২৫ মার্চ গণহত্যা নিয়ে সাইমন ড্রিংয়ের প্রতিবেদনের পেছনের গল্প

রাহাত মিনহাজ
রাহাত মিনহাজ

‘আল্লাহ ও ঐক্যবদ্ধ পাকিস্তানের’ নামে ঢাকা আজ একটি বিধ্বস্ত এবং ভীতসন্ত্রস্ত নগরী। পাকিস্তান সেনাবাহিনীর ২৪ ঘণ্টার নির্মম, ঠাণ্ডা মাথায় গোলাবর্ষণে ৭ হাজারেরও বেশি মানুষ হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়েছেন। বিশাল এলাকা মাটির সঙ্গে মিশিয়ে দেওয়া হয়েছে। যার মাধ্যমে নির্মমভাবে দমন করা হয়েছে পূর্ব পাকিস্তানের স্বাধীনতার সংগ্রাম।

দেশের (পাকিস্তানের) সামরিক সরকারের প্রধান রাষ্ট্রপতি ইয়াহিয়া খান দাবি করেছেন, পরিস্থিতি এখন শান্ত। যদিও হাজারো মানুষ গ্রামাঞ্চলে পালিয়ে যাচ্ছেন। নগরীর রাস্তাঘাট প্রায় জনশূন্য এবং বিভাগীয় শহরগুলোর বিভিন্ন জায়গাতে এখনও হত্যাকাণ্ড চলছে। (ট্যাঙ্কস্ ক্রাশ রিভোল্ট ইন পাকিস্তানের ভাবানুবাদ, দ্য ডেইলি টেলিগ্রাফ, ৩০ মার্চ ১৯৭১) উপরে উল্লেখিত বিবরণ ছিল ১৯৭১ সালে আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে প্রকাশিত বাংলাদেশের গণহত্যা নিয়ে প্রকাশিত প্রথম কোন সংবাদের ভূমিকা। যাকে সাংবাদিকতার পরিভাষায় সংবাদ শীর্ষ, সংবাদ সূচনা বা ইনট্রো বলা হয়ে থাকে। ১৯৭১ সালের ৩০ মার্চ লন্ডনভিত্তিক দ্য ডেইলি টেলিগ্রাফ সংবাদপত্র ট্যাঙ্কস্ ক্রাশ রিভোল্ট ইন পাকিস্তান—শিরোনামে এই স্কুপ নিউজটি প্রকাশ করেছিল। ঐতিহাসিক এই প্রতিবেদন তৈরিতে সংবাদমাধ্যমটির একজন তরুণ সংবাদদাতা নিজের জীবন বিপন্ন করেছিলেন। পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর রক্তচক্ষু উপেক্ষা করে বিশ্ববাসীর সামনে তুলে ধরেছিলেন পাকিস্তানি বর্বরতা। তিনি ছিলেন ব্রিটিশ সাংবাদিক সায়মন জন ড্রিং (১৯৪৫-২০২১)। ১৯৭১ সালে তিনি ছিলেন দ্য ডেইলি টেলিগ্রাফের একজন যুদ্ধ ও সংঘাত বিষয়ক সংবাদদাতা। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে তিনি একজন মানবতাবাদী দুঃসাহসী সাংবাদিক।

