মাহফুজ আনামের কলাম

গণতন্ত্রের প্রাতিষ্ঠানিকীকরণে সরকারি ও বিরোধী দলের সম্পর্কই আসল

আমরা কি অতীতের ভুল থেকে শিক্ষা নিতে চাই?
মাহফুজ আনাম
মাহফুজ আনাম

১৯৯১ সালের ফেব্রুয়ারিতে পঞ্চম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ফলাফল দেখে বিএনপি ও আওয়ামী লীগ দুই দলই বিস্মিত হয়। বিএনপি জয়ের জন্য এবং আওয়ামী লীগ পরাজয়ের জন্য প্রস্তুত ছিল না। আওয়ামী লীগ ধরেই নিয়েছিল, তারা ক্ষমতায় যাচ্ছে। এমনকি ঠাট্টার ছলে বলা হতো, আওয়ামী লীগের নেতারা নাকি শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠানের জন্য পোশাকও ইস্ত্রি করে রেখেছিলেন।

১৯৭২ সালে বাংলাদেশ সংসদীয় পদ্ধতিতে যাত্রা শুরু করে। সেই ব্যবস্থা বাতিল করে ১৯৭৫ সালে বাকশাল কায়েমের মাধ্যমে রাষ্ট্রপতিশাসিত সরকার পদ্ধতি চালু করা হয়। স্বৈরশাসন পরবর্তী সময়ে দেশের প্রথম প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার উদ্যোগে ১৯৯১ সালের সেপ্টেম্বরে আবারও ফিরে আসে সংসদীয় ব্যবস্থা।

তৎকালীন বিরোধী দল আওয়ামী লীগের দাবি মেনে নিয়ে খালেদা জিয়া সংসদীয় ব্যবস্থা ফেরান। অথচ, সেই নির্বাচনে বিএনপির দলীয় ইশতেহারে রাষ্ট্রপতিশাসিত সরকার ব্যবস্থার কথাই বলা ছিল। তারপরও খালেদা জিয়া আওয়ামী লীগ ও অন্যান্য বিরোধী দলের দাবি মেনে নিয়েছিলেন।

আমার দৃষ্টিতে, এটি ছিল সরকার ও বিরোধী দলের মধ্যে সহযোগিতামূলক সম্পর্ক সূচনার এক অনন্য সুযোগ। সেটা স্বাভাবিকভাবেই হওয়ার কথা ছিল। কারণ, সরকারি দল বিরোধী দলের মতামতকে গুরুত্ব দিয়ে সরকারব্যবস্থার ধরনই বদলে দিয়েছিল। সংসদ নেতা হিসেবে খালেদা জিয়া তার প্রয়াত স্বামীর পথ ধরে রাষ্ট্রপতি হতে পারতেন। কিন্তু, তিনি তা না করে এক নতুন পথে হাঁটলেন। এর মাধ্যমে সরকারি দল ও বিরোধী দলের পারস্পরিক সহযোগিতার ওপর ভিত্তি করে আমাদের একটি গঠনমূলক যাত্রার সূচনা হওয়ার কথা ছিল।

 

দুর্ভাগ্যবশত, সেটা হয়নি। দক্ষিণ এশিয়ার অন্যান্য দেশের মতোই এ দেশেও বিরোধী দল কখনোই তাদের প্রাপ্য স্বীকৃতি, পরিসর ও অধিকার পায়নি। কেন বিরোধী দলকে ‘অপেক্ষমান সরকার’ বলা হয় কিংবা ওয়েস্টমিনস্টার পদ্ধতিতে কেন তাদের কাছ থেকে ‘ছায়া মন্ত্রিসভা’ গঠনের প্রত্যাশা করা হয়, সেটা বোঝার চেষ্টা আমরা কখনো করিনি। এসবের অর্থ হলো, সংসদীয় ব্যবস্থায় সরকারি ও বিরোধী দল মিলেই সামগ্রিক শাসনপ্রক্রিয়া গঠন করে। এখানে বিরোধী দল সংসদে সুশৃঙ্খল, নীতি-আদর্শভিত্তিক ও জবাবদিহিমূলক কার্যক্রমের মাধ্যমে শাসনপ্রক্রিয়ায় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।

