ডিফেন্ডার হয়েও নাম তার ‘উজবেক রোনালদো’: খুসানভেই উজবেকিস্তানের বিশ্বকাপ স্বপ্ন
ফুটবলের মাঠে ডিফেন্ডারদের কাজটা অনেকটা আড়ালে থাকা নায়কের মতো। যাবতীয় আলো, উল্লাস আর উন্মাদনার কেন্দ্রে সাধারণত থাকেন গোল করা ফরোয়ার্ডরাই। সেখানে একজন সেন্ট্রাল ডিফেন্ডারকে যদি সর্বকালের অন্যতম সেরা ফরোয়ার্ড ক্রিস্তিয়ানো রোনালদোর সঙ্গে তুলনা করা হয়, তবে চোখ কপালে ওঠাই স্বাভাবিক! ২২ বছর বয়সী উজবেক সেন্টার-ব্যাক আবদুকোদির খুসানভের বেলায় ঠিক এই অভাবনীয় ঘটনাই ঘটছে। কিন্তু একজন রক্ষণভাগের খেলোয়াড় হয়েও কেন তার গায়ে 'উজবেকিস্তানের রোনালদো' তকমা?
এর উত্তরটা তার খেলার পজিশনে নয়, লুকিয়ে আছে তাঁর অবিশ্বাস্য তারকাখ্যাতি, উত্থান এবং দেশের মানুষের কাছে তার প্রভাবের মধ্যে। রোনালদো যেমন পর্তুগিজ ফুটবলের অবিসংবাদিত প্রতীক আর কোটি ভক্তের ভরসা, ঠিক তেমনি ম্যানচেস্টার সিটিতে খেলা খুসানভ উজবেকিস্তানের ফুটবল ইতিহাসে প্রথম বিশ্বব্যাপী পরিচিত সুপারস্টার। যে উজবেকিস্তানে রোনালদোর অগণিত অন্ধ ভক্ত, সেখানে খুসানভই এখন রোনালদো-সমতুল্য এক নির্ভরতার নাম। প্রথমবারের মতো বিশ্বকাপের মূল পর্বে পা রাখতে যাওয়া একটি দেশের সমস্ত আশা-আকাঙ্ক্ষা এখন এই তরুণের কাঁধেই।
খুসানভের প্রভাব কতটা প্রবল, তার প্রমাণ মেলে মাঠে এবং মাঠের বাইরের ঘটনাগুলোতেই। আন্তর্জাতিক ফুটবলে কোনো ম্যাচের আগে প্রতিপক্ষের সেন্ট্রাল ডিফেন্ডারকে নিয়ে কোচদের আলাদা করে সতর্ক থাকতে খুব একটা দেখা যায় না। কিন্তু সম্প্রতি তাশখন্দে গ্যাবনের বিপক্ষে প্রীতি ম্যাচের আগে গ্যাবনের কোচ আনিসেত ইয়ালা ঠিকই স্বীকার করেছিলেন, ম্যান সিটির এই তারকার জন্য তারা আলাদা কৌশল সাজিয়েছেন।
মজার ব্যাপার হলো, কার্ডের নিষেধাজ্ঞায় পড়ে খুসানভ সেই ম্যাচটি খেলতেই পারেননি! তারপরও পুরো সংবাদ সম্মেলন জুড়ে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে ছিলেন তিনিই। তাঁর অনুপস্থিতিতে উজবেকিস্তান ৩-১ গোলে জিতলেও দলের রক্ষণভাগের নড়বড়ে দশা চোখে পড়েছিল সবার, আর গণমাধ্যমগুলো একবাক্যে স্বীকার করে নিয়েছিল, খুসানভ থাকলে এমনটা হতো না।
সেই আক্ষেপ ঘুচিয়ে তিন দিন পর ভেনিজুয়েলার বিপক্ষে মাঠে ফেরেন খুসানভ। ২৯ হাজার দর্শকে ঠাসা গ্যালারিতে সেদিন গোলশূন্য ড্র হওয়া ম্যাচের (পরবর্তীতে টাইব্রেকারে জয়ী) মূল বিনোদনই ছিলেন এই তরুণ ডিফেন্ডার। একজন সেন্ট্রাল ডিফেন্ডার কীভাবে পুরো মাঠের নিয়ন্ত্রক হতে পারেন, সেদিন তা দেখিয়েছিলেন তিনি। প্রতিপক্ষের ফরোয়ার্ডদের গতির কাছে পরাস্ত না হয়ে ক্ষিপ্রতায় বল কেড়ে নেওয়া, অবলীলায় তাদের ধুলোয় আছড়ে ফেলা কিংবা মাঝমাঠ থেকে নিখুঁত ৫০ গজের লং পাসে উইঙ্গারদের বল পাঠানো, খুসানভ যেন রক্ষণের শিল্প দেখাচ্ছিলেন। টুর্নামেন্টের মাত্র একটি ম্যাচ খেলেই তিনি নির্বাচিত হন সেরা খেলোয়াড়। এক সপ্তাহের ব্যবধানে কারাবাও কাপের পর এটি ছিল তার জেতা দ্বিতীয় ট্রফি (ফিফা সিরিজ ট্রফি)।
খুসানভের এই মহাতারকা হয়ে ওঠার গল্পটাও রূপকথার মতো। মাত্র ১৮ বছর বয়সে জন্মভূমি তাশখন্দের ক্লাব বুনিওদকোর ছেড়ে পাড়ি জমান বেলারুশের ক্লাবে। সেখান থেকে ফ্রান্সের লিগ ওয়ানের দল লেন্স হয়ে অবিশ্বাস্য দ্রুততায় তিনি জায়গা করে নেন বিশ্বের অন্যতম সেরা ক্লাব ম্যানচেস্টার সিটিতে। এর আগে ওদিল আহমেদভ বা এলডর শোমুরোদভের মতো তারকারা উজবেক ফুটবলে নাম কুড়ালেও, প্রিমিয়ার লিগ ও চ্যাম্পিয়ন্স লিগে নিয়মিত খেলা এবং এমন বিশ্বব্যাপী খ্যাতি এর আগে কোনো উজবেক ফুটবলার পাননি।
আজকাল উজবেকিস্তানে খুসানভ এক বিশাল সেলিব্রেটি। রাস্তার ধারের বড় বড় বিলবোর্ডে তার ছবি। গত বছর তার বিয়ে এবং সম্প্রতি প্রথম সন্তানের জন্মের খবর দেশটির জাতীয় সংবাদমাধ্যমে রীতিমতো শিরোনাম হয়েছে। এক দশক আগেও যে দেশের ব্যবস্থা ছিল অত্যন্ত রক্ষণশীল, সেখানে খুসানভ যেন নতুন প্রজন্মের কাছে এক বিস্ময়কর অনুপ্রেরণা।
ম্যান সিটির মতো বিশ্বমানের ক্লাবে খেলা এই তরুণ শুধু তার দেশের ফুটবলের বিজ্ঞাপনই নন, তিনি একটি নতুন যুগের সূচনা করেছেন। আসন্ন বিশ্বকাপে উজবেকিস্তান যখন প্রথমবারের মতো বিশ্বমঞ্চে নামবে, তখন কোটি মানুষের চোখ থাকবে রক্ষণের এই অতন্দ্র প্রহরীর দিকেই। তিনি হয়তো গোল করবেন না, কিন্তু 'উজবেক রোনালদো' হিসেবে দেশের মানুষের স্বপ্ন ঠিকই নিজের কাঁধে বয়ে বেড়াবেন আবদুকোদির খুসানভ।