সায়মনের আরও একটি পরিচয় আছে। তিনি বাংলাদেশের আধুনিক সম্প্রচার সাংবাদিকতার প্রাণপুরুষ। তিনি একুশে টেলিভিশনের স্বপ্নদ্রষ্টা ছিলেন। পরে বাংলাদেশের বিভিন্ন টিভি চ্যানেলের পরামর্শক হিসেবে কাজ করেছেন। বাংলাদেশে ২৪ ঘণ্টা সংবাদভিত্তিক টিভি চ্যানেল যমুনা টিভি ছিল তার শেষ কর্মস্থল। এই স্টেশনে তিনি ২০১৩ থেকে ২০১৪ সাল পর্যন্ত প্রধান সম্প্রচার উপদেষ্টা হিসেবে কাজ করেছেন। সেই সময় আমি যমুনা টিভিতে একজন সিনিয়র রিপোর্টার হিসেবে কাজ করতাম। যমুনা টিভির প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তার কক্ষে একদিন বিকেলে তিনি আমাকে ১৯৭১ সালে ঢাকায় তার কাটানো ৩২ ঘণ্টারও বেশি ঝুঁকিপূর্ণ সময়ের গল্প বলেছিলেন। পাকিস্তান সেনাবাহিনীর অপারেশন সার্চলাইট নামের বর্বর গণহত্যার নীলনকশা বাস্তবায়নের শুরুতে সায়মন ও এপির ফরাসি ফটোসাংবাদিক মিশেল লরেন্ট ঢাকা শহরে দুঃসাহসিক অভিযানে যুক্ত ছিলেন। ঢাকা শহর তখন জ্বলছিল। রাস্তায় ছিল উদ্যত মেশিনগানসহ পাকিস্তানি সেনা জিপ। মানুষ যে যার মতো শহর ছেড়ে পালাচ্ছে। এমন শ্বাসরুদ্ধকর পরিস্থিতিতে ১৯৭১ সালে এই দুই জনই ছিলেন প্রথম কোনো বিদেশী সাংবাদিক যারা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, পুরাতন ঢাকা, রমনা কালী মন্দির, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবের ৩২ নম্বর বাড়ি এবং অন্যান্য স্থান থেকে সরেজমিন সংবাদ ও ছবি সংগ্রহ করেছিলেন।

১৯৭১ সালের মার্চে সায়মন জন ড্রিং দ্য ডেইলি টেলিগ্রাফের যুদ্ধ সংবাদদাতা হিসেবে কম্বোডিয়ার সংঘাত কভার করছিলেন। সেই সময় পলপটের খেমাররুজ বাহিনী দেশটির সরকারি সেনাবাহিনীর সাথে রক্তক্ষয়ী সংঘাতে লিপ্ত ছিল। ফেব্রুয়ারির শেষ সপ্তাহে দ্য ডেইলি টেলিগ্রাফ সম্পাদক লন্ডন থেকে সায়মনকে ফোন করে পূর্ব পাকিস্তানের অগ্নিগর্ভ পরিস্থিতি বর্ণনা করেন। পরে অফিস থেকে সিদ্ধান্ত হয় সায়মন ঢাকার উদ্ভূত পরিস্থিতি কভার করবেন। মাত্র ২৬ বছর বয়সী তরুণ সাংবাদিক সায়মন জন ড্রিং ১৯৭১ সালের ৬ মার্চ ঢাকায় পৌঁছান।

ঢাকা ছিল সায়মনের জন্য সম্পূর্ণ নতুন এক শহর। আওয়ামী লীগের ডাকা সর্বাত্মক অসহযোগ আন্দোলন চলছে। রাস্তায় মিছিল, গুলিতে মানুষ মরছে। প্রতি রাতে মশাল মিছিল। একেবারে অগ্নিগর্ভ পরিস্থিতি। নতুন দেশ, অপরিচিত মানুষ, অচেনা পরিবেশ। সয়মনের জন্য সবচেয়ে কঠিন ছিল বাংলা ভাষা বুঝতে পারা। তবে একটি বিষয়ের সঙ্গে তার পূর্ব অভিজ্ঞতার মিল ছিল। অতীতে সায়মন অনেক যুদ্ধ এবং সংঘাত কাভার করেছেন। তিনি সংঘাত ও সামরিক অভিযানের আগে-পরের পরিস্থিতি ভালো বুঝতেন। ঢাকায় মাত্র এক রাত কাটানোর পর সায়মন ১৯৭১ সালের ৭ই মার্চ রেসকোর্স ময়দানে (বর্তমানে সোহরাওয়ার্দী উদ্যান) বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ঐতিহাসিক ভাষণ কভার করেন। স্বাভাবিকভাবেই তিনি বাংলা ভাষা বুঝতেন না। অসহযোগ আন্দোলনের মধ্যে দোভাষীর ব্যবস্থাও করা সম্ভব হয়নি। যদিও রেসকোর্স ময়দানের জনস্রোত, প্রতিবাদ, অভিব্যক্তি, উৎসাহ আর ‘জয় বাংলার’ সমুদ্র গর্জন শুনে তিনি খুব ভালোভাবে বুঝতে পেরেছিলেন, সামরিক শক্তি দিয়ে এই জাতিকে দমন করা সম্ভব নয়।