১৯৯১ সালে আমরা ভুল পথে, আরও সুনির্দিষ্ট করে বললে বিপরীতমুখী গণতান্ত্রিক যাত্রা শুরু করেছিলাম। শেখ হাসিনা ওই নির্বাচনে ‘সূক্ষ্ম কারচুপি’র অভিযোগ তুলেছিলেন। যেহেতু নির্বাচনকে ‘জনরায়’ হিসেবেই তারা দেখেনি, তাই সেই রায় মানার ক্ষেত্রে বিরোধী দল নৈতিক বাধ্যবাধকতাও দেখায়নি। বিরোধী দলের প্রস্তাবিত সংসদীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করাকে বিএনপির ‘সমঝোতা’ বা ‘সহযোগিতার মনোভাব’ হিসেবে দেখেনি আওয়ামী লীগ। তারা বরং ধরেই নিয়েছিল এটা বিএনপির পরাজয়। যার ফলে গঠনমূলক বিরোধিতার বদলে বিরোধী দলের কাছ থেকে আমরা আরও আগ্রাসী ও প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টিকারী আচরণ দেখেছি। যার লক্ষ্য ছিল সরকারকে অকার্যকর করে দেওয়া এবং তাদের শুধু ব্যর্থ নয়, বরং অযোগ্য ও ক্ষমতায় থাকার অনুপযুক্ত হিসেবে উপস্থাপন করা। এর মাধ্যমে এমন একটি ধারণা তৈরির চেষ্টা করা হয়েছিল যে, সরকারকে ক্ষমতা ছাড়তে বাধ্য করাটা যৌক্তিক।

দ্য ডেইলি স্টারের শুরুর দিকের সেই দিনগুলোতে আমি সংবাদ সম্মেলন, সেমিনার, আলোচনা ও সংসদ অধিবেশনসহ (আমার ‘ফ্রম দ্য গ্যালারি’ কলামের জন্য) সব জায়গায় যেতাম। সম্ভবত ১৯৯২ বা ১৯৯৩ সালে সংসদ অধিবেশন চলাকালে বিরতির সময় আমি বিরোধীদলীয় নেতা শেখ হাসিনার কক্ষে যাই এবং সমসাময়িক বিভিন্ন বিষয় নিয়ে তার সঙ্গে কথা বলছিলাম। এমন সময় অধিবেশন শুরুর ঘণ্টা বেজে উঠল। হঠাৎ শেখ হাসিনা চিৎকার করে বলে উঠলেন, ‘ওয়াকআউট, ওয়াকআউট’। ওই কক্ষে থাকা কয়েকজনকে বললেন, দলের বাকি সংসদ সদস্যদের এটা জানিয়ে দিতে। কিছুক্ষণ পর দুই সংসদ সদস্য মতিয়া চৌধুরী ও তোফায়েল আহমেদ সেখানে এসে এর কারণ জানতে চাইলেন। কারণ ওয়াকআউট করার মতো কোনো ঘটনাই ঘটেনি। কিছুক্ষণ পর ঝাঁঝালো কণ্ঠে শেখ হাসিনা বললেন, ‘আপনাদের যা খুশি করেন।’ তার সেই জবাব থেকে স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছিল, ওয়াকআউট করার সিদ্ধান্ত মানতে না চাওয়ায় তিনি খুশি ছিলেন না।

‘জনগণের সদন’ বা সংসদের কার্যক্রমের প্রতি বিরোধীদলীয় নেতার মনোভাব কতটা তাচ্ছিল্যপূর্ণ হতে পারে, তার প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা আমার সেটাই ছিল। এরপর ১৯৯৬ সালের নির্বাচনের আগে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবি উঠতে দেখলাম আমরা। তখনো নির্বাচনের কয়েক বছর বাকি। কিন্তু, এই দাবিতে ঘন ঘন ‘ওয়াকআউট’, পরে ‘বয়কট’ এবং শেষ পর্যন্ত পদত্যাগের ঘটনা ঘটে, যার ফলে সংসদ পুরোপুরি একপাক্ষিক এবং কার্যত অকার্যকর হয়ে পড়ে।

