জঁ ফঁতেঁ: ধার করা বুটে ১৩ গোলের অস্পৃশ্য রেকর্ড
১৯৫৮ সালের সুইডেন বিশ্বকাপ। সেই সময়ের ফ্রান্স দল ছিল প্রতিভায় ভরপুর, কিন্তু বিশ্বকাপের মঞ্চে তারা কখনোই ছিল না অপ্রতিরোধ্য শক্তি। অথচ এই এক আসরেই তারা হয়ে উঠেছিল এক বিস্ময়ের নাম, আর সেই বিস্ময়ের কেন্দ্রে ছিলেন জঁ ফঁতেঁ। ছিলেন ফ্রান্সের আক্রমণভাগের অন্যতম প্রধান সেনাপতি। মরক্কোর মারাকেশে জন্ম নেওয়া এই স্ট্রাইকারের পায়ের জাদুতে তখন বুঁদ পুরো ইউরোপ।
কিন্তু বিশ্বমঞ্চে নিজের শ্রেষ্ঠত্বের মুকুট পরার ঠিক আগমুহূর্তে নেমে এল এক অনাকাঙ্ক্ষিত আঁধার। অনুশীলনের তীব্রতায় হঠাৎই ছিঁড়ে টুকরো হয়ে গেল তার সবচেয়ে আপন, সবচেয়ে বিশ্বস্ত অস্ত্র, তার বুটজোড়া। আধুনিক যুগের মতো স্পনসরদের পাঠানো ঝাঁ চকচকে বুটের পাহাড় সে যুগে ছিল না, চাইলেই প্যারিস থেকে নতুন জুতো আনানোর মতো সময়ও ছিল না। স্বপ্নের খুব কাছাকাছি দাঁড়িয়ে এক চরম শূন্যতা আর অনিশ্চয়তা এসে গ্রাস করল এই ফরাসি গোলমেশিনকে। নিজের সবচেয়ে বড় সম্বল হারিয়ে এক মহাতারকা তখন একাকী এবং নিদারুণ অসহায়।
ঠিক সেই ঘোর অমানিশায় ত্রাতার ভূমিকায় অবতীর্ণ হলেন আরেক ফরাসি। তিনি ফরাসি দলেরই রিজার্ভ ফরোয়ার্ড, স্তেফান ব্রুয়ে। নিয়তির কী অদ্ভুত জাদুকরী খেয়াল, ব্রুয়ে এবং ফঁতেঁর পায়ের মাপ ছিল একেবারে নিখুঁতভাবে এক! একজন স্ট্রাইকারের কাছে তার বুট কতটা দামি, তা ব্রুয়ে খুব ভালো করেই জানতেন। তবু সতীর্থের এমন বিপদে কোনো দ্বিতীয় চিন্তা ছাড়াই তিনি নিজের অতিরিক্ত বুটজোড়া নিঃসংকোচে এগিয়ে দিলেন ফঁতেঁর দিকে। বললেন, 'এটা পরে নাও।'
একজোড়া বুট, যার সাথে ফঁতেঁর কোনো স্মৃতি নেই, কোনো অভ্যাস নেই, কোনো আত্মীয়তা নেই। কিন্তু কখনো কখনো জীবনের সবচেয়ে বড় গল্পগুলোই তৈরি হয় এমন অচেনা জিনিসের হাত ধরে। সেই ধার করা বুট পায়ে গলিয়েই ফঁতেঁ নামলেন বিশ্বমঞ্চে। কিন্তু কে জানত, এই ধার করা বুটের তলাতেই লেখা হতে যাচ্ছে ইতিহাসের সবচেয়ে দুর্ভেদ্য এক অধ্যায়!