৭ মার্চের পর সায়মন ধানমণ্ডির ৩২ নম্বর বাড়িতে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবের সাথে বেশ কয়েকবার দেখা করেন। তিনি জানিয়েছেন, শেখ মুজিবুর রহমানের সাথে তার সেই সাক্ষাৎকারগুলো দ্য ডেইলি টেলিগ্রাফের প্রকাশিত প্রতিবেদন তৈরির জন্য খুবই সহায়ক ছিল।

এদিকে অসহযোগ আন্দোলনের চূড়ান্ত পর্যায়ে ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ বিকেলে সায়মন এবং ঢাকায় থাকা প্রায় ২০০ বিদেশী সাংবাদিক জানতে পারেন, পাকিস্তানের রাষ্ট্রপতি ইয়াহিয়া খান অনেকটা গোপনে ঢাকা ছেড়ে চলে গেছেন। সেসময় শহরে প্রবল গুঞ্জন ছিল ইয়াহিয়া খান ইতিমধ্যেই সামরিক অভিযানের নির্দেশ দিয়েছেন। সায়মন তখন স্পষ্ট বুঝতে পেরেছিলেন যে, ‘চিপস আর ডাউন’ (খুব খারাপ কিছু ঘটতে চলেছে)। সায়মনের অনুমান ঠিক ছিল—সে রাতেই ঢাকার বুকে পরিচালিত হয় হালাকু খানের তাণ্ডব। বর্বর জিঘাংসায় ঢাকা নগরীকে ধ্বংস করতে নামে পাকিস্তানি সেনারা। যার প্রতিফলন ছিল সায়মন জন ড্রিং-এর ঐতিহাসিক ওই প্রতিবেদনে।

ট্যাঙ্কস্ ক্রাশ রিভোল্ট ইন পাকিস্তান—শিরোনামের ওই প্রতিবেদনে সায়মন পরের দিকে আরও লিখেছেন, ছাত্রদেরও সতর্ক করা হয়েছিল। কিন্তু ঔই রাতে তখনও যারা আশেপাশে ছিলেন তাদের ধারণা ছিল কেবল গ্রেপ্তার করা হবে। মধ্যরাতের আগেই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সরবরাহ করা এম-২৪ ট্যাঙ্ক নিয়ে পাকিস্তানি সেনারা রাস্তায় নেমে পরে। যে ট্যাঙ্কগুলো আমেরিকানরা দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে ব্যবহার করেছিল। মধ্যরাতের পরপরই এক কলাম সৈন্য ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ছুটে আসে। সৈন্যরা ব্রিটিশ কাউন্সিলের লাইব্রেরি এলকা দখলে নেয়। এরপর সেখান থেকে আশেপাশের ছাত্রাবাস এলাকায় গোলাগুলি চালায়। সম্পূর্ণ আকস্মিক এই আক্রমণে ইকবাল হলের (বর্তমানে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শহীদ সার্জেন্ট জহুরুল হক হল) বিস্মিত প্রায় ২০০ ছাত্র নিহত হন। দুর্বার অসহযোগ আন্দোলনের মূল চালিকা শক্তি—ছাত্র সংগঠনগুলোর ঘাঁটি ছিল এই আবাসিক হল। এর ভবনে শেল বিস্ফোরিত হয় এবং হলের কক্ষগুলোতে মেশিনগানের গুলি ছোঁড়া হয়। (ট্যাঙ্কস্ ক্রাশ রিভোল্ট ইন পাকিস্তানের ভাবানুবাদ, দ্য ডেইলি টেলিগ্রাফ, ৩০ মার্চ ১৯৭১) এটিই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণহত্যার প্রথম বিবরণ যা একজন বিদেশী সাংবাদিক হিসেবে প্রথম লিপিবদ্ধ করেছিলেন সায়মন জন ড্রিং।