সংসদের ভেতরে যখন এই পরিস্থিতি, রাজপথে তখন চলছিল সহিংসতা, পুলিশের সঙ্গে লাগাতার সংঘর্ষ এবং বিশৃঙ্খলা। ঘন ঘন হরতালের ডাক। একদিন, দুদিন, তিনদিন, এমনকি একসময় পুরো সপ্তাহ হরতাল থাকতো। এর ফলে সাধারণ মানুষের মধ্যে সংসদের প্রতি অশ্রদ্ধা তৈরি হয়। অজান্তেই আমরা আমাদের কাজ, সময়সূচি ও সময়সীমার ব্যাপারে উদাসীন হয়ে পড়ি। সেটার প্রভাব পড়ে আমাদের কর্মসংস্কৃতির ওপর। এমনকি আজও আমরা সেই অবস্থা থেকে পুরোপুরি বেরিয়ে আসতে পারিনি।

পরিহাসের বিষয় হলো, বিরোধী দলের কর্মকাণ্ড যতই ধ্বংসাত্মক হোক না কেন, পরবর্তী নির্বাচনে তারাই জয়ী হতো। ১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ, ২০০১ সালে বিএনপি এবং ২০০৯ সালে আবার আওয়ামী লীগ জয়ী হয়। তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থার ফলে এমন একটি ধারা তৈরি হয় যে, ক্ষমতাসীন দল সবসময়ই নির্বাচনে হেরে যায়। যার ফলে বিরোধী দলের মনে এই নেতিবাচক ধারণা গেঁথে যায়, তাদের রাজনীতি যত ধ্বংসাত্মকই হোক না কেন, তা ক্ষমতাসীন সরকারকে ক্ষমতাচ্যুত করতে ভূমিকা রাখে। স্থিতিশীলতা ও সামাজিক শান্তি বজায় রাখার ক্ষেত্রে বিরোধী দলের কোনো দায়বদ্ধতা ছিল না।

আওয়ামী লীগ আঁচ করতে পেরেছিল, এই ধারা অব্যাহত থাকলে তারা পরবর্তী নির্বাচনে হেরে যাবে। সেজন্যই ২০০৯ সালে ক্ষমতা গ্রহণের পর পরবর্তী নির্বাচনের আগেই ২০১১ সালে তত্ত্বাবধায়ক ব্যবস্থা বাতিল করে দেয়। ক্ষমতাসীন দলের অধীনেই নির্বাচন আয়োজনের বৈধতা প্রতিষ্ঠা করে তারা। যার পরিণতিতে আমরা ২০১৪, ২০১৮ ও ২০২৪ সালের সম্পূর্ণ কারচুপিপূর্ণ নির্বাচন প্রত্যক্ষ করি।

কারচুপির নির্বাচনের প্রভাব আমাদের প্রায় সব প্রতিষ্ঠানে পড়ে। পুলিশ, আমলাতন্ত্র, গোয়েন্দা সংস্থা, নিম্ন আদালত ও সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে রাজনীতিকীকরণ হয়। বেসরকারি খাতকেও সরকারের অনুগত থাকার জন্য প্রচণ্ড চাপের মুখে পড়তে হয়েছিল।

বর্তমান পরিস্থিতিতে গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে শক্তিশালী করতে হলে আমাদের অতীতের ব্যর্থতা থেকে শিক্ষা নিতে হবে এবং সংসদকে সত্যিকার অর্থে কার্যকর করার মধ্য দিয়ে এর শুরু করতে হবে। গণতান্ত্রিক যাত্রা নতুন করে শুরু করার জন্য জুলাই গণঅভ্যুত্থান আমাদের সামনে এক নতুন সুযোগ এনে দিয়েছে এবং এর সর্বোচ্চ সদ্ব্যবহার করতে হবে।

তবে নতুন সংসদেও আমাদের শুরুটা খুব একটা সুখকর ছিল না। গণভোট অনুযায়ী সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠনের জন্য শপথ নিতে বিএনপি রাজি না হওয়ায় জামায়াতের সঙ্গে তাদের মতপার্থক্যের শুরু হয়। অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের নির্দেশনায় আইনপ্রণেতাদের একইসঙ্গে সংসদ সদস্য ও সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালনের বিধান রাখা হয়েছিল।

