সংগ্রামের ভিন্ন মানচিত্রে ফিলিস্তিন থেকে বাংলার নারী
ক্যালেন্ডারের পাতায় আজ আন্তর্জাতিক নারী দিবস। বিশ্বের ঝলমলে শহরগুলোতে যখন সমঅধিকারের স্লোগান আর উদযাপনের রঙ ছড়িয়ে পড়ছে, ঠিক সেই মুহূর্তেই পৃথিবীর অন্য প্রান্তের আকাশগুলো ঢাকা পড়ে আছে যুদ্ধের কালো ধোঁয়ায়, স্তব্ধ হয়ে আছে কট্টরতার অন্ধকারে।
নারীর লড়াই আজ কেবল দেয়াল ভাঙার নয়, এই লড়াই আজ টিকে থাকার, নিজের অস্তিত্ব আর পরিচয়কে মুছে ফেলার ষড়যন্ত্রের বিরুদ্ধে। কোথাও নারী লড়ছেন বোমারু বিমানের নিচে দাঁড়িয়ে সন্তানের জীবন বাঁচাতে, কোথাও লড়ছেন নিজের কণ্ঠস্বরকে প্রকাশ্য করার মৌলিক অধিকারটুকু ফিরে পেতে, আবার কোথাও লড়ছেন অদৃশ্য সামাজিক শেকল আর কাঠামোগত বৈষম্যের বিরুদ্ধে।
ফিলিস্তিন থেকে আফগানিস্তান, কিংবা বাংলাদেশের রাজপথ থেকে অন্দরমহল—ভৌগোলিক সীমানা আলাদা হলেও প্রতিটি নারীর সংগ্রামের সুর আজ একবিন্দুতে মিলিত। সেই সুরটি মর্যাদা, সমতা ও মানবিক অধিকারের।
যুদ্ধবিধ্বস্ত ফিলিস্তিনে কেমন আছে নারীরা?
গাজায় চলমান যুদ্ধ ফিলিস্তিনি নারীদের জন্য এক নারকীয় বাস্তবতা তৈরি করেছে। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থার অনুমান, ২০২৩ সালের অক্টোবর থেকে শুরু হওয়া এই সংঘাতে ২০২৬ সালের শুরু পর্যন্ত ২৮ থেকে ৩৩ হাজারেরও বেশি নারী ও কন্যাশিশু নিহত হয়েছে, যা সাম্প্রতিক সংঘাতগুলোর মধ্যে অন্যতম ভয়াবহ নারী-শিশু হতাহতের ঘটনা। গত কয়েক মাসে (২০২৫-২০২৬) মোট হতাহতের প্রায় ৫৬ শতাংশ নারী, শিশু ও বয়স্ক ব্যক্তি।
জাতিসংঘের বিশেষায়িত সংস্থা ইউএন ওম্যান ও ইউএনএফপিএ’র প্রতিবেদনের তথ্য অনুসারে, প্রতিদিন গড়ে ৬৩ জন ফিলিস্তিনি নারী নিহত হচ্ছেন, যাদের মধ্যে ৩৭ জনই মা।
এই সংখ্যা ২০২৫ সালের শুরুতে রেকর্ড করা হয়েছে এবং ২০২৬ সালে এই সংখ্যা নিঃসন্দেহে আরও বেড়েছে। গাজায় বর্তমানে প্রায় ৫০ হাজার গর্ভবতী নারী রয়েছেন, যাদের মধ্যে অনেকেই অপুষ্টি এবং চিকিৎসার অভাবে ভুগছেন।
গাজার হাসপাতালগুলোর অর্ধেকেরও বেশি ধ্বংস হয়ে গেছে। ফলে অ্যানেস্থেসিয়ার অভাবে অনেক নারীকে ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় সন্তান জন্ম দিতে হচ্ছে। ২০২৫ সালের প্রথম ছয় মাসে ২ হাজার ৬০০ গর্ভপাত, ২২০ গর্ভসম্পর্কিত মৃত্যু এবং ১ হাজার ৪৬০ অকাল জন্ম রেকর্ড করা হয়েছে।
এছাড়া, জন্মহার ৪১ শতাংশ কমেছে, যা ‘প্রজনন সহিংসতা’ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। খাদ্য ও সুপেয় পানির অভাবে নারীরা অপুষ্টিতে ভুগছেন। প্রায় ২ লাখ ৫০ হাজার নারী ও কন্যাশিশু দুর্ভিক্ষের মতো অবস্থায় বাস করছেন এবং আরও ৫ লাখ ঝুঁকির মুখে। অনেক মা নিজের খাবারটুকু সন্তানদের দিয়ে নিজে অভুক্ত থাকছেন, ফলে শিশু অপুষ্টির হারও বেড়েছে, ১ লাখ ৩২ হাজার শিশুর জীবন ঝুঁকিতে।