এই সাংবাদিক আরও জানিয়েছেন, ১৯৭১ সালের ২৬ মার্চ পাকিস্তান সেনাবাহিনীর সামরিক গোয়েন্দা বিভাগের জনসংযোগ কর্মকর্তা মেজর সিদ্দিক সালিকের চোখ ফাঁকি দেওয়ার পর ২৭ মার্চ তিনি ও মিশেল সরেজমিন ঢাকা শহরের পরিস্থিতি দেখতে বের হয়েছিলেন। সেদিন কিছু সময়ের জন্য কারফিউ শিথিল ছিল। হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টালের বাঙালি কর্মচারীরা সায়মন ও মিশেলকে একটা বেকারি ভ্যানের ব্যবস্থা করে দিয়েছিলেন। আর তারা দুজনই পশ্চিমা পোশাক পাল্টে পড়েছিলেন পাজামা ও পাঞ্জাবি। সাময়নের ভাষ্য অনুযায়ী, ইন্টারকন্টিনেন্টাল হোটেলের ঔই বাঙালি কর্মচারীরা ছিলেন বাংলাদেশের প্রথম পর্যায়ের মুক্তিযোদ্ধা। যারা জীবনের ঝুঁকি নিয়ে দুই জন বিদেশী সাংবাদিককে লুকিয়ে রেখেছিলেন এবং পরে সংবাদ সংগ্রহে সহযোগিতা করেছিলেন।

ঐতিহাসিক ওই প্রতিবেদনে পরের দিকে উঠে আসে অপারেশন সার্চলাইটের আরও ভয়াবহ চিত্র। এতে বলা হয়—বিশ্ববিদ্যালয়ে আক্রমণ চালানোর সঙ্গে সঙ্গে শহরের অন্য প্রান্তে পূর্ব পাকিস্তান পুলিশের রাজারবাগ সদর দপ্তরের সামনে আরেকটি সেনাদল পৌঁছে যায়। প্রথমে ট্যাঙ্ক থেকে গুলি চালানো হয়। তারপর সৈন্যরা সেখানে প্রবেশ করে এবং ভবনগুলিতে আগুন লাগানোর জন্য বিশেষ ধরনের গুলি চালায়।

সে সময় কতজন মারা গেছেন তা জানা যায়নি। এমনকি পুলিশ সদরদপ্তরের (রাজারবাগ পুলিশ লাইন্স) বিপরীতে বসবাসকারী লোকেরাও ঠিক জানে না হতাহতের সংখ্যা। তবে সেখানে থাকা ১০০ জন পুলিশের মধ্যে খুব বেশি পুলিশ পালিয়ে যাননি বলে মনে করা হয়। (ট্যাঙ্কস্ ক্রাশ রিভোল্ট ইন পাকিস্তানের ভাবানুবাদ, দ্য ডেইলি টেলিগ্রাফ, ৩০ মার্চ ১৯৭১)

এখানে একটি বিষয় উল্লেখ করা প্রয়োজন, অপারেশন সার্চলাইটের প্রথম পর্যায়ে রাজারবাগ পুলিশ লাইন্সের বাঙালি পুলিশ সদস্যরা শক্ত প্রতিরোধ গড়ে তুলেছিল। আর যুদ্ধ কৌশল হিসেবে পুলিশ সদস্যরা অবস্থান নিয়েছিল ব্যারাকের ছাদে। সমরবিদ্যায় সেটা ছিল বেশ সুবিধাজনক অবস্থান। যে কারণে পাকিস্তানি সেনারা প্রথম আক্রমণের পর বিশেষ যুদ্ধাস্ত্র ব্যবহার করে ব্যারাকে আগুন লাগিয়ে দেয়। আগুনের প্রচণ্ড তাপে পুলিশ সদস্যরা দ্রুত পালিয়ে যেতে বাধ্য হন।

