৭৭ দিন বাকি

শতাব্দীর সেরা সেভ: গর্ডন ব্যাংকসের অমরত্ব

মেক্সিকোর গুয়াদালাহারার হালিস্কো স্টেডিয়াম। ১৯৭০ সালের ৭ জুন। দুপুরের প্রখর সূর্য তখন মাথার ওপর আগুন ঝরাচ্ছে, আর নিচে সবুজ গালিচায় ফুটবলের দুই ভিন্ন দর্শনের মহারণ। একদিকে 'জোগো বোনিতো' বা সুন্দর ফুটবলের পূজারি, শিল্পের জাদুকর ব্রাজিল; অন্যদিকে নিরেট রক্ষণ আর শৃঙ্খলার মূর্ত প্রতীক, তৎকালীন বিশ্বচ্যাম্পিয়ন ইংল্যান্ড।

হালিস্কোর সেই তপ্ত দুপুরের উত্তাপকে ছাপিয়ে ফুটবল ইতিহাসের সবচেয়ে শীতল ও বিস্ময়কর এক মুহূর্তের জন্ম দিয়েছিলেন ইংল্যান্ডের গোলরক্ষক গর্ডন ব্যাংকস। এটি কেবল একটি সেভ ছিল না; এটি ছিল মানবীয় সীমাবদ্ধতার বিরুদ্ধে এক ঐশ্বরিক বিদ্রোহ। যেখানে একটি মুহূর্তের জন্য থমকে দাঁড়িয়েছিল কালচক্র, আর নিস্তব্ধ হয়ে গিয়েছিল মহাকর্ষের অমোঘ নিয়ম।

ম্যাচের বয়স তখন সবে প্রথমার্ধের মাঝামাঝি।

ব্রাজিলের অধিনায়ক কার্লোস আলবার্তো মাঝমাঠ থেকে বল বাড়ালেন ডান প্রান্তে থাকা উইঙ্গার জাইরজিনিয়োর দিকে। জারজিনিয়ো, যাকে মেক্সিকো বিশ্বকাপের 'হারিকেন' বলা হতো, তিনি ইংলিশ লেফট-ব্যাক টেরি কুপারকে তীব্র গতিতে পেছনে ফেলে ডি-বক্সের দিকে ছুটে গেলেন। একেবারে শেষ মুহূর্তে, বাইলাইনের কাছাকাছি থেকে তিনি বলটি হাওয়ায় ভাসিয়ে দিলেন পেনাল্টি এরিয়ার একেবারে হৃদপিণ্ড বরাবর।

সেখানে আগে থেকেই ওত পেতে ছিলেন পেলে। ফুটবল যার কাছে শিল্প, যার প্রতিটি ছোঁয়ায় জন্ম নেয় গল্প। বলের উচ্চতা, গতির হিসেব আর নিজের অবস্থানের নিখুঁত এক জ্যামিতিক সমীকরণ মেলালেন তিনি। এরপর শূন্যে শরীর ছুঁড়ে দিলেন।

পেলের সেই লাফটি ছিল এক নিখুঁত ভাস্কর্যের মতো। মনে হচ্ছিল, কোনো এক জাদুবলে তিনি মাধ্যাকর্ষণকে উপেক্ষা করে হাওয়ায় ঝুলে আছেন। ঘাড়ের পেশি শক্ত করে, কপালের একেবারে সঠিক জায়গা দিয়ে তিনি বলটিতে প্রচণ্ড বেগে আঘাত করলেন। বলটি তীব্র গতিতে মাটি কামড়ে, গোললাইনের ঠিক সামনে ড্রপ খেয়ে ইংল্যান্ডের গোলপোস্টের একেবারে ডান দিকের নিচের কোণা লক্ষ্য করে ধেয়ে গেল।

পেলের মস্তিস্ক, তার স্নায়ু এবং তার আজীবনের অভিজ্ঞতা বলছিল, এটি গোল। একটি নিখুঁত, অপ্রতিরোধ্য গোল। এমনকি বল জালে জড়ানোর আগেই তিনি আনন্দে 'গোল' বলে চিৎকার করে উঠেছিলেন এবং উদযাপনের জন্য হাত শূন্যে ছুঁড়ে দিয়েছিলেন।

বিজ্ঞান বলে, পৃথিবীর বুকে প্রতিটি বস্তু মাধ্যাকর্ষণ শক্তির দাস। কিন্তু গোলপোস্টের নিচে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষটির নাম যে গর্ডন ব্যাংকস!

