমুরিং থানার লুট হওয়া একটি তরাস পিস্তল ও এসএমজি উদ্ধার করে। মনির ও সায়েমের বিরুদ্ধে ১০টি মামলার তথ্য আছে।’
এই অস্ত্র ও গুলি খাগড়াছড়ির পাহাড়ি সন্ত্রাসীদের থেকে কিনেছে বলে জানায় তারা।
ওয়াহিদুল হক চৌধুরী বলেন, ‘তাদের স্বীকারোক্তি অনুযায়ী উদ্ধার হওয়া পিস্তল ও এসএমজি চন্দনপুরা ব্যবসায়ীর বাড়িতে গুলির ঘটনায় ব্যবহৃত হয়েছে এবং এটি ব্যালিস্টিক পরীক্ষায় নিশ্চিত হওয়া যাবে।’
তবে মামলার নথি ও অনুসন্ধান বলছে ভিন্ন কথা।
থানা সূত্র জানায়, ব্যবসায়ীর বাড়িতে গুলির প্রথম ঘটনার পর ২ জানুয়ারি চকবাজার থানায় অজ্ঞাতনামা ৮-১০ জনের বিরুদ্ধে বাড়িটির কেয়ারটেকার মো. আশেক ১০ কোটি টাকা চাঁদার দাবিতে মামলা করেন। টাকা না দেওয়ায় দ্বিতীয় দফায় হামলা হয় এবং এ ঘটনায় জিডি নেয় পুলিশ।
ইমনের কাছ থেকে অস্ত্র উদ্ধারের ঘটনায় চকবাজার থানার এসআই প্রকাশ রায় বাদী হয়ে মামলা করেছেন।
এজাহারে পুলিশ বলছে, চকবাজার থানার ওসি বাবুল আজাদের নেতৃত্বে গোপন সংবাদের ভিত্তিতে গত ৯ মার্চ বিকেলে ডবলমুরিং থানার আগ্রাবাদ এলাকা থেকে সন্দেহভাজন ইমনকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। পরে তাকে থানায় জিজ্ঞাসাবাদে পাওয়া যায়, যে নম্বর থেকে চাঁদার দাবিতে ব্যবসায়ীকে হুমকি দেওয়া হয়েছে সেই নম্বরে তার যোগাযোগ আছে। তার সঙ্গে বড় সাজ্জাদ গ্রুপের রায়হান, মোবারক হোসেনসহ অনেকের যোগাযোগ আছে। পরে ১০ মার্চ রাত ১টার দিকে তার কাছে অস্ত্র আছে জানালে চকবাজার থানার সার্সন রোড থেকে বিপিসির পশ্চিম গেটের নালার নিচ থেকে একটি রিভলভার উদ্ধার করা হয় এবং আসামি স্বীকার করে, এটি পাহাড়তলী থানা থেকে লুট হওয়া অস্ত্র।
ওসি বাবুল এর আগে ডবলমুরিং ও পাহাড়তলী থানায় ছিলেন এবং নানান বিতর্কিত কর্মকাণ্ডে জড়িত বলে পুলিশ সদর দপ্তরে অভিযোগ আছে।
অন্যদিকে এসএমজি ও পিস্তল উদ্ধারের ঘটনায় পুলিশ বাদী হয়ে পাঁচলাইশ থানায় অস্ত্র আইনে মামলা করেছে। কিন্তু সেখানে বড় সাজ্জাদ, তার গ্রুপের অন্যদের সঙ্গে কথোপকথন কিংবা চকবাজার থানায় গ্রেপ্তারকৃত ইমনের সঙ্গে কোনো কথোপকথনের তথ্য উল্লেখ নেই।
পাঁচলাইশ থানার মামলার এজাহারে বলা হয়েছে, ১০ মার্চ রাত দেড়টার দিকে নগরীর দুই নম্বর গেটের দিকে মোটরসাইকেলে সন্দেহভাজন অস্ত্রধারী যাচ্ছে—এমন গোপন সংবাদের ভিত্তিতে ওসি আব্দুল করিম ফোর্স নিয়ে মুরাদপুর থেকে আসা একটি মোটরসাইকেলসহ মনিরকে আটক করে। মনিরকে তল্লাশি করে একটি তরাস পিস্তল জব্দ করে পুলিশ। মোবাইলে অস্ত্রের ভিডিও ও ছবি দেখে জিজ্ঞাসাবাদ করলে মনির জানায়, অস্ত্রটি সায়েমের কাছ থেকে কিনেছে এবং তাদের কাছে আরও একটি অস্ত্র আছে। পরে অভিযান চালিয়ে বায়েজিদ বোস্তামীর নয়ারহাট থেকে সায়েমকে গ্রেপ্তার ও তার তথ্য অনুযায়ী খুলশী থানার আল ফালাহ গলির এক বাসা থেকে বিদেশি এসএমজি, ৫০ রাউন্ড গুলি ও ম্যাগাজিন উদ্ধার করে পুলিশ।