ট্যাঙ্কস্ ক্রাশ রিভোল্ট ইন পাকিস্তান প্রতিবেদনে সায়মন দুটি স্বাধীনতাপন্থী সংবাদপত্র পুড়িয়ে দেওয়ার বিষয়টিও তুলে ধরেছেন। সায়মন জন ড্রিং আবিদুর রহমানের দ্য পিপলের উপর আক্রমণের বর্ণনা ঠিক এভাবে দিয়েছেন, … [শহরের] কিছু এলাকায় তখনও ভারী গোলাবর্ষণ চলছিল। কিন্তু লড়াই লক্ষণীয়ভাবে ধীর হতে শুরু করেছিল। এক পর্যায়ে ইন্টারকন্টিনেন্টাল হোটেলের বিপরীতে এক প্লাটুন সৈন্য ঢাকার ‘পিপল’(দ্য পিপল) পত্রিকার খালি জায়গায় হামলা চালায়। এলাকার বেশিরভাগ বাড়িঘরসহ এটি (দ্য পিপল) পুড়িয়ে দেয় এবং একজন একাকী রাতের প্রহরীকে হত্যা করে। (ট্যাঙ্কস্ ক্রাশ রিভোল্ট ইন পাকিস্তানের ভাবানুবাদ, দ্য ডেইলি টেলিগ্রাফ, ৩০ মার্চ ১৯৭১)

১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ কালরাতে শুরু হওয়া অপারেশন সার্চলাইটের বড় লক্ষ্য ছিল হিন্দু অধ্যূষিত পুরাতন ঢাকা। সায়মন ও মিশেল প্রায় প্রাণ হাতে নিয়ে এই এলাকায় গিয়েছিলেন সংবাদের জন্য তথ্য ও ছবি সংগ্রহে। প্রতিবেদনের পরের দিকে সায়মন বর্ণনা দিয়েছেন পুরাতন ঢাকায় পাকিস্তানি বর্বরতার। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ঢাকার পুরো অভিযানের মধ্যে সবচেয়ে বড় হত্যাকাণ্ডের একটি ঘটেছিল পুরাতন ঢাকার হিন্দু এলাকায়। সেখানে সৈন্যরা লোকজনকে তাদের ঘরবাড়ি থেকে বের করে এনে দলে দলে গুলি করে। (ট্যাঙ্কস্ ক্রাশ রিভোল্ট ইন পাকিস্তানের ভাবানুবাদ, দ্য ডেইলি টেলিগ্রাফ, ৩০ মার্চ ১৯৭১) এখানে উল্লেখ করা প্রয়োজন, পাকিস্তান সেনা কর্তৃপক্ষ বরাবরই পূর্ব পাকিস্তানের স্বাধিকার আন্দোলনকে ভারতীয় ষড়যন্ত্র, হিন্দুদের ষড়যন্ত্র হিসেবে চিত্রিত করেছে। যে কারণে হিন্দুদের উপর পাকিস্তানি সেনাদের প্রবল আক্রোশ ছিল। সে কারণেই পুরাতন ঢাকার হিন্দু এলাকাগুলির এই ভয়াবহ বর্ণনা আন্তর্জাতিক মনোযোগ আকর্ষণ করে। সায়মন এবং মিশেলই জানতে পারেন যে, ২৬শে মার্চ মধ্যরাতে এই এলাকায় পাকিস্তানি সেনাবাহিনী আক্রমণ চালায়। সেসময় পুরাতন ঢাকায় প্রায় ৭০০ মানুষকে হত্যা করে পাকিস্তানি সেনারা। সায়মনের ভাষ্য, এই হত্যাকাণ্ডের সময় যারা বাড়ির ভিতরে লুকিয়ে ছিলেন তাদের অনেককেই জীবন্ত পুড়িয়ে মারা হয়।