সেই জুতোর ভেতর কোনো অতিপ্রাকৃত জাদু লুকিয়ে ছিল কি না, তা নিয়ে আজও হয়তো রূপকথার আসরে তর্ক হতে পারে। কিন্তু সুইডেনের হিমশীতল বাতাসে সবুজ গালিচায় ফঁতেঁ যখন পা রাখলেন, সেই বুটজোড়া যেন পরিণত হলো এক বিধ্বংসী অস্ত্রে।
সুইডেনের সেই সবুজ মাঠে যখন সূর্যের আলো পড়ছিল, তখন হয়তো কেউ বুঝতে পারেনি, একজন মানুষ নিজের পায়ে শুধু বুট পরেননি, তিনি পরেছিলেন ইতিহাস। প্রতিটি গোলের সাথে তিনি একটু একটু করে উঠে গিয়েছিলেন অমরত্বের দিকে, আর শেষ বাঁশি বাজতেই তিনি হয়ে গিয়েছিলেন কিংবদন্তি।
প্রথম ম্যাচেই যেন তিনি ঘোষণা দিলেন, তিনি এখানে শুধু অংশ নিতে আসেননি, ইতিহাস লিখতে এসেছেন। প্রতিটি গোল যেন ছিল একেকটি বজ্রপাত, প্রতিটি দৌড় যেন ছিল একেকটি কবিতার পংক্তি। প্রতিপক্ষের রক্ষণভাগ তার সামনে দাঁড়িয়ে থেকেও তাকে থামাতে পারছিল না, যেন তিনি এমন এক ছন্দে খেলছিলেন যা অন্য কারো পক্ষে বোঝা সম্ভব নয়। ধার করা বুটে তার পা যেন আরও মুক্ত, আরও নির্মম হয়ে উঠেছিল।
গ্রুপ পর্বে গোলের বন্যা বইয়ে তিনি যখন নকআউটে পৌঁছালেন, তখন পুরো বিশ্ব তার দিকে তাকিয়ে। তিনি কি থামবেন? না, তিনি থামলেন না। বরং প্রতিটি ম্যাচে নিজের সীমাকে নতুন করে সংজ্ঞায়িত করলেন। সেমিফাইনালে ব্রাজিলের বিপক্ষে ফ্রান্স হেরে গেলেও, ফঁতেঁর ব্যক্তিগত উজ্জ্বলতা ম্লান হয়নি। তার চোখে তখনও ছিল সেই আগুন, সেই অনিবার্যতার ছাপ, যা তাকে আলাদা করে রেখেছিল সবার থেকে।
আর তারপর এল সেই বিখ্যাত তৃতীয় স্থান নির্ধারণী ম্যাচ। ফুটবল ইতিহাসে যেটি আজও বিস্ময়ের এক অনন্য অধ্যায়। সেই ম্যাচে ফঁতেঁ যেন একাই এক যুদ্ধ জিতলেন, চারটি গোল! প্রতিটি গোল ছিল নিখুঁত, প্রতিটি স্পর্শ ছিল শিল্পের মতো। ধার করা বুটে দাঁড়িয়ে তিনি যেন পৃথিবীকে জানিয়ে দিলেন, অস্ত্র নয়, যোদ্ধার মনই আসল শক্তি।
শেষ পর্যন্ত ছয় ম্যাচে তার গোলসংখ্যা দাঁড়াল ১৩। একটি বিশ্বকাপে ১৩ গোল, এমন সংখ্যা আজও কল্পনার সীমা ছাড়িয়ে যায়। কত কিংবদন্তি এসেছেন, পেলে, লিওনেল মেসি, রোনালদো নাজারিও, মিরোস্লাভ ক্লোসারা বিশ্বকাপ জয় করেছেন, অসংখ্য গোল করেছেন, কিন্তু ফঁতেঁর সেই এক আসরের ১৩ গোলের মাইলফলক কেউ ছুঁতে পারেননি। এটি শুধু একটি রেকর্ড নয়, এটি যেন সময়ের বুকে খোদাই করা এক অমর শিলালিপি।
সতীর্থের নিঃস্বার্থ বদান্যতা আর এক অবিশ্বাস্য প্রতিভার যুগলবন্দিতে রচিত ফঁতেঁর এই উপাখ্যান তাই নিছক কোনো খেলার পরিসংখ্যান নয়; এটি এমন এক কালজয়ী কাব্য। এটি বিশ্বাসের গল্প, এটি প্রতিকূলতাকে জয় করার গল্প, এটি সেই অদৃশ্য শক্তির গল্প যা মানুষকে নিজের সীমার বাইরে নিয়ে যায়। নিজের বুট ছিঁড়ে যাওয়া হয়তো তার জন্য ছিল এক অভিশাপের মতো, কিন্তু সেই অভিশাপই পরিণত করেছিলেন আশীর্বাদে।
আজও যখন বিশ্বকাপের গল্প বলা হয়, তখন সেই ধার করা বুটের শব্দ শোনা যায়, ঘাসের উপর ছুটে চলা, জালের ভেতর বল ঢুকে পড়ার মুহূর্তে এক নীরব বিস্ফোরণ। আর সেই শব্দে ভেসে ওঠে এক নাম জঁ ফঁতেঁ।