এ ঘটনায় পাঁচলাইশ থানায় হওয়া মামলার বাদী এসআই মিজানুর রহমান উল্লেখ করেছেন, দুই আসামি দুর্ধর্ষ প্রকৃতির এবং হামজারবাগ, হিলভিউ, মুরাদপুর ও আতুরার ডিপো এলাকায় অস্ত্রের ভয় দেখিয়ে চাঁদাবাজি, ডাকাতি, ছিনতাইসহ নানান অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িত।
দ্য ডেইলি স্টার দুই থানার মাঠপর্যায়ের পুলিশ কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে নিশ্চিত হয়েছে, এই দুটি ঘটনার একটির সঙ্গে অপরটির কোনো যোগসূত্র নেই। কিন্তু ‘সিনিয়র কর্মকর্তাদের রোষানলের ভয়ে’ কেউ নাম প্রকাশ করে কথা বলতে চাননি।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে সিএমপির এক সিনিয়র কর্মকর্তা দ্য ডেইলি স্টারকে বলেন, ‘বাড়িতে গুলির ঘটনার দুটি সিসিটিভি ফুটেজ বিশ্লেষণে দেখা গেছে, যারা গুলি করেছেন তাদের বয়স ২২ থেকে ৩৭ বছরের মধ্যে। তারা অস্ত্র চালনায় ভীষণ পারদর্শী। তদন্ত করছি। তবে ইমনের গ্রেপ্তারের সঙ্গে পাঁচলাইশ থানার ঘটনার কোনো মিল নেই। সেটি আলাদা ঘটনা। জানি না কেন এই দুটি ঘটনাকে এক করে মিডিয়ায় ব্রিফ করা হলো।’
এমনকি সংবাদ সম্মেলন দেখানো বড় সাজ্জাদ বাহিনীর একজন পবিত্র কোরআন ছুঁয়ে শপথ নিচ্ছেন, সেই ভিডিও কার কাছ থেকে জব্দ হলো, কিংবা এর উৎস কী—সে সম্পর্কে কোনো বর্ণনা কোনো মামলায় নেই।
বিষয়টি নিয়ে জানতে চাইলে গুলির ঘটনায় মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা এসআই প্রকাশ রায় দাবি করেন, ‘গোপন সংবাদের ভিত্তিতে নয়, আব্দুল কাইয়ুম (ইমন) আমাদের তদন্তে প্রাপ্ত আসামি। যদিও এটা এজাহার থেকে বাদ পড়ে গেছে। অস্ত্র আইনের মামলায় আব্দুল কাইয়ুমকে (ইমন) সাত দিনের রিমান্ডে আনা হয়েছে। চাঁদা চেয়ে গুলির আগের মামলায়ও তাকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।’
‘পাঁচলাইশের থানার দুজনকেও এখন এই চাঁদাবাজির মামলায় গ্রেপ্তার দেখানোর আবেদন করা হবে’, বলেন তিনি।
মামলার তথ্য জানতে চাইলে সিএমপির অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার মোহাম্মদ ফয়সাল আহমেদ ডেইলি স্টারকে বলেন, ‘দুটি ঘটনা একই। তবে আমি মামলার এজাহারগুলো পড়িনি। বাকিগুলো তদন্তে আসবে।’
‘কেউ যদি সংবাদ সম্মেলনে এই এসএমজি থেকে বাড়ি লক্ষ্য করে গুলির কথা বলে থাকেন, সেটি তার নিজের বিষয়। এই এসএমজি ঘটনার সময়ের সেই এসএমজি কি না, সেটা তদন্ত করতে হবে’, যোগ করেন তিনি।


