আহা পুলিশ, কোন দিকে যাবে!

সম্রাট মোহাম্মদ আবু সুফিয়ান
সম্রাট মোহাম্মদ আবু সুফিয়ান

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন পূর্ববর্তী সময়ে মনে হচ্ছিল, বাংলাদেশ একটা অস্বাভাবিক সময় পার করছে। কিছু হলেই রাস্তা অবরোধ, ব্লকেড, মব ভায়োলেন্স! আমরা কোন দিকে ধাবিত হচ্ছি? ছোট-বড় যেকোনো দাবিতেই রাস্তায় নেমে আসা, সড়ক অবরোধ, সচিবালয়ের দিকে যাত্রা, অফিস ঘেরাও, কর্ম বিরতি।

আর দিন শেষে ভিলেন বানানো হয় পুলিশকে। ক্ষেত্র বিশেষে পুলিশকে ভিকটিমও বানানো হচ্ছে। সব দোষ পুলিশের কাঁধে চাপিয়ে দেওয়া হচ্ছে।

আন্দোলন যার বিপক্ষেই হোক বা যে কারণেই হোক, দিন শেষে ভিলেন পুলিশ। কিন্তু কখনোই কেউ চিন্তা করে না যে পুলিশের হাত আইন দিয়ে বাধা। ঘটনা যাই ঘটুক, যেই ঘটাক, যেখানেই ঘটুক—সবকিছুর মুখোমুখি দাঁড়াতে হচ্ছে পুলিশকে। কারণ, পুলিশকেই আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখা, জননিরাপত্তা নিশ্চিত করা, রাস্তাঘাটের যান চলাচল স্বাভাবিক রাখাসহ সবকিছুর জন্য কাজ করে যেতে হয়।

যদি কিছু জনগণ পুলিশের মুখোমুখি দাঁড়ায়, তাদের আইন সংগত কাজে বাধার সৃষ্টি করে, তাহলে বাকি জনগণ পুলিশের কাছ থেকে কাঙ্ক্ষিত সেবা থেকে বঞ্চিত হয়, সবাই ভোগান্তির শিকার হয়।

নবনিযুক্ত স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমেদ তার প্রথম দিনের ব্রিফিংয়ে বলেছেন, ‘দাবি-দাওয়া থাকবে, তা যথাযথ প্রক্রিয়ায় উত্থাপন করতে হবে। যৌক্তিক দাবি আদায়ের জন্য মিছিল ও সমাবেশ করা যাবে, স্মারকলিপি দেওয়া যাবে। দাবি আদায়ের জন্য সড়ক-মহাসড়ক বন্ধ করা যাবে না।’

তিনি আরও বলেছেন, বাংলাদেশে মব কালচার শেষ। মব কালচারকে আর কোনোভাবেই উৎসাহিত করা যাবে না।

রাস্তা অবরোধ বা মব সন্ত্রাস—যেটাই করা হোক না কেন দিনশেষে ভোগান্তির শিকার হয় সাধারণ মানুষ। ঢাকা শহরের কোনো একটি রাস্তা বন্ধ থাকা মানেই পুরো শহরে যানজটের এক বিরূপ প্রভাব তৈরি হওয়া।

ক্ষেত্র বিশেষে পুলিশ তার আইন সংগত কাজ করতে গিয়েও একটা শ্রেণীর বুলিংয়ের শিকার হচ্ছে, সাইবার আক্রমণের শিকার হচ্ছে, সমালোচনার শিকার হচ্ছে, দুর্নাম কুড়াচ্ছে। অনেক সময় পুলিশকে টার্গেট করে আক্রমণ করা হচ্ছে। সস্তা জনপ্রিয়তার লোভে পুলিশকে টার্গেট করে কথা বলে একটা বিশৃঙ্খল পরিবেশ তৈরি করার চেষ্টা করা হচ্ছে‌।

কারণ, এটা সবাই জানে যে পুলিশকে যদি তার কাজ ঠিকমতো করতে দেওয়া না হয়, পুলিশ যদি আইন ঠিকমতো প্রয়োগ না করতে পারে, তাহলে একটা শ্রেণীর বা একটা গোষ্ঠীর এজেন্ডা বাস্তবায়ন করা অনেকটাই সহজ হয়ে যাবে।

কল্পনা করুন, কোনো আন্দোলনেই পুলিশ কোনো রকম বাঁধা প্রয়োগ করলো না। তাহলে কী হবে? নিশ্চিতভাবেই রাষ্ট্রীয় কোনো প্রতিষ্ঠান, দপ্তর বা বাসভবন ভাঙচুরের সম্মুখীন হবে।

কাজেই পুলিশকে ভিলেন বানানোর যে চক্রান্ত, তার সামনের সস্তা আবেগী চিন্তা বাদ দিয়ে পেছনের বাস্তবধর্মী কারণ জানতে হবে।

আন্দোলনকারীদের দাবির যৌক্তিকতার প্রতি সহানুভূতি প্রকাশ করে পুলিশ তাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করেছে। সেইসঙ্গে তাদের কাছে অনুরোধ করেছে, যেন রাস্তা বন্ধ করে লাখো মানুষের ভোগান্তির কারণ না হয়। কিন্তু, বারবার পুলিশের এই প্রচেষ্টাকে দুর্বলতা মনে করা হয়েছে।

পুলিশকে তার আইনগত কাজ করতে দিতে হবে। সেটা হতে হবে আপনার-আমার নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্যই। আন্দোলন করতে গিয়ে যেখানে পুলিশের সহযোগিতা পাওয়ার সুযোগ আছে, সেখানে কেন পুলিশকে ন্যূনতম আইনগত বল প্রয়োগ করার সুযোগ দেবো?