স্যানিটেশন ব্যবস্থার অভাবে পিরিয়ড বা ঋতুস্রাবের সময় গাজার নারীরা ভয়াবহ স্বাস্থ্যঝুঁকির সম্মুখীন হচ্ছেন। এছাড়া, যুদ্ধের কারণে বাল্যবিয়ের হার বেড়েছে, যা নারীদের ভবিষ্যতকে আরও অন্ধকার করে তুলেছে। এই যুদ্ধ নারীদের শুধু শারীরিক নয়, মানসিকভাবেও বিধ্বস্ত করছে। গাজায় গর্ভপাতের হার ৩০০ শতাংশ বেড়েছে।
অন্ধকারে ফিরে যাওয়া জনপদের নাম আফগানিস্তান
২০২১ সালে তালেবান ক্ষমতায় আসার পর আফগানিস্তানে নারীদের ওপর যে বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়েছে, তাকে জাতিসংঘ ‘লিঙ্গভিত্তিক বর্ণবাদ’ হিসেবে অভিহিত করেছে।
দেশটিতে ষষ্ঠ শ্রেণির পর মেয়েদের স্কুল সম্পূর্ণ বন্ধ। বর্তমানে আফগানিস্তান বিশ্বের একমাত্র দেশ যেখানে মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা নারীদের জন্য নিষিদ্ধ। নারীদের বিশ্ববিদ্যালয়ে যাওয়া ও এনজিওতে কাজ করাও নিষিদ্ধ। ২০২৪ সাল থেকে দেশটিতে চিকিৎসা শিক্ষা বন্ধ, ফলে স্বাস্থ্যখাতে নারী চিকিৎসকের অভাব প্রকট হয়েছে।
আফগানিস্তানে পুরুষ অভিভাবক (মাহরাম) ছাড়া নারীদের ঘরের বাইরে যাওয়া বা দীর্ঘ পথ ভ্রমণ নিষিদ্ধ। এমনকি পার্ক বা জিমে যাওয়াও তাদের জন্য এখন অসম্ভব।
২০২৪ সালের ‘ভাইস অ্যান্ড ভার্চু ল’ দেশটির নারীদের মুখ ঢেকে রাখা বাধ্যতামূলক করেছে। তাদের কণ্ঠস্বরও জনসমক্ষে শোনা যাবে না (যেমন কুরআন পাঠ বা গান)।
এছাড়া, ২০২৬ সালে প্রণীত তালিবানের নতুন ফৌজদারি কোড আফগান নারীদের ওপর দাসত্ব-সদৃশ নিয়ন্ত্রণ আরোপ করে। এই আইনে স্বামী স্ত্রীকে শারীরিকভাবে শাস্তি দিতে পারেন (যেমন লাঠি দিয়ে মারা), যতক্ষণ না হাড় ভাঙে বা আঘাতের ফলে সৃষ্ট ক্ষত দৃশ্যমান হয়। এমনকি গুরুতর ক্ষেত্রেও সর্বোচ্চ শাস্তি মাত্র ১৫ দিনের জেল। তাও আবার নারীকে নিজে প্রমাণ করতে হবে আদালতে, যা প্রায় অসম্ভব। অন্যান্য ধরনের নির্যাতন (মানসিক, যৌন, হালকা মারধর) তো দেশটিতে অপরাধ বলে গণ্যও হয় না।
আরও আছে, স্বামীর অনুমতি ছাড়া বাবার বাড়ি বা আত্মীয়ের কাছে গেলে নারীর তিন মাসের জেল হতে পারে এবং যে আশ্রয় দেয় তাকেও শাস্তি পেতে হয়। এতে নির্যাতিত নারী পালিয়ে যাওয়া বা সাহায্য চাওয়াও অপরাধ হবে।
আইনে ‘গুলাম’ শব্দ ব্যবহার করে সমাজকে শ্রেণিবিভক্ত করা হয়েছে এবং নারীদের অধিকারকে পুরুষের নিয়ন্ত্রণের অধীনে রাখা হয়েছে। এর ফলে কার্যত নারীরা আইনি সুরক্ষা থেকে বঞ্চিত এবং পুরুষের মালিকানার অধীনে।
গৃহবন্দী দশা ও ভবিষ্যৎ অন্ধকার দেখে আফগান নারীদের মধ্যে আত্মহত্যার প্রবণতা ও চরম বিষণ্নতা আশঙ্কাজনক হারে বেড়েছে। ২০২৫ সালে দেশটিতে ৪১১টি নারী অধিকার লঙ্ঘনের ঘটনা রেকর্ড করা হয়েছে, যার মধ্যে ৩০০টি সরাসরি তালেবানের দ্বারা।
ইউএন রিপোর্ট অনুসারে, এসব আইন নারীদের জনপরিসরের জীবনকে সম্পূর্ণ বাতিল করে দিয়েছে। সেইসঙ্গে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের নীরবতা এটাকে আরও উস্কে দিচ্ছে।
২০২৬ সালে ইন্টারন্যাশনাল ক্রিমিনাল কোর্ট তালেবান নেতাদের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করেছে লিঙ্গভিত্তিক নির্যাতনের জন্য।