রিপোর্ট প্রস্তুত ছিল এক কঠিন কাজ

বিধ্বস্ত, অনেকটা মৃত নগরীর খবর এবং ছবি সংগ্রহের পর সায়মন ও মিশেল ঢাকা থেকে বের হওয়ার পথ খোঁজা শুরু করেন। সেই সময় পাকিস্তান এয়ারলাইন্স (পিআইএ) প্রচুর অতিরিক্ত ফ্লাইট পরিচালনা করছিল। সেই জরুরি পরিস্থিতিতে নিরাপত্তার স্বার্থে বিমানে যাত্রী পরিবহনের জন্য টিকিটের বিপরীতে নম্বর ইস্যু করা হতো। সায়মন ও মিশেলের কাছে টিকিট ছিল কিন্তু নম্বর ছিল না। ভাগ্যক্রমে ইন্টারকন্টিনেন্টাল হোটেলে থাকা দুই জার্মান নাগরিক তাদের দুটি নম্বর দেন। তারপর তারা পরিকল্পনা করেন কীভাবে ক্যামেরার ফিল্ম এবং সংবাদের নোট অক্ষত রাখা যায়। সেই শ্বাসরুদ্ধকর সময়ে সায়মন ঢাকায় ব্রিটিশ হাইকমিশনের অফিসে গিয়েছিলেন। কিন্তু তারা সহযোগিতা করেনি। অভিজাত ব্রিটিশদের মতো আচরণ করে দূতাবাসের কর্মকর্তারা বেশ অপমানজনকভাবে বলেছিলেন, কোনও উপায় নেই। তবে ঢাকার পূর্ব জার্মান দূতাবাস অফিস সায়মনকে সহযোগিতার আশ্বাস দেয়। তারা কূটনৈতিক ট্যাগসহ ক্যামেরার রিল পাঠাতে রাজি হয়। সায়মন এবং মিশেল পূর্ব জার্মান হাইকমিশনে অর্ধেক রিল (৯টি রোল) জমা দিয়েছিলেন। কথা ছিল ছবিগুলো বন শহরে (পশ্চিম জার্মার্নির রাজধানী) পৌঁছানোর পর এপির কর্মকর্তারা সেগুলো নিয়ে যাবেন। কিন্তু তা হয়নি। পাকিস্তানি গণহত্যার সেই মূল্যবান ছবিগুলো চিরতরে হারিয়ে যায়। সেগুলো কখনো জার্মানিতে পৌঁছায়নি।

ঢাকা বিমানবন্দরে সায়মন এবং মিশেলের অভিজ্ঞতা ছিল ভয়াবহ। সাইমন সত্যিই ভীত ছিলেন। কিন্তু ভাগ্যক্রমে সেদিন বিমানবন্দরে বিমানবাহিনীর কর্মকর্তারা দায়িত্বে ছিলেন। তাই সেই কর্মকর্তারা তাদের চিনতে পারেননি। মিশেল এবং সায়মন আলাদাভাবে কাস্টমসে যান। সব ব্যাগ ঠিকমতো পরীক্ষা করা হয়। কর্মকর্তারা ব্যাগে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের কিছু মানচিত্র পান। তাদের সন্দেহ বেড়ে যায়। জিজ্ঞাসাবাদ চলতে থাকে। তবে সে যাত্রায় কিছু বই সায়মন এবং মিশেলকে বাঁচিয়েছিল। সায়মন অফিসারকে বলেছিলেন, তাঁরা পর্যটক, পূর্ব পাকিস্তান ভ্রমণে এসেছিলেন। ঢাকা বিমানবন্দরে তারা কোনমতে বেঁচে যান। সাময়ন জুতার মোজা এবং টুথপেস্ট টিউবে কিছু ছবির ফিল্ম এবং রিপোর্টিং  নোট লুকিয়ে রেখেছিলেন। সেগুলো নিয়ে কোনমতে তারা ঢাকা ছাড়েন।