পুলিশের অবস্থা ফুটে ওঠে রমনার ডিসি মাসুদ আলমের উদাহরণ দেখলেই। এই মাসুদ আলমই সেই কর্মকর্তা, যিনি ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানে তার তৎকালীন কর্মস্থল পাবনায় আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তার জন্য ঢাল হয়ে দাঁড়িয়েছিলেন। সেদিন বলেছিলেন, ‘যদি তোমাদের অ্যাটাক করার জন্য কেউ আসে, তাহলে আমি আছি। আমার উপর দিয়ে যাইতে হবে। আগে আমাকে মারতে হবে, তারপর যাইতে হবে।’

সেই মাসুদ আলমকেই গণঅভ্যুত্থান পরবর্তী সময়ে বলতে হয়েছে, ‘যমুনার দিকে যেতে বাধা দিয়েছি, এতেই আমার বিরুদ্ধে পদত্যাগ চাওয়ার দাবি উঠেছে। যদি আরও আইনগত ব্যবস্থা নেই, তাহলে মনে হচ্ছে দেশে থাকাই কঠিন হয়ে যাবে।’

২০২৪ সালের ৫ আগস্ট পরবর্তী কয়েকদিনের ঘটনা পর্যালোচনা করলেই স্পষ্ট হবে যে, পুলিশ না থাকলে বা ঠিকভাবে কাজ করতে না পারলে দেশের পরিস্থিতি ঠিক কেমন হতে পারে। আমরা সেই সময় দেখেছি, কীভাবে একটি গোষ্ঠী দেশের স্বার্থ না দেখে তাদের ব্যক্তি স্বার্থ চরিতার্থ করতে সারা দেশে অস্থিরতা তৈরি করেছে।

পুলিশের কাজ অনেকটা রোগাক্রান্ত মানুষের শরীরে সার্জারি করার মতো। কাঁটা-ছেড়া হবে, খানিকটা রক্তও বের হবে, কিন্তু শেষ পর্যন্ত রোগ সাড়িয়ে সুস্থ করে তুলবে।

পুলিশ সদস্যরা ৩৬৫ দিন দেশের মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে নিরলস কাজ করে যায়। এমনকি সবাই যখন ঈদের আনন্দে বিভোর, তখনও নিজের সন্তান, আত্মীয়-পরিজনের কাছে যাওয়ার চেয়ে জনগণের জানমালের নিরাপত্তাকে গুরুত্ব দিয়েই তারা কাজ করে যান।

তারপরও পুলিশের অবস্থা ‘জলে কুমির, ডাঙায় বাঘ’-এর মতো। আইন প্রয়োগ করলে অপপ্রচারের শিকার; আর না করলে দেশের ক্ষতি, জনগণের নিরাপত্তা বিঘ্নিত, আইনশৃঙ্খলার অবনতি। তারপর আবার সেটা নিয়েও অপপ্রচারের শিকার হতে হয়।

অনেক সময় পারিপার্শ্বিক অবস্থা এবং পরিস্থিতির চাপে অনেক পুলিশ সদস্য ক্ষেত্র বিশেষে তাদের পেশাগত মান বজায় রাখতে পারেন না এবং অনেক সময় অনিয়মে জড়িয়ে পড়েন, যা সামগ্রিকভাবে পুলিশের ভাবমূর্তিকে ক্ষুন্ন করে। তবে এক্ষেত্রে বাহিনীর স্বচ্ছতা নিশ্চিতকরণের লক্ষ্যে প্রতিবছর একটা উল্লেখযোগ্য সংখ্যক পুলিশ সদস্যের বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা গ্রহণসহ ফৌজদারি কার্যক্রম গ্রহণ করা হয়।

তবে, এটাও সত্য পুলিশ যদি আইনগত দায়িত্ব পালন করতে না পারে, তাহলে রাষ্ট্রে নিরাপত্তা বলতে কিছু থাকবে না। কাজেই পুলিশকে প্রতিপক্ষ না ভেবে তাদের কাজের পরিবেশ সৃষ্টি করে দিতে হবে। তা না হলে ভোগান্তির শিকার হতে হবে সবাইকেই।

দেশের উন্নয়নের জন্য, সবার জীবন সহজ করার জন্য, সর্বোপরি জনগণের সার্বিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য পুলিশকে তার কাজ করতে দিতে হবে।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমেদ যথার্থই বলেছেন, ‘পুলিশকে জনগণের বন্ধু বানাতে হবে।’ দেশের নতুন সরকার সর্বতোভাবে চেষ্টা করছে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির সার্বিক উন্নয়নসহ দেশের সামগ্রিক উন্নয়নে কাজ করতে। দেশের উন্নয়নে আমাদের সবাইকে ন্যায্যতার সঙ্গে কাজ করে যেতে হবে। পদে পদে অন্যায্য, অনৈতিক ও বেআইনি বাধা সৃষ্টি করা হলে ভুক্তভোগী হতে হবে সবাইকেই। আর দিন শেষে দেশকেই তার মূল্য চুকাতে হবে।