জারজিনিয়ো যখন ক্রসটি করেছিলেন, ব্যাংকস তখন গোলপোস্টের বাঁ দিকের পিলারের কাছাকাছি। পেলের হেডের পর তিনি বুঝতে পারলেন, বলটি যাচ্ছে একেবারে উল্টো দিকের কর্নারে। মাঝখানে দূরত্বের এক বিশাল মহাসমুদ্র। তার ওপর, মাটিতে ড্রপ খাওয়া বলের গতিপথ পরিবর্তন হয়ে তা আরও দুর্ভেদ্য হয়ে উঠেছে। সাধারণ কোনো গোলরক্ষক হলে হয়তো জায়গাতেই দাঁড়িয়ে থাকতেন, নিছক দর্শক হয়ে দেখতেন পেলের উদযাপন।

কিন্তু ঠিক সেই ভগ্নাংশ সেকেন্ডে, ব্যাংকস যা করলেন, তা মানবীয় রিফ্লেক্সের চূড়ান্ত সীমানাকে হার মানায়। চিতার ক্ষিপ্রতায় ডান দিকে শরীর ছুঁড়ে দিলেন তিনি। তার শরীর তখন পুরোপুরি শূন্যে, মাটির সাথে কোনো সংযোগ নেই। মনে হলো, মাধ্যাকর্ষণের অদৃশ্য শৃঙ্খল ছিঁড়ে তিনি নিজেকে ভাসিয়ে দিয়েছেন হাওয়ায়। স্যার আইজ্যাক নিউটনের মহাকর্ষের সূত্র যেন সেই কয়েক সেকেন্ডের জন্য হালিস্কো স্টেডিয়াম থেকে ছুটি নিয়েছিল।

বলটি যখন গোললাইন অতিক্রম করতে আর মাত্র কয়েক ইঞ্চি বাকি, ঠিক তখনই ব্যাংকসের প্রসারিত ডান হাতটি জাদুকরের কাঠির মতো দৃশ্যপটে হাজির হলো। বলের প্রচণ্ড গতি বা ভরবেগ, কোনো কিছুই তার সেই লৌহদৃঢ় কবজিকে টলাতে পারল না। হাতের বুড়ো আঙুল ও তালুর এক অবিশ্বাস্য, অতিমানবিক মোচড়ে তিনি বলটিকে নিচ থেকে উপরের দিকে তুলে দিলেন। বলটি ক্রসবারের ঠিক ওপর দিয়ে, যেন এক অদৃশ্য দেয়ালে ধাক্কা খেয়ে মাঠের বাইরে চলে গেল!

এটি সেভ নয়, এটি সময়ের বিরুদ্ধে যুদ্ধ। এক সেকেন্ডের ভগ্নাংশে নেওয়া একটি সিদ্ধান্ত, এক নিখুঁত প্রতিক্রিয়া, এক অসম্ভব কোণ। সব মিলিয়ে এটি ছিল মানবসীমার শেষ প্রান্তে দাঁড়িয়ে দেওয়া এক ঘোষণা, 'আমি পারি।'

স্টেডিয়াম নিস্তব্ধ।

তারপর বিস্ফোরণ।

পেলে মাথায় হাত দেন। তার চোখে অবিশ্বাস, 'এটা কীভাবে সম্ভব?'

ইংল্যান্ডের কিংবদন্তি অধিনায়ক ববি মুর ধীরে ধীরে ব্যাংকসের কাছে এগিয়ে এলেন। এই চরম উত্তেজনার মুহূর্তেও তার মুখে ছিল সেই বিখ্যাত শান্ত হাসি। তিনি শুধু বললেন, 'তুমি তো ওটা ধরেও ফেলতে পারতে, গর্ডন!'

মাটিতে পড়ে থাকা ব্যাংকস উঠতে উঠতে কিছুটা হাঁপাতে হাঁপাতে হাসিমুখে উত্তর দিলেন, 'দুঃখিত, ববি।'

ম্যাচ শেষে পেলে ব্যাংকসকে জড়িয়ে ধরে বলেছিলেন, 'আমি ভেবেছিলাম ওটা গোল হয়ে গেছে।'

ব্যাংকসের চিরস্মরণীয় উত্তর ছিল, 'তুমিও ভেবেছিলে, আমিও ভেবেছিলাম।'

পরবর্তীতে পেলে স্বীকার করেছিলেন, 'আমি আজীবন হাজারো গোল করেছি, কিন্তু মানুষ আমাকে মনে রেখেছে এমন একটি গোলের জন্য, যা আমি করতে পারিনি।'

গোলটি হয়নি, তবু সেটি ফুটবলের সবচেয়ে বড় গোলের মতোই স্মরণীয়।