দ্বিতীয় বিষয়টি হলো, বিরোধী দলের সঙ্গে আলোচনা না করেই অন্তর্বর্তী সরকারের ১৩৩টি অধ্যাদেশের মধ্যে ১৬টি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যাদেশের মেয়াদ শেষ হতে দিয়েছে বিএনপি। এসব অধ্যাদেশের মধ্যে বিচার বিভাগের স্বাধীনতা, গুম এবং দুর্নীতি দমন ও মানবাধিকার কমিশনকে শক্তিশালী করার মতো বিষয় অন্তর্ভুক্ত ছিল।

সংসদের তৃতীয় অধিবেশনে সরকার ও বিরোধী দলের দূরত্ব আরও বেড়ে যায়। এই অধিবেশনে ছয়টি বিল পাস হয়, যেগুলোর বিরোধিতা করেছে বিরোধী দল। বিশেষ করে গুম, মানবাধিকার কমিশনসহ যেসব বিষয়সংক্রান্ত অধ্যাদেশের মেয়াদ শেষ হতে দেওয়া হয়েছিল, সেসব বিষয়ে উত্থাপন করা বিলগুলোর কঠোর সমালোচনা করে তারা।

এরপর আসে আরও বড় ধাক্কা। ৫০টি সংসদীয় কমিটির সভাপতি পদের মধ্যে বিরোধী দলকে দেওয়া হয় মাত্র একটি—পাবলিক অ্যাকাউন্টস কমিটি। অথচ, বিরোধী দলের দাবি ছিল ২৬ শতাংশ সংসদীয় কমিটির সভাপতি পদ।

সংবিধান সংশোধনে ১৭ সদস্যের সংসদীয় কমিটি গঠনে বিএনপির উদ্যোগ এবং সেখানে বিরোধী দলের পাঁচজন সদস্য দেওয়ার প্রস্তাবও তারা গ্রহণ করেনি। কারণ, বিরোধী দলের দাবি ছিল, এটি জুলাই সনদ পরিপন্থী। এখন পর্যন্ত এই কমিটি জুলাই সনদে সই করা সব দলকে তাদের মতামত জানানোর জন্য আমন্ত্রণ জানিয়েছে, যেখানে বিরোধী জোট অংশ নেয়নি।

এটা স্পষ্ট যে বিরোধী দলের উত্থাপন করা কিছু বিষয় নিয়ে ক্ষমতাসীন বিএনপি আরও সতর্ক ও বিচক্ষণ হতে পারত। আমরা মনে করি, বিরোধী দলের যুক্তিগুলো বিবেচনা করার মতো যথেষ্ট যৌক্তিক কারণ রয়েছে এবং শুরুর দিকের কিছু লক্ষণ বেশ উদ্বেগজনক। দুইপক্ষের মতপার্থক্য থাকা স্বাভাবিক। বিরোধী দল সরকারি দলের কঠোর সমালোচনা করবে, সেটিও স্বাভাবিক ও যৌক্তিক।

আমরা আগেও বলেছি, আবারও বলছি—বিরোধী দলের রাজপথে নামার হুমকি দেওয়ার মতো সময় এখনো আসেনি। সরকারের ব্যর্থতা ও ঘাটতি তুলে ধরা, দলীয় নিয়োগ প্রকাশ্যে আনা এবং দুর্নীতির যেকোনো ঘটনা উন্মোচন করা উচিত। কিন্তু সরকারকে অস্থিতিশীল করার হুমকি, অনিশ্চয়তার পরিবেশ সৃষ্টি এবং একটি বিশ্বব্যাপী স্বীকৃত নির্বাচনের পরও জনমনে রাজনৈতিক অনিশ্চয়তার ভয় তৈরি করা কোনোভাবেই যৌক্তিক বা গ্রহণযোগ্য নয়।

আমরা যদি সত্যিই বাংলাদেশকে এগিয়ে নিতে চাই, তাহলে ক্ষমতাসীন দলকে বিরোধী দলের দাবির প্রতি আরও সহনশীল এবং বিরোধী দলকে তাদের কর্মকাণ্ড ও বক্তব্যে আরও সংযত ও পরিণত হওয়ার আহ্বান জানাই। আমাদের সংসদীয় গণতন্ত্র যাতে কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্য পূরণ করতে পারে, তার জন্যও এটি অপরিহার্য।

মাহফুজ আনাম: সম্পাদক ও প্রকাশক, দ্য ডেইলি স্টার