নির্বাচকদের অগ্নিপরীক্ষা ও ব্যাটিং অর্ডারের গোলকধাঁধা

ক্রীড়া প্রতিবেদক

সাবেক অধিনায়ক হাবিবুল বাশারের হাত ধরে যে নতুন নির্বাচক প্যানেল যাত্রা শুরু করেছে, তাদের কাঁধে এখন বিশাল গুরুভার। ২০২৭ ওয়ানডে বিশ্বকাপের আগে একটা থিতু দল বানাতে হবে। এই পথে তাদের প্রথম এবং প্রধান অগ্নিপরীক্ষা হবে ব্যাটিং অর্ডার ঠিক করা।

নির্বাচকদের এমন এক ব্যাটিং ইউনিটকে পরিচর্যা করতে হবে, যেখানে প্রতিটি পজিশন থাকবে নিশ্ছিদ্র। যেখানে নিয়মিত একাদশের পাশাপাশি ড্রেসিংরুমে তৈরি থাকবে যোগ্য ও কার্যকর বিকল্প ক্রিকেটার।

দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্য, বাংলাদেশের ব্যাটিং লাইনআপে, বিশেষত ওডিআই সংস্করণে স্থিতিশীলতা যেন এখন এক সোনার হরিণ। দলের এই অস্থিরতার সবচেয়ে বড় প্রমাণ গত পাঁচ বছরের পরিসংখ্যান— এই সময়ে ওয়ানডেতে বাংলাদেশ মোট ২২টি ভিন্ন ওপেনিং জুটি ব্যবহার করেছে। আর এই অন্তহীন পরীক্ষা-নিরীক্ষার জাঁতাকলে পিষ্ট হয়ে সবচেয়ে বড় শিকারে পরিণত হয়েছেন সৌম্য সরকার।

২০১৪ সালে রাজকীয় অভিষেকের পর থেকে দলের কাঠামোতে থিতু হতে না পারা সৌম্যর ক্যারিয়ার যেন এক গোলকধাঁধা। গত পাঁচ বছরেই তিনি চারটি ভিন্ন ওপেনিং জুটির অংশ ছিলেন। গত বছরের অক্টোবরে ঘরের মাঠে ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে ৮৬ বলে ৯১ রানের সেই বিধ্বংসী ও ম্যাচ জেতানো ইনিংসটিও তাঁর ভাগ্যের শিকা ছিঁড়তে পারেনি; গত মাসে পাকিস্তানের বিপক্ষে ঠিক পরের সিরিজে তাকে মাঠের বাইরে বসে থাকতে হয়েছে।

পাকিস্তান সিরিজে তিন ম্যাচেই ইনিংসের সূচনা করেছেন সাইফ হাসান ও তানজিদ হাসান তামিম। সাইফ রানের দেখা না পেলেও বাংলাদেশ ২-১ ব্যবধানে সিরিজ জয় করায় ‘উইনিং কম্বিনেশন’ ভাঙার চিরাচরিত অনীহা সৌম্যর সামনে দেয়াল হয়ে দাঁড়ায়। ফলে নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে আসন্ন সিরিজেও তার একাদশে ফেরার পথটা বেশ কণ্টকাকীর্ণ।

৩৩ বছর বয়সী এই ক্রিকেটারের জাতীয় দলে সুযোগ আসা-যাওয়ার চিত্রটি অনেকটা ‘মিউজিক্যাল চেয়ার’ খেলার মতোই অনিশ্চিত। এমনকি এক সময় তাকে ৭ নম্বর পজিশনে পাঠিয়েও পরখ করা হয়েছে। তবে নির্বাচক প্যানেলের এক সদস্যের মতে, দায়টা সৌম্যরও কম নয়। আক্ষেপ করে তিনি বলেন, ‘সৌম্য এমন এক প্রতিভার নাম, যাঁর দলের মূল ব্যাটিং স্তম্ভ হওয়ার কথা ছিল। তার মতো সামর্থ্যবান খেলোয়াড়কে ছাড়া দল গঠনের ভাবনা আসাটাই ছিল অবিশ্বাস্য। কিন্তু আফসোস, তিনি নিজের জায়গাটা আগলে রাখতে পারেননি।’

একজন স্বীকৃত ওপেনারকে ৭ নম্বরের মতো পজিশনে নামিয়ে দেওয়া বাংলাদেশ ক্রিকেটের গভীর কোনো সংকটেরই বহিঃপ্রকাশ। নাম প্রকাশ না করার শর্তে দলের এক কর্মকর্তা ক্ষোভ ঝেড়ে বলেন, ‘একজন ওপেনারকে ৭ নম্বরে পাঠানোর সময় নীতি-নির্ধারকরা আসলে কী ভাবছিলেন? কোনো ক্রিকেটারের ক্যারিয়ার ধ্বংস করতে চাইলে এভাবেই করা যায়। তবে সৌম্যরও উচিত ছিল বুক চিতিয়ে বলা যে, তিনি ওই পজিশনে খেলবেন না।’

মুশফিকুর রহিম ও মাহমুদউল্লাহর মতো অভিজ্ঞদের প্রস্থানে মিডল অর্ডারের রিক্ততা এখন আরও প্রকট। জাকের আলি, মাহিদুল ইসলাম কিংবা শামীম হোসেনদের ব্যর্থতায় রিজার্ভ বেঞ্চে নতুন কোনো আশার আলো না থাকায় ম্যানেজমেন্টকে আবারও সেই পুরনো ও ব্রাত্য নামগুলোর কাছেই ফিরে যেতে হচ্ছে।

আফিফ হোসেন পাকিস্তান সিরিজ দিয়ে ওডিআইতে প্রত্যাবর্তন করেছেন। অন্যদিকে কোচ ফিল সিমন্সের বিশেষ আগ্রহে ক্যাম্পে ডাকা হয়েছে মোসাদ্দেক হোসেনকে, যিনি ২০২২ সালের পর দেশের জার্সিতে কোনো সংস্করণেই খেলার সুযোগ পাননি। এই ৩০ বছর বয়সী অলরাউন্ডারের ওপরও সতর্ক নজর রাখছেন নির্বাচকরা। প্যানেলের এক সদস্যের ভাষ্যমতে, মোসাদ্দেককে ২০২৭ সাল পর্যন্ত লড়ার মতো শারীরিক সক্ষমতা অর্জনের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে এবং তার বর্তমান প্রচেষ্টা বেশ ইতিবাচক।