১৯৭১ সালে ভারতীয় আকাশসীমায় পাকিস্তানি বিমান নিষিদ্ধ থাকায় পাকিস্তানি বাণিজ্যিক বিমানগুলি কলম্বো হয়ে চলাচল করতো। সায়মন ঢাকা থেকে সিলন (এখন শ্রীলঙ্কা) পৌঁছান। সেখানে এক ঘন্টার ট্রানজিট ছিল। তিনি ব্রিটিশ হাইকমিশনে ফোন করেন। কিন্তু ফলাফল একই। কিন্তু হাইকমিশন বলা হয়, দুঃখিত! কোনও সাহায্য করার সুযোগ নেই। সায়মন ও মিশেল উঠে পড়েন করাচীগামী বিমানে। সেখানে তাদের জন্য অপেক্ষা করছিল আরও বড় বিপদ।

করাচিতে সাময়ন ও মিশেলের সব লাগেজ খোলা হয়। পরীক্ষা করা হয় তন্নতন্ন করে। সেখানকার অফিসাররা তাদেরকে সাংবাদিক সন্দেহ করেছিলেন। সায়মনকে সম্পূর্ণ বিবস্ত্র করা হয়েছিল। পরীক্ষা করা হয় তার পায়ুপথও। তবে সেখানেও সায়মন চালাকি করে মোজা খুলেছিলেন। যাতে মোজার ভেরতেই সংবাদ প্রতিবেদনের নোটগুলি থাকে। সায়মনের ধারণা ছিল মেজর সিদ্দিক সালিকের কোন এক বার্তার প্রেক্ষিতে তাদের পুঙ্খানুপুঙ্খ চেক-আপ চলছিল। তবে এক পর্যায়ে করাচির কর্মকর্তারা তাদের ছেড়ে দেয়। করাচি থেকে প্যান অমেরিকা এয়ালাইন্সের বিমানটি ব্যাংককের উদ্দেশ্যে আকাশে উড়ে যায়।

বিমানের ভেতেরেই জুতার ভেতর থেকে নোটগুলি বের করে সংবাদ লিখতে শুরু করেন সায়মন জন ড্রিং। ছোট ছোট, দুমড়ে মুচড়ে দলা পাকা নোটগুলির সাহায্যেই লেখা হতে থাকে বাংলাদেশের উপর পাকিস্তানি গণহত্যার প্রথম প্রতিবেদন। যার শিরোনাম ‘ট্যাঙ্কস ক্রাশ রিভোল্ট ইন পাকিস্তান’। এটি এখন বাংলাদেশের গৌরবময় ইতিহাসের অংশ।

সাংবাদিক সায়মন জন ড্রিং ২০২১ সালের জুলাইয়ে ৭৬ বছর বয়সে রোমানিয়ায় মারা যান।

(লেখক, সহকারী অধ্যাপক, গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়)  

(দ্য ডেইলি স্টারের সম্পাদকীয় নীতিমালার সঙ্গে লেখকের মতামতের মিল নাও থাকতে পারে। প্রকাশিত লেখাটির আইনগত, মতামত বা বিশ্লেষণের দায়ভার সম্পূর্ণরূপে লেখকের, দ্য ডেইলি স্টার কর্তৃপক্ষের নয়। লেখকের নিজস্ব মতামতের কোনো প্রকার দায়ভার দ্য ডেইলি স্টার নেবে না।)

তথ্যসূত্র:

1.    Tanks Crush Revolt in Pakistan (30th March, 1971), The Daily Telegraph. London.

2.    সাক্ষাৎকার, সায়মন জন ড্রিং (২০১৩), ঢাকা।

3.    ‘Simon Dring, reporter who covered conflicts around the world and was made an honorary citizen of Bangladesh – obituary’ (2 July 2021), The Telegraph (online), Retrieved on 08-12-2025, https://www.telegraph.co.uk/obituaries/2021/07/22/simon-dring-reporter-covered-conflicts-around-world-made-honorary/