দৃশ্যমান অগ্রগতি বনাম অদৃশ্য শেকলে বন্দি বাংলাদেশের নারীরা
বাংলাদেশের প্রেক্ষাপট ফিলিস্তিন বা আফগানিস্তানের মতো ভয়াবহ না হলেও এখানে কাঠামোগত ও সামাজিক বৈষম্য এখনো প্রকট। দীর্ঘদিন ধরে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী ও বিরোধীদলীয় নেত্রী নারী হওয়া সত্ত্বেও তৃণমূল রাজনীতিতে নারীদের অংশগ্রহণ এখনো চ্যালেঞ্জিং।
সংসদে নারীদের জন্য সংরক্ষিত আসন থাকলেও সরাসরি নির্বাচনে জয়ী হওয়ার হার এখনো বেশ কম। ২০২৫ সালের ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামের জেন্ডার গ্যাপ রিপোর্টে বাংলাদেশ ২৪তম স্থানে রয়েছে। এর মূল ভিত্তি হলো ‘রাজনৈতিক ক্ষমতায়ন’ উপ-সূচক। দীর্ঘ সময় নারী সরকারপ্রধান থাকার কারণে এই নির্দিষ্ট খাতে বাংলাদেশ ৭৭ দশমিক ৫ শতাংশ প্যারিটি স্কোর অর্জন করেছে।
তবে এই সাফল্য সামগ্রিক চিত্র নয়; অর্থনৈতিক অংশগ্রহণ এবং স্বাস্থ্য সুরক্ষা সূচকে বাংলাদেশ এখনো অনেকটা পিছিয়ে। অর্থাৎ, শীর্ষ নেতৃত্বে নারীর উপস্থিতি থাকলেও তৃণমূল পর্যায়ে সাধারণ নারীর ক্ষমতায়নে এখনো বড় ধরনের ঘাটতি রয়ে গেছে।
নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে পুরুষতান্ত্রিক মানসিকতা প্রায়ই বাধা হয়ে দাঁড়ায়। বিশেষ করে ২০২৪ সালে রাজনৈতিক পালাবদলের পর থেকে ধর্মীয় গোষ্ঠীগুলো নারীদের স্বাধীনতা সীমিত করার দাবি জোরেশোরে তুলে আসছে।
গার্মেন্টস শিল্প থেকে শুরু করে ফ্রিল্যান্সিং, খেলাধুলা—সবখানেই নারীদের জয়জয়কার। তবে ‘জেন্ডার পে গ্যাপ’ বা সমকাজে সমান মজুরি পুরোপুরি নিশ্চিত হয়নি।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) ২০২২ সালের তথ্যমতে, পুরুষদের গড় মাসিক আয় ১৬ হাজার টাকা, নারীদের ১২ হাজার ৬০০ টাকা, অর্থাৎ প্রায় ২০ শতাংশ কম।কয়েক বছর আগের এই আয়ের ব্যবধান এখনো তেমন বদলায়নি।
অন্যদিকে, ঘরের ও বাইরের কাজ—এই দ্বিমুখী চাপের কারণে অনেক নারী মাঝপথে কর্মজীবনের সমাপ্তি ঘটাতে বাধ্য হন।
বাংলাদেশে নারী নির্যাতনের হার এখনো উদ্বেগজনক। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) তথ্যমতে, অর্ধেকের বেশি নারী (৭৬ শতাংশ) জীবনে অন্তত একবার পারিবারিক সহিংসতার শিকার হন।
বর্তমানে সাইবার বুলিং বা অনলাইনে হয়রানির শিকার হওয়া নারীর সংখ্যা জ্যামিতিক হারে বাড়ছে। ৮ দশমিক ৩ শতাংশ নারী এ ধরনের যৌন হয়রানিতে (যেমন ইমেজ-বেসড অ্যাবিউজ) ভোগেন।
এত বাধা, রক্তপাত আর শিকল সত্ত্বেও ২০২৬ সালের এই নারী দিবস কেবল যন্ত্রণার নয়, বরং এক অদম্য প্রতিরোধের নাম। গাজার ধ্বংসস্তূপের ওপর দাঁড়িয়ে যে মা এখনো জীবনের গান গাইছেন, আফগানিস্তানের রুদ্ধ দুয়ারের আড়ালে যে কিশোরী গোপনে বই খোলে, কিংবা বাংলাদেশের কলকারখানা আর ডিজিটাল দুনিয়ায় যে নারী নিজের সাম্রাজ্য গড়ে তোলে, তারাই এই সময়ের প্রকৃত যোদ্ধা।